BJP West Bengal: বিজেপির কাছে এবারও কি অধরা থাকবে নবান্ন
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগেও বিজেপি ঠিক এমনধারা আচরণ করেছিল।
রন্তিদেব সেনগুপ্ত, বিশিষ্ট সাংবাদিক: কলিঙ্গ এবং অঙ্গ জয়ের পর বিজেপি এবার বঙ্গ জয়ের স্বপ্নে মাতোয়ারা হয়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে বলছেন, এবার টার্গেট বাংলা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলে দিয়েছেন, বাংলা দখল শুধু সময়ের অপেক্ষা। শুভেন্দু অধিকারীর মতো রাজ্যের বিজেপি নেতাদের কথাবার্তা চালচলন দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা তাঁরা দখল করেই ফেলেছেন। এবার মন্ত্রীর কুর্সিতে গিয়ে বসে পড়লেই হয়। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগেও বিজেপি ঠিক এমনধারা আচরণ করেছিল। অমিত শাহ বাংলায় এসে বলেছিলেন, ‘অব কি বার দো শো পার’। কার্যক্ষেত্রে ক্ষমতা দখলের অনেক আগেই বিজেপির রথ থেমে গিয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন উঠবে যে, এবার কি বিজেপির স্বপ্ন পূরণ হবে? নাকি এবারও নবান্ন দূরঅস্ত হয়ে থাকবে বিজেপির কাছে?
বিজেপি বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে গেলে কিছু পদক্ষেপ করতে হয়, কিছু পরিকল্পনা রচনা করতে হয়। এই পরিকল্পনা, এই পদক্ষেপ বিজেপি কতখানি করতে পেরেছে? কোন বাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তারা ক্ষমতা দখলের কথা বলছে? নাকি তাদের এইসব কথাবার্তা শুধুই কথার কথা? বলতে হয় তাই বলা, আসলে তার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই।
২৬-এর নির্বাচনেও এই বাংলায় বিজেপির প্রধান অস্ত্র সেই আদি এবং অকৃত্রিম হিন্দুত্বের রাজনীতি, হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের কৌশল। সেই সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। শুভেন্দু অধিকারীর মতো বিজেপি নেতারা বলছেন, এই রাজ্যে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গা রয়েছে। এসআইআর-এর ফলে তাদের বহিষ্কার করা হবে। আর তাতেই বিজেপির জয়ের পথ সুগম হবে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা থেকে রাজ্যস্তরের নেতারা প্রত্যেই খুব পরিকল্পিতভাবে একটি প্রচার করে চলেছেন যাতে মনে হচ্ছে এই রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ মাত্রই বাংলাদেসি অনুপ্রবেশকারী অথবা রোহিঙ্গা। এবং অস্বীকার করে লাভ নেই, একটা অংশের হিন্দু ভোটদাতারা তাতে প্রভাবিতও হয়েছেন। বিজেপি নেতারা এই প্রচার খুব পরিকল্পিতভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন একটিই উদ্দেশ্যে। তা হল, হিন্দু ভোটকে নিজেদের পক্ষে সংগঠিত করা। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, বিজেপির কাছে রাজ্যের অন্যান্য সব ইস্যু যত না গুরুত্ব পাচ্ছে, তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী-রোহিঙ্গা ইস্যুটি। ভোট আসতে আরও মাস পাঁচেক দেরি। এই সময়ের মধ্যে বিজেপি এই ইস্যুতে আরও শোরগোল তুলবে— আশা করাই যায়।
বিজেপি ভরসা করছে এসআইআর-এর ওপর। আশা করছে, এসআইআর-এ বিহারের মতোই এই রাজ্যে এক বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ পড়বে, আর সেটাই হবে তাদের তুরুপের তাস। যদিও বিহারে বিপুল সংখ্যক বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে কতজন অনুপ্রবেশকারী, সেই হিসাব নির্বাচন কমিশনই দিতে পারেনি। শুভেন্দু অধিকারীর মতো বিজেপি নেতারা এই যে অহরহ হুঙ্কার দিচ্ছেন— এসআইআর-এ এক কোটি মানুষের নাম বাদ পড়বে, তাতে আর কিছু না হোক, দুটি কাজ হয়েছে। এক, এরকম একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, এই এসআইআর প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণই রাজনৈতিক এবং বিজেপিকে সাহায্য করার জন্যই এরকম একটি কর্মকাণ্ড চলছে। দুই, বিজেপি নেতাদের নিত্যদিনের এই হুঙ্কারের ফলে হিন্দু এবং মুসলমান, দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ সাধারণ মানুষের ভেতরই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। শুধুই মুসলমানরা আতঙ্কিত হয়েছেন এমন ভাবার কারণ নেই। যে হিন্দু ভোটকে নিজেদের পক্ষে সংগঠিত করার কথা ভাবছে বিজেপি, সেই ভোটারদের একটা অংশও যে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে, সেটাই বুঝতে পারছেন না বিজেপি নেতারা। যেটা বিজেপির পক্ষে অন্তত কোনও ভাল ধারণা সৃষ্টি করছে না।
