বালুরঘাটের দালানপুকুরের তলায় মিলল প্রাচীন স্থাপত্যের হদিস
পুকুরের তলায় চাপা পড়ে থাকা অজানা ইতিহাসের সম্ভাবনাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের আলোচনায়।
বিশ্বদীপ নন্দী, বালুরঘাট: দক্ষিণ দিনাজপুর যেন আবার মনে করিয়ে দিল – এ জেলা শুধু প্রশাসনিক সীমানা নয়, ইতিহাসেরও এক গোপন ভাণ্ডার। বালুরঘাটের নাজিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কিসমত যশাহার গ্রামে বহু প্রাচীন ‘দালানপুকুর’-এর জল পাম্পসেট দিয়ে নামাতেই সামনে এসেছে চওড়া ইটের তৈরি সিঁড়ি। পুকুরের বুক চিরে উঠে আসা সেই গাঁথুনি ঘিরে এখন এলাকাজুড়ে তুমুল কৌতূহল ও জল্পনা। প্রায় নয় বিঘা জমির উপর বিস্তৃত এই পুকুর স্থানীয়দের কাছে বরাবরই রহস্যে মোড়া।
গ্রামবাসীদের দাবি, তীব্র খরার সময়েও কখনও পুরোপুরি শুকোতে দেখা যায়নি এই জলাশয়কে। কিন্তু সম্প্রতি পাড় বাঁধানোর কাজের জন্য পুকুরের জল সরাতেই প্রকাশ্যে আসে ইটের তৈরি পুরনো গাঁথুনি। দেখা যায়, পুকুরপাড় থেকে সোজা মাঝামাঝি পর্যন্ত নেমে গেছে দুটি প্রশস্ত সিঁড়ি। ইটের গঠন ও বিন্যাস দেখে অনেকেরই ধারণা, এটি সাম্প্রতিক নির্মাণ নয়। বরং কয়েকশো বছরের পুরনো কোনও স্থাপত্যের অংশ হতে পারে। ফলে পুকুরের তলায় চাপা পড়ে থাকা অজানা ইতিহাসের সম্ভাবনাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের আলোচনায়।
গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি, পুকুরপাড়ের গলাকাটা প্রাচীন কালীমূর্তির সঙ্গে এই জলাশয়ের গভীর যোগ রয়েছে। তাঁদের কথায়, বহু অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই এলাকা। সেই সূত্র ধরেই অনেকের বিশ্বাস, পুকুরের তলায় কোনও প্রাচীন মন্দির বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ লুকিয়ে থাকতে পারে।এলাকার বাসিন্দা গোবিন্দ পাল ও দীপা বিশ্বকর্মা জানান, এমন দৃশ্য আগে কখনও চোখে পড়েনি। তাঁদের অনুমান, পুকুরের মাঝামাঝি অংশে একটি কুয়ো বা মূল কাঠামো থাকতে পারে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বৈজ্ঞানিক খনন হলে তবেই সামনে আসবে প্রকৃত ইতিহাস – এমনই দাবি তাঁদের। পুকুরের মালিক বাপী মাহাতও বিস্ময় গোপন করতে পারছেন না। তাঁর কথায়, পুকুরপাড়ের কালীমূর্তি অত্যন্ত জাগ্রত বলে পরিচিত। আগে কেউ সাহস করে পুকুরে নামতেন না। এবার পাড় বাঁধানোর জন্য জল সরাতেই এই সিঁড়ি চোখে পড়ে।
ইতিহাসবিদ সমিত ঘোষ জানান, দিনাজপুর অঞ্চল বরাবরই পুরাতত্ত্বে সমৃদ্ধ। টেরাকোটার মন্দির, প্রাচীন মূর্তি ও নানা স্থাপত্যের নিদর্শন বহুবার মিলেছে এ অঞ্চলে।তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন বা ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে খনন ছাড়া এই আবিষ্কারের প্রকৃত তাৎপর্য জানা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, নাজিরপুর, কামালপুর ও যশাহার অঞ্চল একসময় বৌদ্ধবিহারে সমৃদ্ধ ছিল। ফলে এটি কোনও প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্যের অংশ, নাকি কোনও রাজার আমলের মন্দির – সে রহস্যের জবাব লুকিয়ে রয়েছে মাটির।






