অধীরের বাম-দোস্তি ডুবিয়েছে কংগ্রেসকে, শুভঙ্কর কি পারবে দলকে চাঙ্গা করতে?
৩৫ বছরের আরামের মসনদ থেকে মমতাই তো টেনে হিঁচড়ে তাদের নামিয়েছেন।
ইন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক): অধীর রঞ্জন চৌধুরী সংসদে কংগ্রেসের লোকসভার দলনেতা এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির পদ অলংকৃত করেছেন। রাজ্য কংগ্রেসের কোন নেতার এরকম গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ সামলানো কম কথা নয়। কিন্তু তারপরেও তিনি সংগঠনকে সেভাবে বিস্তৃত করতে পারেননি। তিনি মুর্শিদাবাদ ও তাঁর লোকসভা বহরমপুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছেন। তাঁর লোকসভা আসন আর যাই-ই হোক না কেন যেন ঠিক থাকে যেন এটাই উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছিল। তাই তার কাছে বাংলায় সিপিএম-এর সঙ্গে জোটের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সাধারণ কর্মীদের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। তাঁর এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে তিনি নিজে ‘তো ডুবেছেনই, দলকেও ডুবিয়েছেন। তাঁর আম-ছালা দুই-ই গিয়েছে। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ফল অন্যরকম তো হতে পারতো। কিন্তু সেই মমতা এলার্জি, তাঁর সব কাজে অন্ধ বিরোধিতা, তার পেয়ারের দোস্ত সিপিএম-এর চক্ষুশূল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ওরা বলছে, ওদের সন্তুষ্ট করতে হবে। সিপিএম তো চাইবেই। ৩৫ বছরের আরামের মসনদ থেকে মমতাই তো টেনে হিঁচড়ে তাদের নামিয়েছেন।
দীর্ঘ দুর্নীতির প্রাসাদ গুড়িয়ে দিয়েছেন। আর আপনি না কংগ্রেসের সৈনিক, শতবর্ষ অতিক্রান্ত যে দল, যে দল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এনেছে। ওই দলটা মমতা বদ্যোপাধ্যায়ও করতেন। কিন্তু তাকে তাড়ানো হয়েছে। বড় দেরিতে হলেও কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতৃত্ব প্রদীপ ভট্টাচার্য তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছেন। যে বামেদের আমলে একের পর এক কংগ্রেস নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন, অসমঞ্জ দে, ক্ষৌনিশ বিশ্বাস, সমীর নাগের মতো নেতারা যাদের হাতে খুন হল, তাদের সঙ্গে রফা? ১৯৯৩ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘নো আইডেন্টিটি কার্ড, নো ভোট’-এর দাবিতে রাইটার্স অবরোধ করতে গিয়ে ১৩ জন যুবককে পুলিশ গুলি করে খুন করল তাদের সঙ্গে রফা? তাদের সঙ্গে জোট মানুষ মেনে নিতে পারে? সেই সময় নদিয়া জেলাতেই প্রায় ৮৫০ জন কংগ্রেস কর্মী ও নেতা খুন হয়েছেন। আর সেই সিপিএমকে কংগ্রেস কর্মীরা ভোট দেবেন? আবার সিপিএমের প্রকৃত সমর্থক ও কর্মীরা কংগ্রেসকে ভোট দেবে কেন?
তেলে-জলে কখনো মিশতে পারে? ডানপন্থী- বামপন্থী দুটিই একে অপরের আদর্শের পরিপন্থী, জোট কি করে হয়? এতে সুবিধাবাদ থাকতে পারে, অধীরের নিজের লোকসভা আসন টা সেভ হতে পারে, কিন্তু তাই-ই বা হল কোথায়? ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তাঁকেও হারতে হল। বিধানসভা নির্বাচনে ২০২১-এ মুর্শিদাবাদে একটি আসনেও জিততে পারল না কংগ্রেস। মাঝখান থেকে দুটি আসনে জিতে গেল বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হলে কংগ্রেসের এই হাল হতো না।
২০২৪- এ তিনিও ড্যাং ড্যাং করে জিততেন, তার সঙ্গে কংগ্রেসও ভাল জায়গায় থাকতো, ইন্ডিয়া জোটে বাংলা থেকে আরও ৩-৪টে লোকসভা আসন সংযোজিত হতে পারত। বঙ্গে একেবারে ধরাশায়ী হতো বিজেপি। কিন্তু অধীরবাবুর সিদ্ধান্তই তাতে জল ঢেলে দিয়েছে। সিপিএমকে নিয়ে তাঁর আবেগ থাকতে পারে, আকাঙ্খা থাকতে পারে, জেতার স্বপ্নও থাকতে পারে। কিন্তু বাম আমলে তাদের বিরুদ্ধে ঘাত-প্রতিঘাতে লড়াই করা দলীয় সৈনিকদের সেই আবেগ থাকবে কেন? তাই তো এহেন বাম- বিজেপি বিরোধীরা চড়াই উতড়াই পার হওয়া জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বেছে নিয়েছেন। কংগ্রেস ভেঙেছে, কংগ্রেস কর্মীদের মন ভেঙেছে, অধীরবাবুরা আটকাতে পারেননি। তাই সাগরদীঘির বিধানসভা উপনির্বাচনে কংগ্রেস-বাম জোট-এর জেতা প্রার্থীকেও ধরে রাখতে পারেননি।
কংগ্রেস জাতীয় দল হওয়া সত্ত্বেও ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বাংলায়। ভোটের শতাংশ হিসাবে একেবারে তলানিতে। মালদহ, মুর্শিদাবাদ খানিকটা মন্দের ভাল। শুভঙ্কর সরকার প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার পর দলের মেরামতির কাজ চলছে। কাজের কাজ কতটুকু হবে অবশ্য জানিনা, গোড়া কেটে আগায় জল ঢাললে যা হয়। তবে এই পরিস্থিতির ওপরে দাঁড়িয়ে শুভঙ্কর সরকার যে কারও সঙ্গে জোট না করার কথা ঘোষনা করেছেন, সেটার মধ্যে আন্তরিকতা ও আদর্শের ভাল দিক রয়েছে। জেতা-হারার পরের কথা। তিনি ঘোষনা করেছেন আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনেই কংগ্রেস প্রার্থী দেবে। আর কিছু না হোক প্রকৃত কংগ্রেস কর্মীরা এই ঘোষনায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
অন্তত অতীতের হার্মাদ সিপিএমের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। অধীরবাবুর পেয়ারেসিপিএমেরকে এখন অন্যপন্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হতে হবে। টকের জ্বালায় দেশান্তরি তেঁতুল তলায় বাস। কংগ্রেসের প্রকৃতরা এটা চাইবে কেন? অধীর ভাল ভাল সংগঠক, তাঁর অনেক অনুগামী, তাঁর সভায় লোকজনও হয়, কিন্তু কারা তাঁরা? প্রশ্ন ওঠে, ভিড় হয়, কংগ্রেসের ঝুলিতে ভোট পড়ে না, ব্যাপারটা কেমন গোলমেলে না? তবে রাজ্য কংগ্রেসের ভবিষ্যত কী, সময়ই বলবে। বর্তমান দলের সভাপতি শুভঙ্কর সরকার দলকে কতটা চাঙ্গা করতে পারবে সেটাও সময়ই বলবে।






