রক্তাল্পতার প্রতি উদাসীনতা ভবিষ্যতে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, সতর্কতা বিশেষজ্ঞের
Ignoring anemia can lead to big dangers in the future, warns expert

Truth Of Bengal: অল্পতেই কী ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন? সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠছেন? রক্তাল্পতার উপসর্গ নয়তো?রক্তাল্পতার প্রতি উদাসীনতা ভবিষ্যতে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। সতর্ক হন।
অ্যানিমিয়া কোন রোগ নয়, এটি উপসর্গ। আয়রনের ঘাটতি রক্তাল্পতার অন্যতম বড় কারণ হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে আরও কিছু কারণ। অ্যানিমিয়া ক্রনিক হোক বা অ্যাকিউট , চিকিৎসার মধ্যে থাকা উচিত। হিমোগ্লোবিনের মাত্রা খেয়াল রাখার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার। রক্তাল্পতার লক্ষণ কী? কী করনীয়? কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে? জানালেন বিশিষ্ট কনসালটেন্ট হেমাটোলজিস্ট ডাঃ প্রান্তর চক্রবর্তী। কথা বলেছেন আমাদের প্রতিনিধি অর্পিতা বসু।

প্রশ্ন: কতটা হিমোগ্লোবিন কম হলে একজন রোগীকে অ্যানিমিক বলা হয় বা তিনি রক্তাল্পতায় ভুগছেন বলে ধরে নেওয়া হয়?
উত্তর : আমাদের দেশে পুরুষদের ক্ষেত্রে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ১৩ গ্রাম এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ১২ গ্রাম হলে তা স্বাভাবিক ধরা হয়। গর্ভাবস্থায় মহিলাদের ক্ষেত্রে ১০ গ্রাম হলেও স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয় তবে তার থেকে কম হলে তাকে রক্তাল্পতা বলে চিকিৎসা করা হয়। পাঁচ বছরের নিচের বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১০ গ্রামের কম হলে অ্যানিমিক বলে ধরা হয়।
প্রশ্ন: যে কোনও বয়সেই কি অ্যানিমিয়া হতে পারে? এর কারণ কী?
উত্তর: মহিলাদের মধ্যে উদ্বেগজনক ভাবে দেখা যায় অ্যানিমিয়ার উপস্থিতি। পুরুষেরাও কম-বেশি এই রোগের শিকার হন। যে কোনো বয়সেই হতে পারে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা। গর্ভাবস্থাতে অনেক মহিলা অ্যানিমিয়ার সমস্যায় ভোগেন। এছাড়াও মহিলাদের অ্যানিমিয়ার পিছনে ভূমিকা রয়েছে মাসিকেরও। অনেকের ক্ষেত্রেই হেভি ব্লিডিং এর সমস্যা থাকে। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে মেনোরেজিয়া বলা হয়। এক্ষেত্রে শরীরে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে ঘাটতি থেকে যায় বেশী রক্তক্ষরণের জন্য। জেনেটিক রোগের ক্ষেত্রে জন্ম থেকে এক বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের মধ্যে অ্যানিমিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে অ্যানিমিয়া একটি সাধারণ সমস্যা। কিছু ক্ষেত্রে, অ্যানিমিয়া জন্মগত ত্রুটি, বা অন্য কোনো রোগের কারণেও হতে পারে।
প্রশ্ন: কোন কোন লক্ষণ দেখলে বোঝা সম্ভব একজন অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত ?
উত্তর : রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। ফলে দেহে সর্বত্র অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণ হয় না। এক্ষেত্রে সামান্য কাজ করেও অনেকে ক্লান্তি অনুভব করেন, হাঁটতে গেলে বা সিঁড়ি উঠতে গেলে হাঁপিয়ে ওঠেন। মাথা ঘুরে যেতে পারে। শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়, চুল পড়তে পারে, মাথা ব্যথা, শ্বাসকষ্টের সমস্যাও থাকতে পারে। হার্টের সমস্যা থাকলে, বুকে ব্যথা হতে পারে। কারণ হার্ট তখন ঠিকভাবে অক্সিজেন পায় না।
প্রশ্ন: কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
উত্তর : লক্ষণ মূলত কতটা হিমোগ্লোবিন কমেছে তার ওপর সব সময় নির্ভর করে না। কত দ্রুত তা কমেছে তার ওপরও নির্ভর করে। যে লক্ষণ গুলো আলোচনা করলাম এই ধরনের সমস্যা থাকলে এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিস্তেজ হয়ে গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।অনেক সময় অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসার পর পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায় তাঁর রক্তাল্পতা আছে। আবার এমন উদাহরণও রয়েছে রক্তাল্পতার সমস্যা নিয়ে আসার পর পরীক্ষা করে দেখা গেল তাঁর ক্রিয়েটিনিন বেড়ে গেছে অর্থাৎ আসল সমস্যা কিডনিতে। কোলন ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও অ্যানিমিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই রক্তাল্পতার পিছনে কোন রোগ দায়ী, সেটা জানা জরুরি।
প্রশ্ন: কী কী পরীক্ষা করানো প্রয়োজন?
