দেশ

মহিলাদের গোপন ভিডিও ফাঁসের হুমকি মানেই অপরাধমূলক ভীতিপ্রদর্শন! সাফ জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছে যে, ওই ভিডিও বা যে ডিভাইসটি দিয়ে ভিডিওটি রেকর্ড করা হয়েছিল, তা উদ্ধার না হওয়া কোনওভাবেই সাজা বাতিলের ভিত্তি হতে পারে পারে না।

Truth of Bengal: বিয়ের জন্য জোরাজুরি করলে এক মহিলার স্নান করার গোপন ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অপরাধে এক ব্যক্তির সাজা বহাল রাখল দেশের শীর্ষ আদালত (বিজয়কুমার বনাম তামিলনাড়ু রাজ্য)। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনও মহিলার এই ধরনের ব্যক্তিগত মুহূর্তের দৃশ্য ইন্টারনেটে প্রকাশ করার হুমকি দেওয়া ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৫০৬ ধারার ২ নম্বর অংশ (অপরাধমূলক ভীতিপ্রদর্শন) অনুযায়ী তাঁর ‘সতীত্ব বা চরিত্র’ নিয়ে অপবাদ দেওয়ার শামিল।

বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি এন কে সিং-এর ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দিয়ে জানিয়েছে, যে ভিডিওটির অস্তিত্ব রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে এবং সেটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার যে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা জনসমক্ষে এনে অভিযোগকারিণীর চরিত্রহনন করার জন্য যথেষ্ট। আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছে যে, ওই ভিডিও বা যে ডিভাইসটি দিয়ে ভিডিওটি রেকর্ড করা হয়েছিল, তা উদ্ধার না হওয়া কোনওভাবেই সাজা বাতিলের ভিত্তি হতে পারে পারে না। বেঞ্চের কথায়, “আইন কখনই বলে না যে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে কোনও বস্তু উদ্ধার করাটাই সাজা দেওয়ার একমাত্র পূর্বশর্ত (sine qua non)।” আদালতের মতে, আসল বিষয় হলো মহিলাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন কি না যে এমন কোনও ভিডিও সত্যিই আছে এবং সেই হুমকির কারণে তিনি আতঙ্কিত ও বিপর্যস্ত হয়েছিলেন কি না।

ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে ‘সতীত্ব’ বা ‘চরিত্র’-এর ধারণাকে একবিংশ শতাব্দীর মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং যৌন স্বাধীনতার প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। বেঞ্চ জানিয়েছে, সতীত্বকে এখন আর কেবল সনাতন সামাজিক নৈতিকতার চশমায় দেখা চলে না। সামাজিক মূল্যবোধের পাশাপাশি একজন মহিলার নিজস্ব যৌন সংবেদনশীলতার ওপর ভিত্তি করেই এটি নির্ধারিত হওয়া উচিত। বর্তমান ডিজিটাল যুগে কোনও মানুষের মর্যাদা ও গোপনীয়তা সরাসরি তাঁর ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন সুনামের সঙ্গে জড়িত। একজন মহিলার নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের অধিকার রয়েছে এবং তিনি নিজেই ঠিক করবেন কোন বিষয়টি ব্যক্তিগত থাকবে। সেই স্বাধীনতায় কোনও অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপই তাঁর চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করার সমান।

মামলাটির সূত্রপাত ২০১৫ সালে, যখন এক মহিলা অভিযোগ করেন যে, দুই বছর ধরে সম্পর্কে থাকা এক ব্যক্তি তাঁর স্নানের দৃশ্য গোপনে রেকর্ড করে এবং পরে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথমে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে পিছিয়ে যান এবং সম্পর্ক বজায় রাখার চাপ দিলে ভিডিওটি আপলোড করার হুমকি দেন। নিম্ন আদালত সায় ও সম্মতির ভিত্তিতে তৈরি সম্পর্কের কারণে অভিযুক্তকে ধর্ষণ ও প্রতারণার অভিযোগ থেকে খালাস দিলেও অপরাধমূলক ভীতিপ্রদর্শনের (IPC 506 Part II) দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে, যা পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টও বহাল রাখে।

এর পর অভিযুক্ত ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, অন্য সব ধারায় তিনি খালাস পেয়ে গেছেন এবং পুলিশ কোনও মোবাইল ফোন বা ভিডিও উদ্ধার করতে পারেনি, তাই এই সাজা টিকতে পারে না। সুপ্রিম কোর্ট সেই যুক্তি খারিজ করে জানায়, অপরাধমূলক ভীতিপ্রদর্শন একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অপরাধ এবং এটি আলাদাভাবে প্রমাণিত হতেই পারে। মোবাইল ফোন উদ্ধার না হওয়া এই মামলার ক্ষেত্রে কোনও বাধা নয়। আদালত শেষ পর্যন্ত সাজা বহাল রাখলেও, ঘটনাটি ২০১৫ সালের পুরনো হওয়ায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির জেলের মেয়াদ কমিয়ে ইতিমধ্যেই খেটে ফেলা মেয়াদের সমান করে দেয়। মামলায় আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী এম পি পার্থিবন এবং তামিলনাড়ু সরকারের পক্ষে আইনজীবী শবরীশ সুব্রহ্মণ্যম সওয়াল করেন।

Related Articles