হিন্দি বলয় থেকে দক্ষ এবং ভোটকুশলী নেতাদের নিয়ে এসে বিজেপি এবার এখানে ভোট পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবছে। বিজেপির এই ভাবনা খুব নতুন কিছু এমন নয়। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ও বিজেপি তাদের এই রাজ্যের নেতাদের ওপর ভরসা না করে ভিনরাজ্য থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নেতা নিয়ে এসে ভোট পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, হরিয়ানা, রাজস্থান থেকে নেতারা এসে এখানে দু’মাস ঘাঁটি গেঁড়ে বসেছিলেন। নিজেদের রাজ্যে তাঁরা ভোটকুশলী হলেও এখানে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। বাংলার সংস্কৃতি, বাঙালির মানসিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এই নেতারা বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবটিকে বুঝতেই পারেনি। উপরন্তু রাজ্য জুড়ে এই অবাঙালি নেতাদের দাপাদাপিতে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বিজেপি বাঙালিদের পার্টি নয়। সে ধারণা বিজেপি এখনও সম্পূর্ণ নিজেদের গা থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।
ভিনরাজ্য থেকে এই অবাঙালি নেতাদের এনে লাভ যে বিশেষ হয়নি, বরং ক্ষতিই হয়েছে বেশি, এই অভিযোগ সেই সময় বিজেপির ভেতর থেকেই উঠেছিল। এইবারও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আবার সেই একই পন্থা অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নিতেই আবার বিজেপির অন্দরেই সেই ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এই ক্ষোভ যথেষ্ট ন্যায়সঙ্গতও। বাংলা সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিলে নবান্ন দখল করা যাবে কি?
এইসবের থেকেও বড় যে প্রশ্নটি তা হল, হিন্দু-মুসলমানে বিভাজনের রাজনীতি, এসআইআর, ভোটকুশলী অবাঙালি নেতা এবং গরমাগরম হুঙ্কার— এসবের বাইরে এখনও পর্যন্ত এই রাজ্যে বিজেপির সংগঠন কি সরকার বদলের শক্তি সত্যিই অর্জন করতে পেরেছে? যদি এককথায় বলতে হয়, তা হলে এর উত্তর হবে, না।
বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি বলতে, উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় এবং দক্ষিণবঙ্গের মতুয়া অধ্যুষিত কিছু বিধানসভায়। এর বাইরে বিজেপির উপস্থিতি তেমন গ্রাহ্য করার মতো নয়। কিন্তু উত্তরবঙ্গ এবং মতুয়া অধ্যুষিত বিধানসভাগুলিতেও বিজেপি ভোটের ৬ মাস আগে জমি হারাতে শুরু করেছে। তার কারণও ওই এসআইআর। যে এসআইআর-এর ওপর বিজেপি ভরসা করছে সেই এসআইআর এইসব অঞ্চলে ব্যুমেরাং হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী এবং দক্ষিণবঙ্গের মতুয়ারা এই এসআইআর-এর কারণে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কিত হয়ে পড়ছে। তার ওপর আবার মতুয়া অঞ্চলে সিএএ-র কথা বলে মতুয়াদের আরও সংশয়ী করে তুলেছে বিজেপিই। বিজেপির এই মতুয়া এবং রাজবংশী ভোটে এবার ধস নামার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। এসআইআর-এ বিজেপির আদৌ কোনও লাভ হল কিনা তা আর কিছুদিন পরেই বোঝা যাবে।
