জীবনের শেষ ১৭ বছর একাকী জীবন কাটান ঠাকুর বাড়ির জ্যোতিরিন্দ্রনাথ
Jyotirindranath of the Tagore family spent the last 17 years of his life alone.

Truth Of Bengal: রাজু পারাল: জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও সারদা দেবীর পঞ্চম পুত্র রূপে ঠাকুর পরিবারে জন্ম নেন ১৮৪৯ সালের ৪ মে। বিচিত্র গুনের অধিকারী ছিলেন তিনি। সাহিত্যে, সঙ্গীতে, অভিনয়ে, নাট্যরচনায়, চিত্রকলায়, সাংস্কৃতিক কাজকর্মে, ব্যবসায়ে, ভাষাশিক্ষায়, স্বদেশিকতায় তাঁর প্রতিভা ছিল অপরিসীম। তাঁর বহু বিচিত্র প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের মানসপটে প্রভাব ফেলেছিল। জীবনের প্রথম প্রত্যুষে রবীন্দ্রনাথ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কাছে যে ভালোবাসা ও প্রশ্রয় পেয়েছিলেন, নানা প্রসঙ্গে কবি কৃতজ্ঞ চিত্তে একাধিকবার স্মরণ করেছেন তা। তাঁর সৃষ্টি জগতে এগিয়ে চলার সূচনা পর্ব, অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষা গ্রহণ শুরু হয় ‘নতুনদা ‘ বা ‘জ্যোতিদাদা’র হাত ধরেই।
রবীন্দ্রনাথ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের থেকে বারো বছরের ছোট ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন ‘জ্যোতিদাদা’। জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির তেতলার ঘরে রবীন্দ্রনাথের কাব্য প্রতিভাকে আবিষ্কার করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের লেখার খাতাটি ক্রমশ পূর্ণ হয়ে উঠছে অথচ তা প্রকাশের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে না। তাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ উভয়েই ঠিক করলেন ঠাকুর বাড়ির লেখক গোষ্ঠীদের নিয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশ করার। এভাবেই বাংলা সাহিত্য জগতে প্রকাশ পেয়েছিল ‘ভারতী’ পত্রিকার। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা (রবীন্দ্রনাথের দিদি) ‘ভারতী’ পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ ঘটে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের চেষ্টাতেই।
‘ভারতী’ পত্রিকায় স্বর্ণকুমারী দেবী বহু গল্প, উপন্যাস, কবিতা লিখেছিলেন। পরে তিনি ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদনাও করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভাকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও তাঁর সহধর্মিনী কাদম্বরী দেবীর প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না। আবার রবীন্দ্রনাথের ফরাসি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ভূমিকা কম ছিল না। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বাড়িতে যে ‘বিদ্বজ্জন সমাগম’ গড়ে তুলেছিলেন অনেকে সেখানে আসতেন।
নাটক মঞ্চস্থ সহ নানা সাহিত্য পাঠ , সঙ্গীত চর্চায় সেখানে অংশ নিতেন রবীন্দ্রনাথ ও স্বর্ণকুমারী দেবীরা। একসময় প্রেসিডেন্সী কলেজের পাঠ চুকিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় মনোনিবেশ করেন। ঐতিহাসিক নাটকের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল। লেখক হিসেবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রথম পরিচয় নাট্যকাররূপে। যতদূর জানা যায়, ‘কিঞ্চিৎ জলযোগ’ নামে একটি প্রহসন লিখে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেছিলেন। নাটকটি ‘ন্যাশনাল থিয়েটারে’ ১৮৭৩ সালে প্রথম অভিনীত হয়। প্রহসনটির নানা প্রশংসাপূর্ণ সমালোচনা বের হলে পরবর্তীকালে তিনি এটি আর ছাপেননি।
তবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মৌলিক নাটক ‘সরোজিনী’ নাট্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গী। সে সম্বন্ধে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলেছিলেন-“গুণুদাদা ও আমি প্রায় একবয়সী। আমরা ছেলেবেলায় বরাবর একত্রে থাকিতাম, একসঙ্গে খেলাধুলা এবং একসঙ্গে পাঠাভ্যাসও করিতাম। তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল এবং উদারহৃদয় লোক ছিলেন। আমরা দুইজনে যেন হরিহর-আত্মা ছিলাম।” দুজনে মিলে ঠাকুরবাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তৈরী করেছিলেন ‘জোড়াসাঁকো নাট্যশালা’ নামে একটি দল। যেখানে ‘কৃষ্ণকুমারী ‘ নাটকটি প্রথম অভিনীত হয়। ঐ নাটকটিতে কৃষ্ণকুমারীর মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রভূত প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।
নাট্যক্ষেত্রে খ্যাতি পাওয়া সত্ত্বেও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে একসময় সরে দাঁড়ান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। নাটক না লেখার কারণ জানতে চাইলে অমৃতলাল বসুকে তিনি বলেছিলেন, ‘নাট্যজগতে গিরিশচন্দ্র প্রবেশ করিয়াছে। আমার নাটক রচনার আর প্রয়োজন নাই।’ নাটক ছেড়ে পরে অনুবাদ কর্মে মেতে ওঠেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ । সংস্কৃত, ফরাসী, মারাঠি ও ইংরেজি থেকে অনুবাদ শুরু করেন। ফরাসী নাট্যকার মঁলিয়ের দুটি নাটক মূল ফরাসী থেকে অনুবাদ করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। অনূদিত নাটক দুটি হল –‘হঠাৎ নবাব ও ‘দায়ে পড়ে দ্বারগ্রহ’। নাটক অনুবাদের কাজে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রতিভা ছিল ঈর্ষণীয়।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে নাটক ও প্রহসন ছাড়াও প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গীতিনাট্য ও ভ্রমণ রচনার ক্ষেত্রে কলম ধরেছিলেন। বিভিন্ন সাময়িকপত্রে তাঁর রচনাগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লিখিত মোট গ্রন্থের সংখ্যা পঁয়তাল্লিশটি। কেবল সাহিত্যেক্ষেত্রে নয়, সংগীত জগতেও তিনি ছিলেন অনন্য পুরুষ। বালক জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজের প্রচেষ্টায় বড়দাদা দ্বীজেন্দ্রনাথের পুরোনো পিয়ানো যন্ত্রে হাত পাকানোর কথা জানতে পারা ‘জীবনস্মৃতি’ থেকে। ‘জীবনস্মৃতি’র পাতা থেকে জানা যায় সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে বোম্বাইয়ে থাকাকালীন একজন গুজরাটি মুসলমান জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে সেতার শেখাতেন।
চিত্রশিল্পী হিসেবেও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পরিচিতি ছিল প্রশংসার যোগ্য। মাত্র দশ বছর বয়সে বিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক শিক্ষকের মুখের স্কেচ এঁকে বেশ প্রশংসা পেয়েছিলেন। সেই শুরু – তারপর বাকি ষাট বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি প্রায় হাজারের ওপর ছবি এঁকেছেন। সেই সব ছবির মধ্যে বেশিরভাগই মানুষের মুখের স্কেচ। শ্রমজীবী মানুষ, ভৃত্য, চাষি, দোকানি, ফেরিওয়ালা, ডাক্তার, পুলিশ কেহই বাদ পড়েনি তাঁর আঁকা স্কেচ থেকে। অবশ্য কিছু ল্যান্ডস্কেপ ও পশুপাখির ছবিও তিনি এঁকেছিলেন। তবে নিজের স্কেচ বুকে সবচেয়ে বেশি ছবি এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথের।
