হিজলি বন্দর দখল করতে চেয়েছিলেন জোব চার্নক, তারপর যা হয়েছিল…
১৬৮৭ সালের জব চার্নক হিজলি বন্দর দখল করার জন্য ৪০০ সেনাবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেন।
Truth Of Bengal: কলকাতা তখন অজ পাড়া গাঁ, দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশ সুন্দরবনের লাগোয়া, বাঘের আনাগোনাও নাকি ছিল। সূর্য ডুবতে না ডুবতেই জন্তু-জানোয়ারের হুঙ্কারে মানুষ গৃহবন্দী হয়ে যেতেন। আর ১৬০০ শতকে মেদিনীপুরের হিজলি ছিল অন্যতম প্রসিদ্ধ বাণিজ্য বন্দর নগরী। এখান থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য করা হতো, মোগল সময়ের আগে হিজলি একটি আলাদা রাজ্য ছিল, যেখানে ভারতের বিভিন্ন রাজারা রাজত্ব করেছেন, এবং মুঘল সময়ে এটি হিন্দু রাজার অধীনে থাকলেও, এটি মূলত মুঘলদের অধীনস্ত ছিল।

১৬৮৭ সালের জব চার্নক হিজলি বন্দর দখল করার জন্য ৪০০ সেনাবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেন। কিন্তু স্থানীয় শাসক এবং মুঘল সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত জব চার্নক সেখান থেকে সুতানুটি এসে থাকতে শুরু করে। এরপর সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা গ্রাম গুলিতে তারা বসবাস করতে থাকে। যেটি আজকের কলকাতা শহর। বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, হিজলি ছিল একটি ছোট রাজ্য। হিজলি শাসন করত মসনদ ই আলা বংশের পাঠান সুলতানরা। এটির রাজধানী ছিল বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি থানার হিজিলি পরগনা।
বঙ্কিম চন্দ্রের কপালকুণ্ডলা গল্পে যে রসুলপুর নদীর মোহনার কথা বলা হয়েছে সেখানে। এই নদীর যে পাড়ে নবকুমার নেমে ছিল তার উল্টো পাড়টা হল হিজ্লি। ১৬৮৭ সালে এখানে একটি বন্দর গড়ে ওঠে। ১৮৬৪ সালে একটি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণি ঝড়ে এই বন্দর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। এখানকার উল্লেখযোগ্য সুলতান ছিলেন তাজখান মসনদ ই আলা। যিনি একাধারে ছিলেন বারো ভুঁইয়ার একজন অন্যতম ভুঁইয়া এবং একজন সুফি সাধক। তিনি এখানে একটি দরগা তৈরি করেন যা এখন বর্তমান। এখানে হিন্দু মুসলিম সবাই পুজো দেন। প্রসঙ্গত, খড়গপুর এর সন্নিকটে যে হিজিলি আছে তা এই রাজ্যেরই সীমা ছিল সম্ভবত। মহেন্দ্রনাথ করণের খেজুরী ও হিজলির ইতিহাস বইটি পারলে জানতে এখানকার অনেক ইতিহাস জানা যায়।

তাজ খাঁ হলেন জনৈক আফগান মেদিনীপুর জেলার একমাত্র ক্ষুদ্র মুসলমান রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা (ইং ১৬২৮ থেকে ১৬৪৯)। সমুদ্র তীরবর্তী হিজলি তাঁর রাজধানী। ‘সনদ’ পেয়েছিলেন দিল্লির বাদশাহর শর্তে উড়িষ্যার সুবেদারের কাছ থেকে। সম্রাট শাজাহান ২৮টি মহল নিয়ে হিজলী ফৌজদারী গঠন করে দেন। প্রথম ফৌজদার তাজ খাঁ। ভাই সিকান্দারের হাতে শাসনের ভার দিয়ে নিজে ধর্মচর্চা নিয়ে থাকতেন। উপাধি পেয়েছিলেন মসনদ-ই -আলা। তিন গম্বুজের একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এই ধার্মিক শাসক। পারিবারিক চক্রান্তে সিকান্দার নিহত হলে বিষন্ন তাজ খাঁ অমর্ষির পির হজরৎ মখদুম শেখ-উল-মোশায়েখ শাহ আবুল-হক-উদ্দিন চিশতি-র কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। স্বল্প কাল পরে মসজিদের সামনের হুজরার ভিতর সমাধিমগ্ন হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

পূর্ব মেদিনীপুরে অবস্থিত হিজলি। কাঁথি থেকে মুকুন্দপুর হয়ে পেটুয়া ঘাট যেতে পারেন অটো বা ট্রেকারে চেপে। সেখান থেকে লঞ্চে চেপে পৌঁছে যাওয়া যায় হিজলি। এই রাস্তার সর্বাধিক দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। লঞ্চে উঠে রসুলপুর নদী পেরিয়ে সুন্দর আর সুন্দরের ছবি ভরা হিজলি পৌঁছে যাবেন। সেখান থেকে টোটো কিংবা অটো রয়েছে। তিন চাকার গাড়িতে চেপে মোরাম এবং ইটের রাস্তা ধরে রসুলপুর নদীর মোহনা যাওয়া যায়।






