সম্পাদকীয়

Human Teacher: ডিজিটাল যুগেও অপ্রতিরোধ্য ‘মানব শিক্ষক’! তথ্য নয়, ‘মানুষ গড়ার শিল্পে’ কেন এআই পরাজিত?

নিছক কোড আর অ্যালগরিদম সেই মানবিক স্পর্শ, সহমর্মিতা ও অনুপ্রেরণা দিতে পারে না। সেখানেই অপরিবর্তনীয় হয়ে ওঠেন আদর্শ মানব শিক্ষক

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অনলাইন ক্লাসরুম, ভার্চুয়াল টিউটর আর ডিজিটাল মূল্যায়নের দাপট বাড়ছে, তখন শিক্ষার আসল প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে— জ্ঞান কি কেবল তথ্য প্রেরণের যান্ত্রিক প্রক্রিয়া? নাকি শিক্ষার গভীরে আছে মানুষ গড়ার শিল্প, চরিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া, যেখানে প্রয়োজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জীবন্ত সংযোগ? নিছক কোড আর অ্যালগরিদম সেই মানবিক স্পর্শ, সহমর্মিতা ও অনুপ্রেরণা দিতে পারে না। সেখানেই অপরিবর্তনীয় হয়ে ওঠেন আদর্শ মানব শিক্ষক (Human Teacher)।

করোনাকাল থেকেই দেখা গিয়েছে, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেও, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে একাকিত্ব, অনুপ্রেরণার অভাব, মনোযোগের ঘাটতি, এমনকী মানসিক অবসাদ বাড়িয়ে তুলেছে। কারণ, অনলাইন মাধ্যমে তথ্য পরিবেশন সম্ভব হলেও, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক শিক্ষার আসল প্রাণ, তা সেখানে অনুপস্থিত। আদর্শ মানব শিক্ষক শুধু পাঠ্যক্রম বোঝান না; তিনি শিক্ষার্থীর চোখে চোখ রেখে তার মনের কথা পড়ে নিতে পারেন। অনিশ্চয়তার সময় ভরসা দেন। সঠিক পথে পরিচালিত করেন (Human Teacher)।

বিশেষ করে কেজি থেকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই মানবিক ভূমিকা সবচেয়ে জরুরি। শিশুকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া, আবেগের সূক্ষ্ম দিকগুলো বোঝানো, পৃথিবী সম্পর্কে প্রথম ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা— এসব কোনও এআই করতে পারে না। গবেষণা বলছে, শৈশবের প্রথম শিক্ষালাভ কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, সংবেদনশীলতা আর সামাজিক চেতনা গঠনের ভিত্তি। এই মানসিক ও নৈতিক বীজ বপন করেন কেবল মানব শিক্ষকই।

সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক গ্রামীণ স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গোষ্ঠীগত বিবাদ দেখা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময় প্রযুক্তি নয়, বরং এক অভিজ্ঞ মানব শিক্ষক সংলাপ, বোঝাপড়া আর মানসিক সান্ত্বনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে বটে, কিন্তু মুহূর্তের আবেগ বোঝা বা সামাজিক জটিলতা সামলানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। এই একটি ঘটনার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানবিক শিক্ষকের অমূল্য ভূমিকা (Human Teacher)।

শুধু প্রাথমিক নয়, উচ্চশিক্ষাতেও একই বাস্তবতা। এ বছর কলকাতার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার চাপ ও মানসিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল এক পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী। সঠিক সময়ে এক শিক্ষক সহানুভূতিপূর্ণ আলোচনায় তাকে আত্মবিধ্বংসী সিদ্ধান্ত থেকে ফেরান। এআই যতই উন্নত হোক, এই মানসিক সংযোগ, সহমর্মিতা আর জীবনবোধ শেখানোর ক্ষমতা তার নেই (Human Teacher)।

তদুপরি, মানব শিক্ষক সমাজে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সচেতনতার বাহক। তাঁরা কেবল পাঠ্যবই পড়ান না, সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়বোধ, সহিষ্ণুতা, পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা শেখান। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা শিশুদের নিয়ে নদী দূষণ, বনসংরক্ষণ বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বাস্তব সমস্যার উপর মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম করাচ্ছেন। এভাবে শিক্ষার্থীরা শিখছে দায়িত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ— যা কোনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কেবল তথ্য সরবরাহ করে দিতে পারলেও, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অন্তরে গেঁথে দিতে পারে না।

শিক্ষার মান বিচার করার আসল মাপকাঠি কেবল পরীক্ষার নম্বর নয়; বরং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানসিক দৃঢ়তার বিকাশ। এই গুণাবলির বিকাশ ঘটান আদর্শ মানব শিক্ষক তাঁর অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, ও সহমর্মিতার দ্বারা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান সরবরাহে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মানুষ গড়ার শিল্পে মানব শিক্ষকই শেষ কথা (Human Teacher)।

সরকারও ধীরে ধীরে এই দিকটি উপলব্ধি করছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট কর্মশালা চালু হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই— শিক্ষক যেন নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রেখে শিক্ষার্থীদের পাশে মানবিকভাবে দাঁড়াতে পারেন। দুর্গাপুর ও নদিয়ার কয়েকটি স্কুলে পাইলট প্রজেক্ট শুরু হয়েছে, যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি শিক্ষকের মানবিক ভূমিকার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়— শিক্ষা কেবল তথ্যের আদানপ্রদান নয়, বরং মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া, যা কেবল মানুষই করতে পারে (Human Teacher)।

অতএব, এআইকে শত্রু নয়, সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। তবে মনে রাখতে হবে, কোনও রোবটিক টিউটর বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কখনও শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না। প্রযুক্তি হোক সহায়ক হাতিয়ার, আর শিক্ষার কেন্দ্রে থাকুক আদর্শ মানব শিক্ষক— যিনি শিক্ষার্থীর মনে আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা, জিজ্ঞাসা ও নৈতিকতার আলো জ্বালিয়ে দেন।

আজকের দিনে তাই নতুন করে উচ্চারণ করতেই হয়— শিক্ষার্থীর সুশিক্ষায় এআই নয়, আদর্শ মানব শিক্ষকই অপরিহার্য।

Related Articles