উত্তর : অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রে সাধারণত (সিবিসি), আয়রন স্টাডিজ, ভিটামিন বি-১২ এবং ফোলেট পরীক্ষা সহ বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।
প্রশ্ন : তাহলে, কী কারণে অ্যানিমিয়া হচ্ছে , তার ওপরেই কী নির্ভর করছে অ্যানিমিয়ার চিকিৎসা?
উত্তর:প্রথমেই কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে শুধু আয়রন ডেফিসিয়েন্সি থেকেই অ্যানিমিয়া হয় এমন নয়। ভিটামিন বি-১২, ফলিক অ্যাসিডের অভাবজনিত কারণেও রক্তাল্পতা হতে পারে, যাকে নিউট্রিশনাল অ্যানিমিয়া বলা হয়। অনেক সময় দেখা যায় এই উপাদানগুলো শরীরে ঢুকলেও শরীরে ঠিকমতো শোষণ হচ্ছে না। ফলে সমস্যা তৈরি হয়। ঋতুস্রাবের সময় মহিলাদের অনেকটা রক্ত শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, যাদের অতিরিক্ত ঋতুস্রাব হয় তাদের রক্তাল্পতার সমস্যা থাকতে পারে। অনেক সময় কোনও শিশু জন্মায় অপুষ্টি নিয়ে । সেক্ষেত্রে তাদের রক্তাল্পতা সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আবার থ্যালাসেমিয়ার কারণে রক্ত ঠিকঠাক তৈরী হয় না। তাই কী কারণে অ্যানিমিয়া হচ্ছে তার ওপরেই নির্ভর করে অ্যানিমিয়ার চিকিৎসা।
প্রশ্ন: অ্যানিমিয়া হলে কোন পরিস্থিতিতে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়?
উত্তর : বাইরে থেকে দেওয়া কোনও রক্তই ১০০ শতাংশ নিরাপদ নয়। রক্তাল্পতা দেখা দিলে আয়রন ট্যাবলেট দেওয়া হয়। প্রয়োজনে ইন্ট্রাভেনাস আয়রন ইনজেকশন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বাইরে থেকে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। থ্যালাসেমিয়া, হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি এই ধরনের জেনেটিক রোগের ক্ষেত্রে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। আবার অটোইমিউন হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়ার ক্ষেত্রে রক্ত দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ এক্ষেত্রে রক্ত দিলেও তা ভেঙ্গে গিয়ে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা আরো কমে যেতে পারে। তাই হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ২, ৩ বা ৪ হয়ে গেলে এবং অন্য কোনো জটিলতা থাকলে তবেই রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। সেক্ষেত্রে শুধু লোহিত কণিকা (packed cells) দেওয়া হয়।
প্রশ্ন : থ্যালাসেমিয়া রোগের ক্ষেত্রেও যেহেতু রক্তাল্পতা একটা প্রধান লক্ষণ এই দিকটি কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত?
উত্তর : পশ্চিমবঙ্গের থ্যালাসেমিয়ার বাহকের সংখ্যা ১০ শতাংশ। বাবা মা দুজনেই বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুরুতেই বাবা মায়ের থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং প্রয়োজন। দরকার সচেতনতা। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে রক্তাল্পতা থাকলে এবং তার সাথে প্লীহা বড় হলে অবশ্যই থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষা করে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্ন : অ্যানিমিয়া হলে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই আয়রন ট্যাবলেট খান। কারন না বুঝে আয়রন ট্যাবলেট খেলে কী কোনও ক্ষতি হতে পারে ?
উত্তর: অবশ্যই ক্ষতি হয়। দীর্ঘদিন ধরে আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার ফলে শরীরে আয়রন জমতে থাকে। যা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। তেমনি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রক্ত দিতে হয়। সেই রক্ত দিয়ে শরীরে লোহা যায় যা জমলে একইভাবে শরীরের ক্ষতি করে। সেখানে অতিরিক্ত আয়রন ট্যাবলেট খেলে আরও ক্ষতি। আবার অতিরিক্ত হিমোগ্লোবিন শরীরের জন্য ভালো নয়। রক্তে হিমোগ্লোবিন কাউন্ট অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তখন ব্ল্যাড লেটিং করতে হয়। তাই অ্যানিমিয়া হলেই আয়রন ট্যাবলেট নয়। কেন তা হচ্ছে তার কারণ খুঁজে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
প্রশ্ন: ডায়েটের ক্ষেত্রে কতটা নজর দেওয়া প্রয়োজন?
উত্তর : ডায়েটের ক্ষেত্রে অবশ্যই নজর দেওয়া প্রয়োজন। আয়রন ও ভিটামিনের ঘাটতি রোধ করতে প্রচুর পরিমাণে ফল, শাকসবজি ও জল পান করা উচিত। আয়রন, ফোলেট, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।
প্রশ্ন: সবশেষে সুস্থ থাকার জন্য পাঠকদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চাইবেন?
উত্তর : শুধুমাত্র রক্তাল্পতা থেকে মুক্ত হতে নয়, শরীরকে সুস্থ রাখতে সব সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি ।
১)নিয়মিত শরীর চর্চা করুন, হাঁটুন।
২)পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত জল পান করুন।
৩)পরিমিত ঘুম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৪)কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলেও বছরে অন্তত একবার নিয়মিত চেকআপ ও রক্ত পরীক্ষা করান।






