সুকান্ত পাল: পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে শব্দ দূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কখনও কখনও প্রাণঘাতী দূষণও হয়ে ওঠে। এই এই শব্দ দূষণের জন্য যেমন মানুষের বধিরতার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনই অন্যান্য বিষয়ও আছে যা আমাদের শ্রাব্যতা কমিয়ে দিচ্ছে দিন দিন। গুগল মশাই জানাচ্ছে, এই মুহূর্তে ভারতের ৬০ মিলিয়ন মানুষ শ্রবণ প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে। এই সংখ্যাটি আমাদের জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের প্রতি এক হাজার জন নবজাতকের মধ্যে দুই থেকে তিনজন শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতীয় শিশুদের বধিরতার হার প্রায় দুই শতাংশ। স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যে এই হার পাঁচ থেকে নয় শতাংশ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই হারে যদি বধিরতা বাড়তে থাকে তবে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের প্রতি দশ জনের মধ্যে একজনের এই শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা বা বধিরতার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দিন দিন এই বধিরতার হার বৃদ্ধির কারণ শব্দ দূষণ। অনিয়ন্ত্রিত শব্দের ফলে মানুষের শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের ক্ষতি হচ্ছে মারাত্মকভাবে। তবে শুধু শব্দ দূষণই একমাত্র কারণ নয়। এর সঙ্গে আধুনিক যুগে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মধ্যে হেডফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহার একটি অন্যতম কারণ। কনসার্ট, ক্লাব, পার্টি এক কথায় কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাটানো এবং রাস্তাঘাটে বিভিন্ন যানবাহনের অতি উচ্চগ্রামে হর্ন, বিভিন্ন মিছিলে বিশেষ করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মিছিলে অতি উচ্চ গ্রামে মাইক, ডিজে আমাদের হৃদযন্ত্রের সঙ্গে শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের উপরও মারাত্মক খারাপ প্রভাব ফেলছে। এইসব বিষয়গুলি আমাদের জীবনে নিয়ে আসছে বধিরতার মতো এক ব্যাধি। বিভিন্ন তথ্য, সমীক্ষা ও প্রমাণ দ্বারা এই বধিরতার ভয়াবহতা আমাদের চিন্তিত না করে পারে না।
এই ব্যাধি শরীর কেন্দ্রিক এবং তা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। একজনের বধিরতায় আমরা মর্মাহত হই। তার প্রতি ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই, তার চিকিৎসার জন্য উপদেশ এবং বিভিন্ন রকমের সহায়তার জন্য এগিয়ে যাই। কিন্তু অন্য এক ধরনের বধিরতা আমাদের জীবন ও সমাজকে দিন দিন দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে তুলছে। যাকে আমি অন্তরের বধিরতা বলে আখ্যায়িত করছি। আমরা জানি, ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে যখনই রাষ্ট্র এবং ক্ষমতাবানরা ও আধিপত্যবাদীরা নাগরিকদের উপর অহেতুক ভাবে অনৈতিক শোষণ-শাসন, দমন-পীড়ন নামিয়ে এনেছে, বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে জনগণকে বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত করেছে তখনই সেই দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার হয়ে ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছেন। স্বৈর শাসন পৃথিবীতে কোনওদিনই চিরস্থায়ী হয়নি। হয়ও না।
সমাজ এবং নাগরিকদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সঙ্কট মুহূর্তে সাধারণ মানুষকে চিরকালই পথের নিশানা দেখিয়েছেন সেই দেশের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজ। তারা যে কোনও রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিপ্লবের পথপ্রদর্শক হয়েছেন। তারা মানুষের কন্ঠে প্রতিবাদের ভাষা জুগিয়েছেন। মানুষ প্রভাবিত ও উজ্জীবিত হয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বর্তমানে বিভিন্ন শাসক ও ক্ষমতাবানদের অনৈতিক কাজকর্ম, মানবতাবিরোধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে এখন এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছে। এর বিরুদ্ধে সেই সব বুদ্ধিজীবী বা শিক্ষিত মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ। অন্তর থেকে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক এবং দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভাষার ভীষণ অভাব। এও এক ধরনের বধিরতা। বাইরের বধিরতার বিভিন্ন সমীক্ষা ও তথ্য দিয়ে আমরা একটা চিত্র খুঁজে পাই। কিন্তু এই বধিরতার চিত্র খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল। কারণ বিভিন্ন মিছিল-মিটিং, সভা, সমিতির মঞ্চে এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অনেক সময় দেখা যায় এইসব বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিতরা এমন ভাবে এই দুর্বৃত্তায়নের সমালোচনা করছেন যেখানে সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে সেই সমালোচনা আসলে এক ধরনের আত্মপ্রতারণা এবং প্রকৃতপক্ষে শাসক শ্রেণির পক্ষেই যায়। জনগণ বা সাধারণ মানুষের সামনে এক ধরনের ইতিবাচক প্রপঞ্চের প্রবক্তা এরা। বধিরতার থেকেও এ আরও ভয়ঙ্কর। আবার অন্যদিকে যদি অদ্ভুত নীরবতা পালন করা হয় যাকে আমি বধিরতা বলছি সেটাও এক ধরনের আত্মরক্ষা। কারণ এই বধিরতা নিজেদের একটি নিরাপদ বৃত্তের মধ্যে সুরক্ষিত রাখার জন্য। রাষ্ট্রের অন্যায় কাজকর্মের বিরুদ্ধে এক উদাসীন নীরবতা কিন্তু সব সময়ই সুবিধাবাদের জন্ম দেয়। তাদের এই সুবিধাবাদী নীতি ও নীরবতা যাকে বধিরতা বলে চিহ্নিত করছি তা কিন্তু পরোক্ষে রাষ্ট্রের স্বৈরতন্ত্রকেই সাহায্য করে।
আজ বড় দুর্দিন। আজ আমাদের বধিরতা বাহিরে অন্তরে। বাইরের অর্থাৎ শারীরিক বধিরতার চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু অন্তরের এই বধিরতার চিকিৎসা নেই। চিকিৎসকও নেই। শারীরিক বধিরতার বিভিন্ন কারণ যেমন আছে তেমনই এই অন্তরের বধিরতার কারণও আছে। তা হল মানসিক দূষণ, আত্মসুখ, আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মমর্যাদাহীনতা। তাদের এই বধিরতা একদিন ভেঙে চুরমার করে দেবে সাধারণ নাগরিকরাই। তাই দিনরাত ভরসা রাখি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের উপরই। তারাই একদিন ইতিহাস পাল্টানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবেন। বিশ্বের ইতিহাস তো আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়েছে!






