কলকাতা

‘কেউ টাকা চাইলেই পুলিশকে জানান’, বণিকসভায় অভয় দিলেন শমীক, খোঁচা সৌরভকেও

শমীক স্পষ্ট করে দেন যে, নতুন জমানায় শিল্প স্থাপনের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে আর ‘কাটমানি’ বা চাঁদা দিতে হবে না

Truth of Bengal: রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর শিল্পায়নের পথে থাকা সমস্ত রাজনৈতিক বাধা দূর করার অঙ্গীকার করলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। মঙ্গলবার বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি দেশ ও বিদেশের শিল্পপতিদের পশ্চিমবঙ্গে নির্ভয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। শমীক স্পষ্ট করে দেন যে, নতুন জমানায় শিল্প স্থাপনের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে আর ‘কাটমানি’ বা চাঁদা দিতে হবে না।

অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় শমীক ভট্টাচার্য পূর্বতন তৃণমূল সরকারের শিল্পনীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত দেড় দশকে রাজ্যে মেধার বিকাশের কোনো সুযোগ ছিল না এবং শিল্পের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তৃণমূল আমলে আয়োজিত ‘গ্লোবাল বিজনেস সামিট’ বা বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, সেই সময় যাঁরা মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর পাশে থাকতেন, তাঁদের গত ১০ বছরের হিসেব নিকেশ বা ব্যালেন্স শিট খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে তাঁরা আসলে তাঁদের মূলধন উত্তরাখণ্ড বা উত্তরপ্রদেশের মতো ভিন রাজ্যে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।

এদিনের মঞ্চ থেকে রাজ্যের দীর্ঘদিনের জটিল জমিনীতি পরিবর্তনের পক্ষেও সওয়াল করেন শমীক। তিনি জানান, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব বা হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলোতে যেভাবে জমি অধিগ্রহণ করা হয়, পশ্চিমবঙ্গেও সেই ধাঁচে নতুন জমিনীতি আনা হবে। শিল্পপতিদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “আপনারা নির্ভয়ে কারখানা তৈরি করুন। কোনো রাজনৈতিক কর্মী আপনাদের কাছে টাকা চাইতে আসবে না। যদি কেউ বাধার সৃষ্টি করে, তবে সরাসরি পুলিশকে জানান।” তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে টলিউডের বর্তমান অচলাবস্থার কথা এবং নাম না করে ‘শিল্পপতি’ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কেও খোঁচা দেন তিনি।

তবে এই নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দল ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বর্তমান সরকার নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়, বরং এটি পশ্চিমবঙ্গের সরকার। তাঁর মতে, অতীতে সরকার এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম বিভাজন রেখাটি মুছে গিয়েছিল, যা এবার আরও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। রাজ্যে শিল্পের অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান সংকল্প বলে তিনি দাবি করেন।

২০২৩ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্পেন সফরের প্রসঙ্গ টেনে শমীক বলেন, “আমি চাই না স্পেনে দাঁড়িয়ে কেউ পশ্চিমবঙ্গে শিল্প কারখানা তৈরির কথা বলুক। এ রাজ্যের মাটিতে দাঁড়িয়েই এখানকার জন্য বিনিয়োগ হোক।” উল্লেখ্য, ওই সফরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গী হয়েছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। মাদ্রিদের একটি বাণিজ্য সম্মেলনে সৌরভ ঘোষণা করেছিলেন যে, মেদিনীপুরের শালবনিতে একটি নতুন ইস্পাত কারখানা গড়ে উঠবে। সেই ঘটনাকে ইঙ্গিত করেই শমীকের কটাক্ষ, “আমি এক ভদ্রলোককে চিনতাম, যিনি স্টেপ আউট করে ওভার বাউন্ডারি মারার জন্য পরিচিত ছিলেন। কিন্তু পরে দেখলাম তিনি বাউন্ডারির বাইরে থেকে বল থ্রো করছেন! স্পেন থেকে বাংলার শিল্পের ঘোষণা হচ্ছে, অথচ সেই শিল্প এখন কোনো মাইক্রোস্কোপ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”

শিল্পের পাশাপাশি বিনোদন জগত নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। তিনি সাফ জানান, টলিউড বা চলচ্চিত্র জগতের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ‘দখলদারি’ এবার বন্ধ হবে। সিনেমা তৈরি থেকে শুরু করে প্রেক্ষাগৃহে তার প্রদর্শন— কোনো ক্ষেত্রেই আর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না বলে তিনি আশ্বাস দেন। কলাকুশলী এবং প্রযোজকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিল্পপতিদের উদ্দেশ্যে শমীকের অভয়বাণী, “আপনারা স্বাধীনভাবে ব্যবসা করুন, কেন্দ্রীয় সরকার আপনাদের পাশে আছে।” রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর শিল্পপতিরা যে এবার রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবেন, সেই বার্তাই এ দিন বারবার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি। তাঁর মতে, বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য নয়, বরং বাস্তবমুখী পদক্ষেপই পারবে বাংলার শিল্পের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে।

Related Articles