গৌড়েশ্বর শশাঙ্ক: বাংলার হারানো গৌরবের কথা
রাজ্যবাসীর কাছে তাই তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল যথেষ্ট। কড়া শাসন ছিল, অপরাধীরা অন্যায় কাজ করতে দশবার ভাবতো।
Truth Of Bengal: আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে, গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়েছিল এক অদম্য রাজ্য গৌড়। আর তার সিংহাসনে বসেছিলেন এমন এক শাসক, যার নাম শোনামাত্রই শত্রুরা কেঁপে উঠত রাজা শশাঙ্ক। বাংলার অন্যতম শক্তিশালী রাজা হিসেবে ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। রাজা শশাঙ্ক ছিলেন সাহসী যোদ্ধা (King Shashanka)। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর আপসহীন লড়াই। রাজ্যবাসীর কাছে তাই তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল যথেষ্ট। কড়া শাসন ছিল, অপরাধীরা অন্যায় কাজ করতে দশবার ভাবতো।
৬ষ্ঠ–৭ম শতাব্দীর প্রান্তে, যখন বাংলা ছিন্নভিন্ন ছোট ছোট প্রভুদের হাতে বিভক্ত, তখন শশাঙ্ক কেবল একজন রাজপুত্র নন তিনি ছিলেন ঐক্যের স্বপ্নদ্রষ্টা। মগধ, ওড়িশা, কামরূপ সব প্রান্তেই তাঁর দাপট ছড়িয়ে পড়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। বঙ্গদেশ এবং তার বাইরেও ওড়িশা কামরূপ মগধে প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে।
রাজা শশাঙ্কের সাম্রাজ্য বিস্তারের অন্যতম স্থপতি ছিল তার সাহসী সৈন্য দল। সেই সঙ্গে ছিল বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল। অনেক শক্তিশালী রাজ্যের রাজারা পর্যন্ত তার কৌশলের কাছে হার মেনেছে বারে বারে। বীরদর্পে লড়াই করে সাম্রাজ্যে বিস্তার ঘটতে থাকে। সেই সঙ্গে সুশাসন রাজ্যবাসীর মন কেড়ে নেয়। বাণভট্টের হর্ষচরিত, চীনা পরিব্রাজক ও বৌদ্ধ ভিক্ষু হিউয়েন সাং-এর বর্ণনা…প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া মুদ্রা ও সীল—সবই সাক্ষ্য দেয় তাঁর শাসনের। রাজধানী কর্ণসুবর্ণ—যেখানে রাজদরবারে প্রতিদিন জ্বলে উঠত রাজদণ্ডের শপথ।
কিন্তু শশাঙ্ক শুধু শাসনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি—তিনি ছিলেন এক দুর্দান্ত যোদ্ধা। হর্ষবর্ধনের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, মগধ দখল, এমনকি কামরূপের শক্তিশালী ভাস্কারবর্মণের সঙ্গেও জোট ও সংঘাত— এইসব কৌশলেই তিনি গৌড়কে উত্তর ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। তবে ইতিহাসে তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে আছে বিতর্কও। হিউয়েন সাং-এর লেখা বলে, শশাঙ্ক (King Shashanka) বৌদ্ধবিরোধী ছিলেন—এমনকি বুদ্ধগয়ার পবিত্র গাছ পর্যন্ত কেটে ফেলেছিলেন। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদেরা বলেন, এই অভিযোগ অনেকটা পক্ষপাতের ফল, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ সবসময় এই চিত্রকে সমর্থন করে না।
শশাঙ্কের মৃত্যু যেন ছিল গৌড়ের জন্য এক অকাল সন্ধ্যা।
তাঁর পুত্র মানব খুব অল্প সময়ের জন্য সিংহাসনে বসেন। তারপরই গৌড় ভেঙে যায়, শত্রুর হাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। তবুও, রাজা শশাঙ্ক বাংলা ইতিহাসের প্রথম মহানায়কদের একজন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন ঐক্য আর দৃঢ়তার জোরে ছোট রাজ্যও উত্তর ভারতের রাজনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। কর্ণসুবর্ণের ধূলোমাটি আজও যেন ফিসফিস করে বলে আমি গৌড়রাজ শশাঙ্ক ভূমি, বাংলার প্রথম সিংহাসনের অধিপতি। অনেক ইতিহাস আজও কথা বলে। হয়তো কর্ণ সুবর্ণের রাস্তা ধরে বলে আপনার কানে ভাসবে সেই ১৪০০ বছর আগের ইতিহাস।






