মাঠ আজও আছে, কিন্তু সঙ্গী নেই! হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের বিনোদনের পৃথিবী
এই নিয়ে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বেশ কয়েকদিন ধরে হাসি-ঠাট্টা চলল। এবার পাড়ায় বাঁশির শব্দ।
সুখময় সাহা: হঠাৎ কানে এল ডুগডুগির শব্দ, কৌতূহলি হয়ে পড়া ছেড়ে দৌড় দিলাম। দেখলাম তেমাথার মোড়ে সাপুড়িয়া বাক্স থেকে বার করছে গোখরো, কেউটে, অজগর, চন্দ্রবোড়া, শঙ্খচূড় আরও কত কী। সেদিন আবার এক জাদুকর পাড়ায় এসে কেয়ার গাল থেকে বার করেছে মুরগির ডিম, হাবিবের পকেট থেকে বার করেছে একটা মাটির পুতুল। জাদুকর বলেছিল পুতুলটি হাবিবের বউ।
এই নিয়ে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে বেশ কয়েকদিন ধরে হাসি-ঠাট্টা চলল। এবার পাড়ায় বাঁশির শব্দ। মোড়ের মাথায় তখন দুই দিকে বাঁশের খুঁটি পুঁতে তাতে আনুভূমিক ভাবে টান টান করে দড়ি বেঁধে সেই দড়ির উপর শূন্যে হাঁটছে এক কিশোরী। নীচে তার ভাই-বোনেরা জিমন্যাস্টিক প্রদর্শনীতে ব্যস্ত। চারিদিক থেকে আসছে হাততালি। এই দেখে অসীম পণ করলো সেও জিমন্যাস্টিক শিখবে। সেদিন থেকেই সে শুরু করে দিল অনুশীলন। এমনই বিভিন্ন সাংকেতিক ধ্বনির সঙ্গে পাড়ায় চলে আসত জঙ্গলের ভাল্লুক, বানর, সাপ, পাখি আরও কত কিছু। বিনোদন যেন আপনা থেকেই সামনে হাজির হয়ে যেত। মাঝে মাঝে গ্রামে আসত ‘বাইস্কোপ’।
প্রায় তিন ইঞ্চি ব্যাসের ছিদ্রে চোখ রাখতে হতো। খঞ্জনি আর গানের সুরের তালে তালে ধারা বিবরণী দিতেন বায়োস্কোপওয়ালা। আর তার সঙ্গে বাক্সের ভেতর পাল্টে যেতো ছবি। দেখতে দেখতে গল্পের জগতে হারিয়ে যেত শিশুমন। ছিল পুতুল নাচ, রাইবেঁশের মতো বিনোদনের পসরা। এরকম আরও কত স্বতঃস্ফূর্ত বিনোদনের জগৎ ছিল তার কোনও হিসাব নেই। বিকেল হলেই ছেলে-মেয়েরা এক সঙ্গে খেলতো ডাং-গুলি, কিত-কিত, মুরগি-লড়াই, ঘানি, ছোঁয়াছুঁয়ি, ধাপ্পা, কুমির-ডিঙ্গা, কানামাছি, রুমাল চুরি, পাতা-চেনা, কবাডি, গুলতি, টিপ্পি ইত্যাদির মতো আরও কত খেলা। বর্তমান প্রজন্ম এইসব খেলা তো দূরের কথা অনেকেই এগুলির নামই শোনেনি। এরপর খাওয়ার সময় অথবা ঘুমাতে যাওয়ার আগে দাদু-ঠাকুমা ঝাঁপ খুলে বসত তাঁদের গল্পের ঝুলি নিয়ে।
এইসব সুস্থ বিনোদন একদিকে যেমন পরিবারের সঙ্গে মজবুত সম্পর্কের বুনিয়াদ তৈরি করে, অন্যদিকে আবার প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে। এই সব চিত্র পাল্টে গেল আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ‘মোবাইল’ নামক যন্ত্রটি যেদিন থেকে তার শরীর বদলে নিল ‘স্কিন টাচ’ ফরম্যাটে। যদিও মোবাইল, ইন্টারনেট এগুলি বিজ্ঞানের একটা বড় আশীর্বাদ, তবুও অনলাইন নির্ভর বিনোদন চার দেওয়ালে বন্দি করল শৈশবকে। বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল শিশুরা।
পরিবর্তন এল শিশুর বিনোদনের জগতেও। তবে এই বিনোদন জগতে বেশির ভাগ শিশুই সামাজিক মেলামেশায় অক্ষম হয়ে পড়ছে। রাগ বাড়ছে, মানসিক ও আচরণগত অবনতি ঘটছে, লিঙ্গবৈষম্যপূর্ণ আচরণ শিখছে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে খেলা এবং বিনোদনের মধ্য দিয়ে, তেমনই বাইরে খেলার মধ্য দিয়ে তার সামাজিকতা বৃদ্ধি পায়, শরীর গঠনে সহায়ক হয়, শৃঙ্খলা বোধ জাগ্রত হয়, নেতৃত্ব দানের সক্ষমতা অর্জন করে৷ তাই তো ‘মাঠ আছে সঙ্গী নেই’- জগতের পারে দাঁড়িয়ে বড্ড অভাব বোধ করি ফেলে আসা শৈশবের দিনগুলি।
তবে সময় চলে তার নিজস্ব গতিতে। পুরনোকে সরিয়ে নতুন আসবে, ঠিক এই নিয়মেই বিনোদনের জগতে যেমন করে স্থান করে নিয়েছে স্মার্ট ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার, ল্যাপটপ। তেমনই সময়ের প্রয়োজনে একদিন হয়ত আধুনিক এই মাধ্যমগুলোও বিদায় নেবে নিঃশব্দে। তবে ফেলে আসা বিনোদনের মাধ্যমগুলি স্মৃতির মনিকোঠায় থেকে যাবে আজীবন।