এর ওপর আছে বিজেপির আদি-নব্যের দ্বন্দ্ব। বিজেপির আদি শিবিরের নেতা শমীক ভট্টাচার্য দলের রাজ্য সভাপতি হওয়ার পর দলে আদি-দের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। আদি-দের গুরুত্ব দিয়ে দলের রাজ্য কমিটি তৈরি করার কথা বলেছেন। যদিও এখনও সেই রাজ্য কমিটি ঘোষিত হয়নি। শুধু তাই নয়, শমীক এ-ও ঘোষণা করেছেন, প্রার্থী করার ক্ষেত্রে অন্য দল থেকে আসা নব্যদের নয়, আদিদেরই গুরুত্ব দেওয়া হবে। যদি সত্যিই তাই হয় তা হলে বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে ঢুকে পড়া নেতারা আম এবং ছালা দুই-ই হারাবেন। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে, দলে শুভেন্দু অধিকারী এবং তাঁর অনুগামী নব্য নেতাদের প্রাধান্য খর্ব করতে একটি গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিজেপি আসলে উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে থেকে স্বপ্ন দেখতে চাইছে। কলিঙ্গ এবং অঙ্গ জয়ের মতোই তুড়ি মেরে বঙ্গ জয়ের যে স্বপ্ন দেখছেন বিজেপি নেতারা তা অনেকটা এই বালিতে মুখ গুঁজে বিশ্বদর্শনের মতোই। মনে রাখতে হবে ওড়িশা এবং বিহারে যেমন বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি দৃঢ়, তেমনই বিহারের মতো রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় থেকে ভোট করেছে। বাংলায় কিন্তু বিজেপি ক্ষমতাতেও নেই, তার সাংগঠনিক শক্তিও বিহার বা ওড়িশার মতো শক্ত নয়। অর্থাৎ ভোট লড়াইয়ের প্রথম ধাপেই বিজেপি অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। বিজেপি সূত্রেই জানা যাচ্ছে এসআইআর-এর কাজে বিরাট সংখ্যক বুথে বিজেপি তাদের বিএলএই দিতে পারেনি। সেখানে প্রাথমিক ধাপে অনেক এগিয়ে তৃণমূল। দ্বিতীয়ত, বিহারে আরজেডি এবং কংগ্রেস যে ভুলটি করেছিল, এখানে তৃণমূল কংগ্রেস সে ভুলটি করেনি। এসআইআর শুরুর প্রথম পর্বে বিহারে আরজেডি এবং কংগ্রেস যথেষ্ট সতর্ক ছিল না। তারা যখন বিপদ বুঝতে পেরেছে ততক্ষণে এক বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু এসআইআর নিয়ে প্রথম থেকেই সজাগ, সতর্ক থেকেছেন। এই বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই এসআইআর নিয়ে সরব হতে শুরু করেছিলেন তিনি। ফলে এই রাজ্যে এসআইআর শুরুর প্রথমদিন থেকেই বুথস্তরের তৃণমূল কর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রায় একশো শতাংশ বুথে তৃণমূল বিএলএ নিয়োগ করতে পেরেছে। এই অবস্থায় বড় কোনও গণ্ডগোল ভোটার তালিকায় করা চট করে সম্ভব নয়। পরের পর্যায়গুলিতেও নজরদারির ব্যবস্থা এখন থেকেই করে রেখেছে তৃণমূল নেতৃত্ব। এরই পাশাপাশি এসআইআর নিয়ে মানুষের মনে তৈরি হওয়া আতঙ্ককে সুকৌশলে বিজেপি বিরোধী হাওয়ায় পরিণত করতেও পেরেছে তৃণমূল। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসবে, অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিজেপি বেশি শোরগোল তুলবে, ততই এসআইআর-কে কেন্দ্র করে তাদের বিরুদ্ধে জমা হতে থাকা ক্ষোভকে ভোটের বাক্সে টেনে আনতে তৃণমূলও সক্রিয় হবে।
ধর্মীয় বিভাজনকে হাতিয়ার করে বিজেপি শহুরে উচ্চবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তের মন জয় করতে পারলেও নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, গ্রামীণ এবং প্রান্তিক ভোটাররা এখনও তাদের অনেকটাই অধরা। তার কারণ, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সামাজিক প্রকল্পগুলিতে এই অংশের মানুষরাই সবথেকে বেশি উপকৃত। তারা মনে করে, সামাজিক প্রকল্পগুলির যে সুবিধা তারা তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে পাচ্ছে, এই সরকার না থাকলে সেই সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হবে। যে কারণে এই সরকারকে পরিবর্তন করতে তারা আগ্রহী নয়। একুশের বিধানসভা নির্বাচনেই তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এই মনোভাবের কোনও পরিবর্তন কিন্তু এখনও হয়নি।
বাংলার এই রাজনৈতিক বাস্তবটি না বুঝে বিজেপি যদি শুধু এসআইআর, বিভাজনের রাজনীতি আর হিন্দি বলয়ের নেতাদের দিয়ে ভোট পরিচালনা করে জিতে আসার স্বপ্ন দেখে, তবে সে স্বপ্ন দিবাস্বপ্নই। অন্য আর কিছু নয়। পরিশেষে বলি, তৃণমূল কংগ্রেসে একজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন— যাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক পাঞ্জা লড়ার মতো কোনও নেতা বা নেত্রী এই মুহূর্তে বাংলায় নেই।






