প্রবাসের মাটিতে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া, রসবাখে চক্রবর্তী পরিবারের দুর্গোৎসবে কুমারীপুজো, ভোগ, সিঁদুর খেলা ও ধুনুচি নাচ
জার্মানির মাটিতে এক টুকরো বাংলা! প্রবাসের বুকে ষষ্ঠ বর্ষে পদার্পণ করল চক্রবর্তী পরিবারের দুর্গাপুজো

বিকাশ ঘোষ: মাতৃভূমি থেকে বহু দূরে, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের অদূরে রসবাখে বাঙালিয়ানার আবহে শুরু হয়েছে চক্রবর্তী পরিবারের দুর্গাপুজো। এ বছর ষষ্ঠ বর্ষে পদার্পণ করছে এই পারিবারিক শারদোৎসব। বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিকড়ের টানকে প্রবাসের মাটিতে অটুট রাখার লক্ষ্যেই পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিজনদের উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে এই পুজো। ভক্তি, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের মেলবন্ধনে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে উৎসব।
আপনজনদের সহযোগিতা এবং মাতৃআরাধনার আবেগে মুখর হয়ে উঠেছে তাঁদের আঙিনা। প্রবাসে থেকেও বাঙালির চিরাচরিত শারদোৎসবের রীতিনীতি ও উৎসবের আমেজকে ধরে রাখার এই উদ্যোগ ক্রমশ পারিবারিক মিলনোৎসবের রূপ নিয়েছে। প্রবাসে এবার দুর্গোৎসব চলবে মোট ছয় দিন। ষষ্ঠী থেকে শুরু করে দু’দিনের সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং বিজয়া দশমী প্রতিটি দিনই সাজানো হয়েছে পুজোর নানা আচার-অনুষ্ঠান, ভোগের আয়োজন ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আবহে। প্রবাসে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছে এই আয়োজন শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের এক বিশেষ উপলক্ষ।

এবারের পুজোর অন্যতম আকর্ষণ কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমোরটুলিতে তৈরি মা দুর্গার চালচিত্র। পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গায়ত্রী ও দেবদীপ্তর আন্তরিক উপহার হিসেবে এই চালচিত্র পৌঁছে গেছে সুদূর জার্মানির রসবাখে। চালচিত্রটি প্রবাসে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন অভীক দত্ত চৌধুরী ও চৈতালি দত্ত চৌধুরী। তাঁদের সহযোগিতায় এই পুজোয় যুক্ত হয়েছে বাংলার মৃৎশিল্প ও শিল্পঐতিহ্যের এক বিশেষ ছোঁয়া।
পুজোর প্রচার ও উৎসবের আবহকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পোস্টার তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে আন্তরিক সহযোগিতা। পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পায়েল শৈল এবং তাঁর মা পোস্টারের লেখনীতে অবদান রেখেছেন। তাঁদের সৃজনশীল অংশগ্রহণ চক্রবর্তী পরিবারের এই আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
চক্রবর্তী পরিবারের দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব কুমারীপুজো। এ বছরও পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য ঋষিকাকে কন্যারূপে দেবীর আসনে বসিয়ে পুজো করা হচ্ছে। হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে কুমারীপুজোর মাধ্যমে নারীশক্তির আরাধনা করা হয়। ছোট্ট ঋষিকাকে ঘিরে এই আয়োজন পরিবারের সদস্যদের কাছে যেমন আনন্দের, তেমনই ভক্তি, স্নেহ ও শ্রদ্ধার এক বিশেষ মুহূর্ত।

পুজোর প্রতিদিনের ভোগ প্রস্তুত করবেন পরিবারের গৃহকর্ত্রী শতাব্দী চক্রবর্তী । অন্যদিকে, পুজোর যাবতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও বিধিবিধান সম্পন্ন করবেন পরিবারের কর্তা সপ্তর্ষি চক্রবর্তী। পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসাই এই পুজোর মূল শক্তি। প্রবাসে থেকেও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই আয়োজন।
ছয় দিনের উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে বুধবার, ২১ অক্টোবর, বিজয়া দশমীর দিনে। ঘট বিসর্জন, সিঁদুর খেলা ও ধুনুচি নাচের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হবে। আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি থাকবে মাকে বিদায় জানানোর আবেগ এবং আগামী বছরের শারদোৎসবের জন্য অপেক্ষার প্রত্যাশা।

মাতৃভূমি থেকে দূরে থেকেও বাঙালির উৎসবের ঐতিহ্যকে আপন করে নেওয়া, নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা এবং বন্ধু-পরিজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে চক্রবর্তী পরিবারের এই উদ্যোগের সার্থকতা।
রসবাখের মাটিতে চক্রবর্তী পরিবারের ষষ্ঠ বর্ষের দুর্গাপুজো তাই কেবল একটি পারিবারিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রবাসের বুকে এক টুকরো বাংলা। যেখানে ভক্তি, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও বাঙালিয়ানা মিলেমিশে তৈরি করছে এক অনন্য শারদোৎসবের আবহ।





