বিনোদনসম্পাদকীয়

এ আর রহমানের ‘গ্রে ডিভোর্স’ নিয়ে উত্তাল নেটদুনিয়া,কি এই ‘গ্রে ডিভোর্স’জানেন?

The internet is in a frenzy over AR Rahman's 'Grey Divorce'

Truth of Bengal, অনন্যা ভট্টাচার্য: সম্প্রতি অস্কার বিজয়ী সুরকার এ আর রহমানের দাম্পত্য বিচ্ছেদ ঘোষণা একটি বিষয়কে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। যার পোশাকি নাম গ্রে ডিভোর্স বা ধূসর বিচ্ছেদ। সমাজ মাধ্যম এই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্টতই দ্বিধা বিভক্ত। কিছু মানুষ মনে করেন এই বিচ্ছেদ আসলে পুরুষতন্ত্রের কায়েমি স্বার্থের প্রতীক। কম বয়সে একে অন্যের থেকে সুবিধা নেওয়ার পর বয়স কালে যখন একে অন্যের পরিপূরক হয়ে জীবন যাপন করার কথা, তখনই সুবিধা বুঝে হাত ছেড়ে দেওয়ার নাম গ্রে ডিভোর্স। আরএকদলের মতে, মানুষের ভাল থাকার অধিকার যে কোনও বয়সে সমান ভাবে থাকে। তাই সে যৌবন অথবা প্রৌঢ়ত্ব যে সীমাতেই জীবন এসে থাকুক না কেন নিজের মতো বাঁচতে চাওয়ার জায়গায় মানুষ মাত্রই থাকেন।

অর্থাৎ, প্রতি মুহূর্তে আমরা দু’জন মানুষের জীবনের সিদ্ধান্তকে নিজেদের জীবনকে প্রত্যক্ষ করার চোখ দিয়ে মেপে চলেছি অনবরত। কিন্তু কারণটা কেউ তলিয়ে ভাবছিনা। দু’জন বয়স্ক মানুষ জীবনের প্রান্তে এসে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন নিচ্ছেন। কোন পর্যায়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কেনই-বা এতদিন নিলেন না। এই সিদ্ধান্তে তাদের পারিপার্শ্বিক জগতে কোথায় তোলপাড় হচ্ছে এগুli নিয়ে আমরা কেউ কোনও আলোচনা অবধি করছিনা।

গ্রে ডিভোর্সের পেছনে লুকিয়ে থাকা কারণগুলিকে যদি পর্যালোচনা করা যায়, তাহলে প্রথমে যে কারণটি উঠে আসে তা হল শূন্যতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় পাশাপাশি থাকার মধ্যে বহু যুগআগে ভালবাসা ফুরিয়েগিয়েছে। পড়ে আছে কেবলমাত্র সন্তান প্রতিপালনের দায়বদ্ধতা। তাই যখন সন্তান বড় হয়ে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত অথবা উচ্চশিক্ষায় ব্যস্ত তখন একসঙ্গেথাকার প্রয়োজনীয়তা ফুরোচ্ছে।

জীবনের লক্ষ্য ক্রমশ পরিবর্তন হওয়াও দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, যৌবন থেকে যখন আমরা ক্রমশ প্রৌঢ়ত্বের দিকে এগোই তখন জীবনকে দেখার চোখ পরিবর্তিত হতে থাকে। ফলত জীবনসঙ্গীর থেকে যে শুরুতে চাহিদা ছিল তার পরিবর্তন আসতে শুরু করে এবং ঠিক সেই কারণেই অনেক সময়ে মতানৈক্য দেখা যায়।

প্রৌঢ়ত্বের সীমায় এসে কথা ফুরিয়ে আসে। একে অন্যের কথা শোনার বদলে তর্কে সমাধান খোঁজার প্রবণতা বাড়তে থাকে। তাই যেকোনও ছোট সমস্যাও মহীরুহের আকার ধারণ করে। ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করে কাচের দেওয়াল। যে দেওয়ালের দুই পারে বসে থাকে প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছনো দু’জন মানুষ। ক্রমশ শৈত্যপ্রবাহ বাড়তে থাকে।

যে বয়সে এই ধূসর বিচ্ছেদ নেমে আসছে, ঠিক সেই সময়টা করে মেয়েদের জীবনে ঋতুচক্রের ছন্দ পতন হয়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই শারীরিক আকর্ষণ, যৌন ইচ্ছা এগুলি কমতে থাকে। এসবের থেকে ক্রমাগত দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসবের থেকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে মানুষ জড়িয়ে পড়ে যা আদতে সম্পর্কটিকে বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যেতে থাকে।

যৌবনকালীন জীবনে মানুষ অর্থ, যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তির পেছনে দৌড়ায়। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রৌঢ়ত্বের সীমায় এসে মানুষ আত্মিক জগতের উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। পেছনে ছেড়ে আসে মায়া সর্বস্ব জীবন। সেই পথে অগ্রসর হতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় জীবন সঙ্গীকে বাঁধা হিসাবে প্রত্যক্ষ করেন এবং এর থেকে মুক্তি পেতে বিচ্ছেদকে বেছে নিচ্ছেন।

বহুদিনের জমে থাকা একে অন্যের প্রতি তীব্র অভিমানের পাঁচিল ভালবাসাহীনতার একটা চৌখুপি ঘর দেয় মাত্র। সেই ঘরে বাস করে জমে থাকা অ-সুখ। সেই সুখবিহীন ঘর পেরিয়ে ভারহীন জীবনের সন্ধানের নামই গ্রে ডিভোর্স। প্রৌঢ়ত্বের সীমায় এসে ভাল থাকার অধিকার সবার আছে। দায়হীন, ভারহীন জীবনের উন্মুক্ত আকাশে বুড়ো ডানাগুলি আবার উড়ুক নাহয়হইচই। আতসকাচ গুছিয়ে রেখে চলুন দূরবিন নিয়ে বসি। ধূসর আকাশে রঙিন ঘুড়িগুলির ভো-কাট্টা বলেহইচইশুনতে মন্দ লাগবেনা, কি বলুন!