সম্পাদকীয়

Manasa Puja: সুন্দরবনের লোকায়ত সমাজে মনসাদেবীর প্রভাব

বিশেষ করে বর্ষার সময়ে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠের শেষ থেকে ভাদ্র মাসের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এখানে সর্পদেবী মনসার পুজো অনুষ্ঠিত হয়।

অমিত লাহা: ভাদ্র মাসের শুরু থেকেই সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে মনসা পুজোর আয়োজন লক্ষ্য করা যায়। জল-জঙ্গল অধ্যুষিত সর্পসঙ্কুল সুন্দরবন অঞ্চলে বিষধর সাপের কবল থেকে পরিত্রাণের জন্য লৌকিক দেবী মনসার আবির্ভাব। সুন্দরবন অধ্যুষিত দক্ষিণবঙ্গের মানুষ মাটির ঢিবি, ঘট, মনসা বৃক্ষকে কেন্দ্র করে সর্পদেবী মনসার আরাধনা ও পুজোর আয়োজন করতো। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে মনসার থান, মনসার মন্দির গড়ে ওঠে। যথেষ্ট বিজ্ঞান চেতনার ঘাটতি কিংবা সর্পদংশিতদের সুচিকিৎসার উন্নত পরিষেবার অভাবেই হোক সুন্দরবন তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনার জল-জঙ্গলজীবী মানুষ সহজ সরল বিশ্বাসে এবং ভক্তিভরে চিরদিন সর্পদেবী মনসার আরাধনা করে আসছে।( Manasa Puja)

[আরও পড়ুনঃ Horoscope Today: ২০ আগস্ট ২০২৫: কোন রাশির জন্য সুখ, কার জন্য সতর্কতা?]

সুন্দরবনের লোকায়ত সমাজে মনসাদেবীর প্রভাব সর্বব্যাপী। বিশেষ করে বর্ষার সময়ে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠের শেষ থেকে ভাদ্র মাসের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এখানে সর্পদেবী মনসার পুজো অনুষ্ঠিত হয়। সুন্দরবন অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত এমন কোনও গ্রাম খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে মনসা দেবীর  থান অথবা মন্দির নেই। এই অঞ্চলে বসবাসকারী মাহিষ্য, কাওরা, বাগদি, হাড়ি, প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষ মনসা দেবীর নিত্য উপাসক। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সুন্দরবন অঞ্চলে মনসা পুজোর আয়োজন করা হয় অতিসাধারণ থান বা মন্দিরে। তবে এই অঞ্চলের কিছু মানুষ তাদের গৃহে পারিবারিক গৃহদেবতা হিসেবে মনসাদেবীর ঘট, মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে আরাধনা করে আসছে বহু বছর ধরে। মনসাদেবীর পুজোর পৌরোহিত্য করেন লোকায়ত সমাজের ব্রাহ্মণ শ্রেণির লোক। এছাড়া বহু ক্ষেত্রে অ-ব্রাহ্মণ শ্রেণির সেবায়েতরা নিজেরাই নিজেদের থানের পুজোর পৌরোহিত্য করে থাকেন। মনসা পুজোর নৈবেদ্য হিসেবে সাধারণত দুধ-কলা, সন্দেশ, বাতাসা, ফুল, ফল ইত্যাদি উৎসর্গ করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য হাঁস, মুরগি বলি দেওয়ারও প্রচলন আছে।( Manasa Puja)

[লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/truthofbengal]