১৮৮১ সালে বিলেত থেকে ফেরার পর রবীন্দ্রনাথের প্রায় ১৭ টি স্কেচ করেছিলেন তিনি। বিশ্বখ্যাত শিল্পী ও শিল্প সমালোচক রোদেনস্টাইন তাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ চিত্রকরের মর্যাদা দিতে কার্পণ্য করেননি। ‘কিঞ্চিৎ জলযোগ’ প্রকাশিত হবার পর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছেন, ” ইহার কিছুদিন পরে মেজদাদা (সত্যেন্দ্রনাথ) বিলাত হইতে ফিরিয়া আমাদের পরিবারে যখন আমূল পরিবর্তনের বন্যা বহাইয়া দিলেন, তখন আমারও মতের পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। তখন হইতে আর আমি অবরোধ প্রথার বিরোধী নহি, বরং ক্রমে ক্রমে একজন সেরা নব্যপন্থী হইয়া উঠিলাম।”
এই সময় থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নারী স্বাধীনতার পক্ষপাতী হয়ে পড়েন। স্ত্রী কাদম্বরীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। সে সম্পর্কে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “গঙ্গার ধারের কোন বাগানবাড়িতে সস্ত্রীক অবস্থান কালে আমার স্ত্রীকে আমি নিজেই অশ্বারোহণ পর্যন্ত শিখাইতাম। তাহার পর জোড়াসাঁকো বাড়িতে আসিয়া, দুইটি আরব ঘোড়ায় দুজনে পাশাপাশি চড়িয়া, বাড়ী হইতে গড়ের মাঠ পর্যন্ত প্রত্যহ বেড়াইতে যাইতাম। ময়দানে পৌঁছিয়া দুইজনে সবেগে ঘোড়া ছুটাইতাম। প্রতিবেশীরা স্তম্ভিত হইয়া গালে হাত দিত। আমি তখন উদ্দাম নব্যভাবের নেশায় উন্মত্ত ! এইরূপে অন্ত:পুরের পর্দা তো উঠাইলাম, সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের পর্দাটিও একেবারে উঠিয়া গেল! “সন্দেহ নেই, সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরণের কাজ খুবই দু:সাহসিক।
পরবর্তীকালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পরিবারিক জীবন হয়ে উঠেছিল বড়ই বিপন্ন। তাঁর সঙ্গে কাদম্বরীর বিবাহ ঠাকুরবাড়ির অনেকেই মেনে নেননি। ঠাকুর বাড়ির বেশিরভাগ সদস্যরা ভাবতেন কাদম্বরী কোনোভাবেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উপযুক্ত নয়। ঠাকুর বাড়িতে কাদম্বরীর আগমনকে অমঙ্গলসূচক মনে করতেন তাঁরা। স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথও কাদম্বরীর কাছ থেকে দূরে সরে থাকছিলেন। সবদিক থেকে বঞ্চিত কাদম্বরী দেবী ক্রমশ নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিলেন এবং অবশেষে কাদম্বরী আত্মহননের পথ বেছে নেয়েছিলেন। তবে সেই মৃত্যুর কারণ অবশ্য নিশ্চিত নয়। কাদম্বরীর মৃত্যুর পর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। জীবনের স্বাভাবিক স্রোত থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
১৯০৮ সালে জোড়াসাঁকো থেকে চিরবিদায় নিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চলে গেলেন রাঁচির মোরাবাদী পাহাড়ের ওপর নিজের বাড়ি ‘শান্তিধাম’এ । জীবনের শেষ সতেরো বছর সেখানেই তিনি রয়ে গিয়েছিলেন একাকী। ‘শান্তিধামে’ নির্জন নিরালায় বারবার মনে করেছিলেন কাদম্বরী দেবীকে। সেসব স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরেই লিখেছিলেন ‘ জীবনস্মৃতি’। ১৯২৫ সালের ৪ মার্চ রাঁচির শান্তিধাম থেকেই মহাপ্রস্থানের পথে চলে গেলেন ঠাকুর পরিবারের বেদনাবিদ্ধ কৃতি সন্তান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর।
(লেখক – বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক)


