দেশ

ভারতের ইতিহাসে বৃহত্তম কর্পোরেট কেলেঙ্কারি! ১৫ লাখ কোটির জালিয়াতিতে কাঁপছে শেয়ার বাজার

১৫ লাখ কোটির মহাজালিয়াতি! সেবির জালে সোনার কোম্পানি ‘রাজেশ এক্সপোর্টস’, মাথায় হাত এলআইসি-র

Truth of Bengal: ভারতের কর্পোরেট জগতে এবার এক নজিরবিহীন ও হিমশীতল করা আর্থিক কেলেঙ্কারির হদিস মিলল, যার বিশালত্ব দেখে খোদ বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (SEBI)-র দুঁদে অফিসারদেরও চোখ কপালে উঠেছে। দেশের বৃহত্তম সোনা রিফাইনার ও গহনা প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড’ (Rajesh Exports Limited – REL)-এর বিরুদ্ধে ১৫.১৫ লাখ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও রাজস্বের ভুয়ো খতিয়ান দেখানোর অভিযোগে এক ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করেছে সেবি। তদন্তে সহযোগিতা না করার অপরাধে সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর রাজেশ মেহতা এবং কোম্পানির ওপর একগুচ্ছ কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে। এই খবর বাজারে চাউর হতেই বৃহস্পতিবার ধস নেমেছে কোম্পানির শেয়ারে। বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই দর ৫ শতাংশ পড়ে গিয়ে ১০৩ টাকায় ঠেকেছে।

৯৯ শতাংশ রাজস্বই ফাঁপা! কীভাবে চলত প্রতারণা?

সেবির পেশ করা অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টে যে বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের মধ্যে রাজেশ এক্সপোর্টস তাদের সম্মিলিত রাজস্বে (Consolidated Revenue) প্রায় ১৫.১৫ লাখ কোটি টাকার গরমিল বা ভুল তথ্য পেশ করেছে। এই বিশাল অঙ্কটি ওই নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানির দেখানো মোট রাজস্বের প্রায় ৯৯.৮০ শতাংশ!

তদন্তে জানা গেছে, কোম্পানির মোট আয়ের সিংহভাগই আসত তাদের বিদেশি সহযোগী সংস্থা ‘ভালকাম্বি এসএ’ (Valcambi SA) থেকে। কিন্তু ভালকাম্বির নিজস্ব অডিটেড রিপোর্ট খতিয়ে দেখে সেবি জানতে পেরেছে, মূল গ্রুপ লেভেলে যে বিপুল টাকা আয় দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার সামান্য অংশই রয়েছে। সোনা প্রক্রিয়াকরণের প্রকৃত আয়ের বদলে, সম্পূর্ণ সোনার ট্রানজ্যাকশন ভ্যালু বা মোট মূল্যকে রাজস্ব হিসেবে দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে সংস্থাটি, যার সপক্ষে কোনও সঠিক ইনভয়েস বা অ্যাকাউন্টিং নথি নেই। এই জালিয়াতিতে কোম্পানির অডিটরদের ভূমিকা পরীক্ষা করতে জাতীয় আর্থিক রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ (NFRA)-এর কাছে সুপারিশ করেছে সেবি।

বিপাকে এলআইসি (LIC), কোটি কোটি টাকা লোকসান

রাজেশ এক্সপোর্টস-এর এই চরম জালিয়াতির জেরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের বৃহত্তম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সংস্থা লাইফ ইন্সুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া বা এলআইসি। এই সোনা সংস্থায় এলআইসি-র প্রায় ১০.৮০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। শেয়ারের দাম হু হু করে পড়ে যাওয়ায় এলআইসি-র এই বিনিয়োগের মূল্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে যেখানে এই কোম্পানিতে এলআইসি-র হোল্ডিংয়ের মূল্য ছিল ৬৩৭ কোটি টাকা, তা মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৪৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, পলিসি হোল্ডারদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নিমেষে হাওয়া!

মুখ ফেরাচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও

শুধু এলআইসি নয়, ধস নেমেছে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (FII) তহবলেও। তবে কোম্পানির অন্দরে চলা এই ডামাডোল আগেভাগেই আঁচ করতে পেরে গত তিন বছর ধরে ক্রমাগত নিজেদের অংশীদারি কমাচ্ছিলেন বিদেশি লগ্নিকারীরা। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে যেখানে এফআইআই-দের হোল্ডিং ছিল ১৭.৬০ শতাংশ, ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.২৬ শতাংশে। বর্তমানে এই কোম্পানিতে মূলত ব্রিজ ইন্ডিয়া ফান্ড ও সোয়াব ফান্ডামেন্টাল ইটিএফ-এর বড় বিনিয়োগ রয়েছে। তবে বর্তমান পতনের জেরে এফআইআই-দের হোল্ডিংয়ের মূল্যও ৮৩৮ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৫৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

এর আগেও ২০২৩ সালে ক্যাশ-ফ্লো স্টেটমেন্ট জমা না দেওয়ায় এনএসই (NSE) কোম্পানির কাছে জবাবদিহি চেয়েছিল। এবার সেবির এই চূড়ান্ত খাড়ার পর ‘রাজেশ এক্সপোর্টস’ দেউলিয়া হওয়ার দিকে এগোয় কি না, সেটাই দেখার।

Related Articles