অফবিট

কবে, কোথায় বসে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’র ইংরেজি অনুবাদ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?

নিজের সময়ের চেয়ে বহু গুন এগিয়ে ছিল তাঁর চিন্তাভাবনা।

Truth of Bengal: ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ এই বীরভোগ্যা বসুন্ধরায় উদয় হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী রবি কিরণের। যে কিরণের ছটায় শুধু যে বাংলা ও বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি পরিবর্তনের নতুন হাওয়ার পন্থী হতে পেরেছিল তা নয়, মননে চিন্তায় ভাবনায় বাঙালিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল নতুন যুগের আঙিনায়। নিজের সময়ের চেয়ে বহু গুন এগিয়ে ছিল তাঁর চিন্তাভাবনা। তাই তো তাঁর অমরসৃষ্টিগুলো আজও মানব সমাজে একই ভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বকবি। দেশকালের সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ভারতের পাশাপাশি নানান বিদেশি রাষ্ট্রেও সমান ভাবে সমাদৃত। অন্ধ্র প্রদেশের পাহাড়ি জেলা চিত্তুরের মদনপল্লেতে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন বেসান্ত থিওসফিক্যাল কলেজ। এই কলেজের গেস্ট হাউজে থাকার সময়ই ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুরারোপ করেন জাতীয় সঙ্গীতে। বাংলা থেকে ইংরেজি ভাষায় রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেন ‘জন গণ মন’-র। নাম রাখা হয় ‘Morning Song of India’।

১৯১৫ সালে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন ড. অ্যানি বেসান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কলেজের অধ্যক্ষ পদে ছিলেন জেমস হেনরি কাজিনস। তিনি নিজেও কবি ও রবীন্দ্রনাথের গুণমুগ্ধ ছিলেন। অ্যানি বেসান্তর প্রতিষ্ঠিত মদনপল্লের থিওসফিক্যাল কলেজ মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত ছিল। তখন গোটা এলাকাই মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ছিল। কিন্তু অ্যানি বেসান্ত হোম রুল মুভমেন্টে জড়িয়ে পড়েন বলে সে সময়ের ব্রিটিশ সরকার কলেজের অনুমোদন বাতিল করে দেয়।

১৯১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত কলেজের পাশে ওলকট বাংলো নামে কটেজে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ ভারত সফরে যান রবীন্দ্রনাথ। বেঙ্গালউরু থেকে ট্রেনে চেপে মদনপল্লে আসেন তিনি। দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত হয়ে মদনপল্লের থিওসফিক্যাল কলেজের কটেজে আশ্রয় নেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারিতে কলেজের আর্ট রুমে সবাই জড়ো হন। অধ্যক্ষ জেমস হেনরি কাজিন ও তাঁর স্ত্রী মার্গারেট স্কুলের পড়ুয়া, শিক্ষক ও কর্মচারীদের নিয়ে সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।

সেদিন রবীন্দ্রনাথও অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তাঁকে তাঁরই রচিত কোনো গান গাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তিনি জন গণ মন গান। এটি ১৯১১ সালে রচিত। কংগ্রেসের অধিবেশনে গাওয়া হয়েছিল। বাংলা ভাষায় রচিত হলেও সেখানে উপস্থিত বিদেশিরাও ‘জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় হে’-তে গলা মিলিয়েছিলেন বলে নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন জেমস হেনরি কাজিনস। তাঁর স্ত্রী মার্গারেট গানের সুরারোপ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। তিনি আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের রয়্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে সঙ্গীতে স্নাতক ছিলেন।

মার্গারেট নিজে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে গানের জেনারেল থিম, নোটেশন ও স্বর বুঝে নেন। সাধারণ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্রর সাহায্যে নিজের পড়ুয়াদের সাহায্যে গানের নোটেশন তৈরি করেন মার্গারেট কাজিনস। সুরটি হৃদয় ছুঁয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের। কলেজের কটেজের ২০৪ নম্বর ঘরে বসে ‘জন গণ মন’ র ইংরেজি অনুবাদ ‘Morning Song of India’ করেন তিনি। লেখার শেষে নিজে সই করে তারিখ উল্লেখ করেন। সেদিন ছিল ১৯১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। রবীন্দ্রনাথের লেখা সেই মহামূল্যবান নথি আজও স্বযত্নে রয়েছে কলেজে। রবীন্দ্রনাথ নিজে বাংলা আর ইংরেজি অনুবাদে সুরারোপিত গানের প্রতিটি লাইন মিলিয়ে দেখেন। সন্তুষ্ট হন বিশ্বকবি। কলেজের বেসান্ত হলে ইংরেজিতে গানটি পড়ুয়া ও কলেজের কর্মচারীদের নিয়ে গেয়ে শোনান মার্গারেট কাজিনস।

Related Articles