ফিচার

ভারতের কৌশলী সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, বিপাকে খালিস্তানিরা

একটা দেশের বিরুদ্ধে কত সহজে একটা মারাত্মক অভিযোগ আনা যায়, সেটা দেখিয়ে দিলেন ট্রুডো

The Truth of Bengal: নয়ের দশকে একটি বিখ্যাত হিন্দি ছবি মুক্তি পেয়েছিল। তার নাম ‘প্রতিবন্ধ’ সেই ছবিতেই খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে নাম কুড়িয়েছিলেন রামি রেড্ডি। তাঁর মুখে বলা একটি বিখ্যাত সংলাপ ছিল, ‘টেনশন লেনেকা নেহি, দেনে কা’ অর্থাৎ টেনশন নেওয়ার কিছু নেই, টনশন দিতে হবে’। ছবির সংলাপ যে কালজয়ী হয়েছে তা বলা বাহুল্য, কিন্তু এই সংলাপের দার্শনিক ব্যঞ্জনা রয়েছে এবং তা সরকারি সিদ্ধান্তেও তার প্রতিফলন দেখা যায়, এই প্রথমবার দেখা গেল।

মাস চারেক আগে কানাডায় এক গুরুদ্বরার সামনে কোনও অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতী খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে হরদীপ সিং নিজ্জরকে। সে ছিল ভারতের ঘোষিত খালিস্তানি সন্ত্রাসবাদী। জি ২০ সামিটের পরেই দেশে ফিরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সরাসরি অভিযোগ আনেন, হরদীপের হত্যাকাণ্ডে সরাসরি হাত রয়েছে ভারতের। একটা দেশের বিরুদ্ধে কত সহজে একটা মারাত্মক অভিযোগ আনা যায়, সেটা দেখিয়ে দিলেন ট্রুডো। কানাডার প্রধানমন্ত্রী যে নিজের গদি বাঁচাতে খালিস্তানি সন্ত্রাসবাদীদের মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন, তাও আজ পরিষ্কার। কারণ তাঁর সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি। আর সেই দলের প্রধানের নাম জগমীত সিং। তিনি হলেন খালিস্তানি নেতাদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।

জাস্টিন ট্রুডো ভেবেছিলেন, ২৪-এর নির্বাচনের আগে, ভারতকে ভরপুর টেনশন দেওয়া যাবে। তাই তিনি জি-২০ সামিটের পর দেশে ফিরে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থেকে পিছিয়ে গেলেন এবং একটি বোমা ফাটালেন। প্রশ্ন হল, এই বোমা ফাটানোর কোনও ভিত্তি আছে কি? না কোনও ভিত্তি নেই। কানাডার পুলিশ গোয়েন্দা গত চার মাস ধরে বহু কসরত করেও, একটি ভারতীয় মাছিকেও পাকড়াও করতে পারেনি। আততায়ীতো দূর অস্ত্। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব দিক থেকে এগিয়ে থেকেও হরদীপ সিং নিজ্জরের মতো একজন জনপ্রিয় কানাডার প্রথম শ্রেণির নাগরিকের হত্যাকাণ্ডের কোনও সূত্রসন্ধান করতে পারেনি। কিন্তু ফাঁকা আওয়াজ ছেড়েই দিলেন। আশা ছিল, তাঁর পাশে দাঁড়াবে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের কিছু দেশ এমনকী ব্রিটেন। কিন্তু, তারা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেই দায় সেরেছে।

ট্রুডো এখানেই থামেননি, লাগাতার প্রচার শুরু করে দিয়েছিল, ভারতের বিরুদ্ধে। দেশের নাগরিকদের ট্রাভেল অ্যাডভাইজারিও জারি করে, কাশ্মীর এবং উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে যেন কানাডার নাগরিকরা সফরে না যান। এর পরেই একের পর এক পাল্টা মার দেওয়া শুরু করে ভারত। কানাডা যা পদক্ষেপ করে, ভারতও তার পাল্টা দেয়। অতি সম্প্রতি ভারত যে পদক্ষেপ করেছে, তা দেখলে বোঝা যায়, রামি রেড্ডির জনপ্রিয় সংলাপের ভাবরূপ, টেনশন লেনেকা নেহি দেনেকা।

 আরও পড়ুন- খালিস্তানের এক গোপন অধ্যায়, যা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল

কানডার কূটনৈতিক আক্রমণের পরেই, ভারতেও, খালিস্তানি নেতা সমর্থকদের তালিকা তৈরি করে সম্পত্তি ক্রোক করা শুরু করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে আরও একটি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছে সেটি হল, OCI card ওসিআই কার্ড বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ কানাডায় রয়েছেন অনাবাসী ভারতীয়দের দেওয়া হয় এই কার্ড। যাঁরা ভারতের নাগরিক অথচ বিদেশে কর্মসূত্রে থাকেন। বিদেশমন্ত্রক ইতিমধ্যেই তালিকা প্রস্তুত করতে শুরু করেছে, যাঁরা ভারতীয় নাগরিক ওসিআই কার্ড হোল্ডার অথচ খালিস্তানিদের সমর্থন করছে, অর্থ সাহায্য করছে, তাদের কার্ড বাতিল করা হবে। ফলত, তারা দেশেও ফিরতে পারবেন না, এমনকী বিদেশের মাটিতে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলামও পাবেন না। তাদের সম্পত্তিও এদেশে ক্রোক করা হবে। এই স্ট্রাইকের পরেই কার্যত কানাডার মাটির গরম হতে শুরু করেছে।

ভারতের এই সিদ্ধান্তের পরেই, একটি খবর ভাসতে শুরু করেছে, কানাডা হয়তো  এবার একটি ব্রহ্মাস্ত্র ছাড়বে। সেটি হল, ভারতের শেয়ার মার্কেটে, কানাডা পেনশন প্ল্যানের ১৫ হাজার ৭১২ কোটি টাকা লগ্নি করেছে। সেই টাকা তুলে নিলে জোর ধাক্কা খেতে পারে ভারতের শেয়ারবাজার। সূত্রের খবর, কোটাক, জোমাটো, ডেলিভারি অ্যান্ড ইন্ডাস টাওয়ারসহ মোট ৬টি কোম্পানিতে লগ্নি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মত, ভারত কানাডা সম্পর্কের টানাপোড়েনে লগ্নি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেটা ক্ষতি হবে, কানাডারই। কারণ সেই লগ্নি তুলে অন্য কোথাও বিনিয়োগ করতে হবে। আর বিশ্বে সবচেয়ে বড় ফাস্টেস গ্রোয়িং ইকোনমি ভারতেরই রয়েছে।

আরও পড়ুন- ইন্দিরা গান্ধী ও গুপ্তধন খোঁজার কাহিনী

ইউরোপে এমনকি ব্রিটেনেও মন্দা চলছে। আর এই লগ্নি ভারত থেকে চলে গেলেও ২ শতাংশ মতো ক্ষতি হবে, যা খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না ভারতে। ফলত সার্বিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাচ্ছে, জাস্টিন ট্রুডো টেনশন দিতে গিয়ে নিজেই ভরপুর নিয়ে বসে রয়েছেন। অগত্যা কদিন আগে পর্যন্ত যে সুর ছিল ট্রুডোর গলায়, সেই সুর নরম হতে দেখা গিয়েছে গত দুদিনে। তার ইঙ্গিত মিলেছিল গত পরশুই। বিবিসির এক সাংবাদিক জাস্টিন ট্রুডোকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, কোনও ভিত্তি ছাড়াই ভারতের বিরুদ্ধে এমন একটি অভিযোগ আনা হল, তারপর যে দু দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকছে, তাতে যে কানাডার ক্ষতি হচ্ছে, এটা কি মনে করেন? কারণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠে আসছে ভারত। পাশাপাশি ইন্দো প্যাসিফিকে স্ট্র্যাটিজিক লোকেশন হিসেবে ভারতের গুরুত্ব অপরিসীম।

এর উত্তরে ট্রুডো স্বাকীর করেন, ভারত যে বৃহত্তম অর্থীনিতির দেশ হয়ে উঠছে, এবং ট্র্যাটিজিক লোকেশন হিসেবে সুসম্পর্কের প্রয়োজন তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তাঁকে দেশের নাগরিকদের সুরক্ষার দিকটিও ভাবতে হবে। অর্থাৎ হরদীপের মৃত্যুকে হাতিয়ার করে, পশ্চিমের দেশগুলিকে নিয়ে যে চাপ দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন ট্রুডো, তা কার্যত উল্টো হয়ে গিয়েছে। পাশে খালিস্তানি নেতারা ছাড়া কেউ নেই। এমনকী দেশের ভূমিজ নাগরিকদের মধ্যে থেকেই আওয়াজ উঠতে শুরু করেছে, এ কী করছেন ট্রুডো!

Related Articles