উন্নাও ধর্ষণ মামলা বহু প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালো আমাদের
দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির একটি বেঞ্চ সিবিআই-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে এই নির্দেশ দিয়েছে।
প্রবীর মজুমদার: উন্নাও ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক তথা উত্তরপ্রদেশের বিজেপির বহিষ্কৃত বিধায়ক প্রভাবশালী নেতা কুলদীপ সিং সেঙ্গারের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড স্থগিত রাখার যে নির্দেশ দিল্লি হাইকোর্ট দিয়েছিল, সোমবার তার উপর স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির একটি বেঞ্চ সিবিআই-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে এই নির্দেশ দিয়েছে।
গত ২৩ ডিসেম্বর দিল্লি হাইকোর্ট সেঙ্গারের সাজা স্থগিত করে তাকে জামিন দেওয়ার যে রায় শুনিয়েছিল, দেশের শীর্ষ আদালত তা বাতিল করে দিয়েছে। এর ফলে আপাতত জেলেই থাকতে হচ্ছে সেঙ্গারকে। বিচারপতি জেকে মহেশ্বরী এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত এই বেঞ্চ সিবিআই-এর বিশেষ লিভ পিটিশনের ভিত্তিতে সেঙ্গারকে একটি নোটিশও জারি করেছে।
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সাধারণত কোনও উচ্চ আদালত জামিন দিলে তা বাতিল করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য শোনা প্রয়োজন। তবে এই মামলাটির পরিস্থিতি অত্যন্ত ভিন্ন এবং এখানে আইনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে— এই দেশ কি ধর্ষকের দেশ হয়ে গেল? কেন এই মনোভাব? এর কারণ কি শুধু ক্ষমতার দম্ভ? না, এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত।
ধর্ষণ ভারতীয় সমাজে নতুন কোনও ঘটনা নয়। ধর্ষণের খাঁড়া মাথায় নিয়েই সমাজে মেয়েদের বাঁচতে হয়। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয়ার্ধে এসে, যখন মেয়েরা সমাজের প্রায় সর্বস্তরে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে, তখনও তারা একটা শরীর হিসেবেই থেকে গেল, মানুষ হতে পারল না। কিন্তু সম্প্রতি দেশে যে ধর্ষণের ঘটনাগুলি সামনে আসছে, তার চরিত্র একটু ভিন্ন। সেখানে প্রধান হয়ে উঠছে ক্ষমতার প্রতাপ— কোথাও উঁচু জাতের, কোথাও শাসক দলের রাজনীতির। এক কথায়, রাজনৈতিক ধর্ষণ। উন্নাও ধর্ষণ কাণ্ডও এমনই একটি রাজনৈতিক ধর্ষণ।
এই লেখার মাঝেই মনে পড়ে গেল এক পরিচিতজনের কাছে শোনা তারই এক আত্মীয় তরুণীর অভিজ্ঞতার কথা। কলকাতার একটি ছোট্ট অফিসের ঘটনা এটি। মালিক-সহ জনা আষ্টেক পুরুষ কর্মচারীর অফিসে তরুণীটি কাজে যোগ দেয় সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায়। তরুণীটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কয়েকজন পুরুষ কর্মচারী তরুণীর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পেরে না উঠে একটি নোংরা খেলা শুরু করল।
অফিসে একটিই বাথরুম ছিল। পুরুষ কর্মচারীরা কমোডের রিং ফেলে তার উপর মূত্রত্যাগ করতে শুরু করল। মেয়েটি বুঝে গেল, তাকে চাকরি ছাড়তে হবে। অচিরেই সে চাকরি ছেড়েও দেয়। তরুণীটি পরে সেই অফিসের এক প্রাক্তন পুরুষ সহকর্মীর কাছে শোনে যে এই ইতরামির কারণ ছিল মেয়েটির তীব্র ব্যক্তিত্বকে সহ্য করতে না পারা। অর্থাৎ একদল পুরুষের একটি মেয়েকে বস্তুরূপে চিহ্নিত করা কী ভয়ঙ্কর রূপে প্রকাশ পেল।
নারীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের এই বিকৃত মানসিকতা লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক চিন্তনে। যখন কোনও ছেলের জন্ম হয়, পরিবারে খুশির বন্যা বয়ে যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় এই বিকৃত মানসিকতার বীজবপন। এরও আগে থেকে, যখন ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’ বলা হয়, বা ছেলের আশায় নানা ব্রত পালন বা স্ত্রীআচার পালন করা হয়, তখনই যেন জন্মের আগেই এক ছেলেকে জিতিয়ে দেওয়া হয়। জন্মের পর সংসারের সবচেয়ে ‘ভাল’ জিনিসটাই তার জন্য তোলা থাকে। এখান থেকেই গড়ে ওঠে আগ্রাসী মানসিকতা— ‘আমি যা চাই, তা আমাকে পেতেই হবে।’
এক সুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন জীবনে ‘প্রত্যাখ্যান’ সুস্থভাবে মেনে নেওয়ার জন্য যে চারিত্রিক দৃঢ়তা থাকা দরকার, সেটা তৈরি হওয়ার সুযোগই পায় না। পুরুষতন্ত্র বেড়ে ওঠে এইভাবেই। আর এইভাবেই ধর্ষণ, অ্যাসিড হামলা, শ্লীলতাহানির মতো ঘটনাগুলোকে আমরা স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে শিখি। সবার মধ্যে একটা গা-ছাড়া ভাব— যেন এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। যাঁরা সত্যিকারের মানবিক গুণ সম্পন্ন ‘মানুষ’, তাঁরা ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে যাচ্ছেন।
বাস্তবিক ঘটনা হল মেয়েদের উপর অত্যাচার, নিপীড়ন, অথচ তার দায় নিতে হবে মেয়েদেরই; কুফলও ভোগ করতে হবে তাদেরই! এমনটাই চলে আসছে। তবু ভাল, মেয়েরা এখন অন্তত অত্যাচারের— এমনকী যৌন অত্যাচারের কথাও সর্বসমক্ষে বলছে, সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না। মেয়েদের উপর হওয়া অত্যাচারের হিসেব মেয়েদেরই নিতে হবে। সঙ্গে যদি সংবেদনশীল পুরুষেরা এগিয়ে আসেন, নিশ্চয়ই তাঁদের স্বাগত। আজ আমরা সাফল্য পাইনি, কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই পাব। যেদিন সমাজের সর্বস্তর থেকে প্রতিকারের স্বর উঠবে। আপাতত সেই ক্ষীণ স্বরটিকে উচ্চকিত করে তোলাই এখন আমাদের কাজ। জয় একদিন হবেই।
উন্নাও ধর্ষণকাণ্ড মামলায় অভিযুক্ত কুলদীপ সিংহ সেঙ্গারের সাজা স্থগিত ও জামিনে মুক্তির দিল্লি হাই কোর্টের নির্দেশ এবং সুপ্রিম কোর্টের সেই জামিনে স্থগিতাদেশ একটু হলেও ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। তবে কি এই প্রক্রিয়ায় মেয়েদের কি খালি ধর্ষিত হওয়া ও ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’ বলে কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কোনও ভূমিকা নেই? অবশ্যই আছে। এর জন্য চাই সমাজের মানসিক পরিবর্তন যা বকলমে পুরুষদের মানসিক পরিবর্তন আনা যে, নারীরা তাদের অধিকারের ও উপভোগের বস্তু নয়। এটা একটা যুদ্ধ। আর এ সহজ যুদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধর্ষণের ঘটনা ও তার পরিপ্রেক্ষিতে বয়স, জাতি, ধর্ম-নির্বিশেষে অসংখ্য মেয়েদের প্রতিবাদী আন্দোলনে শামিল হওয়া অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কিন্তু শুধু প্রতিবাদ জানিয়ে এর শেষ হওয়ার কথা নয়। এর জন্য চাই ক্রমাগত প্রচেষ্টা— তা জুডিশিয়াল, লেজিসলেটিভ, ল’ অ্যান্ড অর্ডার ইত্যাদি সব কিছুর মধ্যে দিয়েই চালিয়ে যেতে হবে।
সব মিলিয়ে, উন্নাও কাণ্ডে ফের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নারী নিরাপত্তা ও ন্যায় বিচার নিয়ে প্রশ্নের ঝাঁজ বাড়ালো আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে রইল ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ স্লোগান দেওয়া বিজেপির ভূমিকা এবং নীরবতা।






