সম্পাদকীয়

বিজেপির ‘ব্লু আইড বয়’ বিতর্কিত হিমন্ত বিশ্বশর্মা

কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, অসমের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ে তাঁর স্ত্রী রিনিকি ভুঁইয়ার সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১৫ গুণ বেশি!

প্রবীর মজুমদার: ভারতীয় জনতা পার্টির থিঙ্ক ট্যাঙ্কের মতে, তাদের জন্য সবচেয়ে ‘সহজ’ লড়াই হতে চলেছে অসমে। আর এই অসমে বিজেপির প্রচারের প্রধান মুখ আর কেউ নন, খোদ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী তথা উত্তরপূর্ব ভারতের রাজনীতির সবচেয়ে বড় মুখ হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তবে ভোটের ময়দানে তাঁর দাপট যতখানি, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এবং নির্বাচনী হলফনামায় তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সম্পত্তির খতিয়ানও ততটাই চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, অসমের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ে তাঁর স্ত্রী রিনিকি ভুঁইয়ার সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১৫ গুণ বেশি! আর এই বিপুল সম্পত্তির খতিয়ান সামনে আসতেই নতুন করে আসরে নেমেছে বিরোধীরা।

সারদা থেকে পিপিই কেলেঙ্কারি, কংগ্রেস মন্ত্রিসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময় থেকেই একাধিক অভিযোগ উঠেছিল হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিরুদ্ধে। রাতারাতি ‘বিজেপি ওয়াশিং মেশিন’-এ নিষ্কলঙ্ক হয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও সেই অভিযোগের তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে। একইসঙ্গে তাঁর স্ত্রী রিনিকি ভুঁইয়ার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।জালুকবাড়ি কেন্দ্র থেকে ফের প্রার্থী হয়েছেন হিমন্ত। ২০০১ সালে প্রথমবার কংগ্রেসের টিকিটে জেতার পর থেকে ওই আসন তাঁর দখলেই। ২০১৫ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়ে ২০১৬ ও ২০২১ সালে জয়ী হন। এবারও নিজের গড়ে লড়ছেন তিনি। নির্বাচনী হলফনামায় হিমন্ত জানিয়েছেন, তাঁর কোনও স্থাবর সম্পত্তি নেই। অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ২.৩৬ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি। মূলত মুখ্যমন্ত্রী ও বিধায়ক হিসাবে পাওয়া বেতনই তাঁর আয়ের উৎস। তবে তাঁর নামে ৯৫ লক্ষ টাকার ঋণও রয়েছে।

অন্যদিকে, স্ত্রী রিনিকি ভুঁইয়ার সম্পত্তি স্বামীর তুলনায় বহুগুণ বেশি। হলফনামায় তাঁর মোট সম্পত্তি দেখানো হয়েছে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থাবর সম্পত্তি ১৯.২৫ কোটি এবং অস্থাবর সম্পত্তি ১৩.৫৪ কোটি টাকা। বিভিন্ন বিনিয়োগ মাধ্যমেও রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। তবে তাঁর নামে ঋণের পরিমাণ ১৫.৯১ কোটি টাকা। রিনিকি একাধিক মিডিয়া সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এবং চিকিৎসা সামগ্রী ব্যবসায়ও সক্রিয়। কংগ্রেসের অভিযোগ, লুইস বার্গার থেকে সারদা, পিপিই কিট থেকে ফ্লাইওভার— বহু কেলেঙ্কারিতে যুক্ত হিমন্ত ও তাঁর স্ত্রী। কোটি কোটি টাকার বেনামি সম্পত্তির অভিযোগও তুলেছে বিরোধীরা। কংগ্রেসের পবন খেরা গত রবিবার নতুন করে রিনিকির দুই দেশের পাসপোর্ট, এক দেশের গোল্ডেন কার্ড এবং বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকার অভিযোগ এনেছেন। এর পরই পবন খেরার দিল্লির বাসস্থানে অসম পুলিশ হানা দেয়। হিমন্ত হুঙ্কার দিয়ে জানিয়েছেন, দরকার হলে পাতাল থেকেও পবনকে গ্রেফতার করা হবে। এই হুঙ্কারই ইঙ্গিত দিচ্ছে হিমন্ত আর পরিবারের বিরুদ্ধে তোলা পবন খেরার অভিযোগ নিতান্তই অমূলক নয়। নচেৎ শান্ত প্রতিক্রিয়ায় হিমন্ত বলতেই পারতেন, তিনি এবং তাঁর পরিবার যে কোনয় তদন্তের জন্য প্রস্তুত।

এই সব অভিযোগের পাশাপাশি খুন, অস্ত্র আইন ও টাডা মামলার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। রাজ্যের বিরোধীদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর স্ত্রীর সংস্থাগুলিকে বেআইনিভাবে সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক মন্তব্য, বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে অশালীন রুচিহীন মন্তব্য করে হয়ত বিজেপির ‘গড ফাদার’দের কাছে ‘ব্লু আইড বয়’ হয়ে উঠতে চেয়েছেন। তবে সব মিলিয়ে তিনিই আজকের ‘অমৃত কালের ভারত’-এর সবচেয়ে বিতর্কিত মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন।

Related Articles