গৃহী-ভক্তজন মনে করেন, মনসাদেবী প্রসন্ন হলে তাঁর অনুচর বাস্তুসাপ হয়ে এসে গৃহে অবস্থান করে। এই বাস্তুসাপকে দেবীর মতোই ভক্তিও শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। এমনকী কালকেউটে, আলকেউটের মতো বিষধর সাপকেও সুন্দরবন অঞ্চলে কোনও কোনও বাড়িতে বাস্তুসাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুন্দরবনের সম্পন্ন কৃষিজীবী পরিবারে এখনও প্রতিবছর ভাদ্রমাসে পদ্মপুরাণ ও মনসামঙ্গলকাব্য পাঠের আয়োজন করা হয়। মনসা পুজো উপলক্ষে বিশেষ উৎসবও পালিত হয় ভদ্র সংক্রান্তিতে। বাসি পান্তাভাত খাওয়ার এই উৎসবকে বলা হয় অরন্ধন পুজো। পুজোর আগেরদিন সারারাত ধরে ভাত, ডাল সহ অসংখ্য আমিষ, নিরামিষ ব্যাঞ্জন রান্না করা হয় নিয়ম উপাচার মেনে। বার্ষিক এই উৎসবকে অনেক জায়গায় রান্না পুজোও বলা হয়। যে গৃহে রান্না পুজোর আয়োজন করা হয় সেখানে রন্ধনশালায় পরিবারের বাইরের লোকের প্রবেশ নিষেধ। পরিবারের সদস্য-সদস্যাদেরও সুচিতা বজায় রেখে রান্নার কাজে ব্রতী হতে হয়। নতুন মাটির হাঁড়িতে অষ্টনাগ পুজোর আতপচালের ভোগ রান্না করা হয়। এরপর একে একে ভাত, ডাল, বিভিন্ন রকমের ভাজাভুজি, মাছের ঝোল, পাকাকলার বড়া, চালতার চাটনি, পায়েস প্রভৃতি রান্না করে মনসাদেবীকে নিবেদন করা হয়। পরদিন অনুষ্ঠিত হয় অরন্ধন পুজো। যে বাড়িতে রান্না পুজোর আয়োজন করা হয়, সেই বাড়িতে পুজোর পরদিন আর উনুন জ্বালানো হয় না। সেদিন সম্পূর্ণ অরন্ধন দিবস পালিত হয়।( Manasa Puja)

অরন্ধনের দিন ভোগ রান্নার উনুন পরিষ্কার করে মনসা গাছের ডাল এনে বসিয়ে রাখা হয়। খাল বা পুকুর থেকে শাপলা তুলে এনে মালা গেঁথে ভোগের হাঁড়িতে পরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শাপলা পাতায় অষ্টনাগের ভোগ নিবেদন করা হয়। আটটা শাপলা পাতায় আতপচালের পান্তা সহ সবরকম আমিষ ও নিরামিষ পদ সাজিয়ে অষ্টনাগের নৈবেদ্য দিয়ে মনসাদেবীর কাছে প্রার্থনা জানানো হয়। এছাড়া নৈবেদ্য হিসেবে নানারকমের ফল ও মিষ্টি দেওয়ার প্রথা চালু আছে। যে বাড়িতে মনসা পুজোর আয়োজন করা হয়, সে বাড়ির কর্তাব্যক্তিরাই এ পুজোয় পৌরোহিত্য করে থাকেন। মনসা পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, বাড়ির মহিলারাও এই পুজোয় পৌরোহিত্যর আসন গ্রহণ করে থাকেন। পুজোর পর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ও প্রতিবেশীদের মধ্যে অরন্ধন পুজোর পান্তা সহ বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু ব্যঞ্জন নিবেদন করা হয়। কলাপাতা পেতে পেটপুরে সবাইকে খাওয়ানোর মধ্যে অসীম আনন্দ পেয়ে থাকেন সুন্দরবনের মানুষ। রান্না পুজোর সময় রীতিমতো উৎসবে মাতে সুন্দরবনের লোকায়ত সমাজ। রান্না পুজোর পান্তা ও ডাল চচ্চড়ির প্রতি আকর্ষণ নেই সুন্দরবন অঞ্চলে এমন মানুষের সন্ধান পাওয়া দুষ্কর।( Manasa Puja)

মনসাদেবীর খ্যাতির নিদর্শন রূপে সুন্দরবন তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক গ্রাম, জনপদ, হাট, বাজারের নামের সঙ্গে মনসাদেবীর নাম জড়িয়ে আছে। সাগরদ্বীপের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল মনসা দ্বীপ নামে পরিচিত। এছাড়া মনসাবাড়ি, মনসাতলা, মনসাডাঙা প্রভৃতি নামেও বিভিন্ন জায়গার নাম প্রতি গ্রামে ও মৌজায় চোখে পড়ে। মনসা নামের এই বিপুল খ্যাতির অন্যতম কারণ হল, ঝোপঝাড় ও জলকাদায় লুকিয়ে থাকা বিষধর সাপের চোরাগোপ্তা ছোবলের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় সর্পদেবীর নাম নিরন্তর স্মরণ করার পুরাতন ঐতিহ্য মেনে চলা। জীবন রক্ষা ও জীবিকা অর্জনের মাঝে সুন্দরবন অঞ্চলের লোকায়ত মানুষের এই সরল বিশ্বাস ও ভক্তি চিরদিন এগিয়ে চলার সাহস জুগিয়ে চলেছে।

Related Articles