অন্ধকারের অমানিশা কাটিয়ে এক আধুনিক নেশনের স্বপ্নদ্রষ্টা রামমোহন
কারণ সেই প্রেক্ষাপটেই আমরা বুঝে নিতে চাই রাজা রামমোহন রায়ের মানবতাবাদী বৈশিষ্ট্যটিকে।
সুকান্ত পাল (বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): আমরা জানি ফরাসী ঐতিহাসিক মিশেলে ‘রেনেসাঁস’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন তাঁরই ‘ফ্রান্সের ইতিহাস ‘গ্রন্থের সপ্তম খন্ডে। এই ‘রেনেসাঁস’ শব্দটির বাংলা করা হয় নবজাগরণ বা নবজাগৃতি। সভ্যতার প্রথম লগ্ন থেকে যে অনবরত ইতিহাস বয়ে চলেছে তাকে বিভিন্ন সময়ে,সেই সময়ের চরিত্রকে বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন সময়কে বিভিন্ন নামে নামাঙ্কিত করে দেগে দেওয়ার একটা প্রবনতা আমাদের মধ্যে বর্তমান। যাইহোক, আমরা এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণের ইতিহাস ও চরিত্র বিশ্লেষণ করব না। যদিও আমাদের এই প্রবন্ধের শিরোনামের জন্য নবজাগরণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে আলোচনার মধ্যে একটু আনতেই হবে। কারণ সেই প্রেক্ষাপটেই আমরা বুঝে নিতে চাই রাজা রামমোহন রায়ের মানবতাবাদী বৈশিষ্ট্যটিকে।
নবজাগরণের অনেক অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হল যুক্তিবাদ এবং এই নবজাগরণের সামগ্রিক চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘মানুষ’। মানুষের জন্যই সব। মানুষকে বাদ দিয়ে কিছু হয় না। এই প্রাথমিক ধারণাটিকে আমাদের চেতনায় আগেই প্রতিষ্ঠা করে নিতে হবে। বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণের অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায়। আমাদের একটা কথা স্মরণে রাখতে হবে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই তাঁকে ‘ ভারত পথিক’ আখ্যায় ভূষিত করেছিলেন। তিনি এই আখ্যা দিয়েছিলেন এই কারণেই যে তিনি ভারতবর্ষের আত্মাকে আবিষ্কার করেছিলেন এবং ভারতবর্ষকে চলার শক্তি যুগিয়েছিলেন। ভারতবর্ষ ও ভারতবাসী স্মৃতি ও পুরাণে ভারে আচ্ছন্ন হয়ে অন্ধকারময় এক জীবন চর্চার মধ্য দিয়ে চলছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজেই রামমোহনের কাছ থেকে জীবনের আদর্শ গ্রহন করেছিলেন। এখান থেকেই বোঝা যায় তিনি কেন ‘রাজা’!
অবশ্য দ্বিতীয় আকবর তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন বলেই তিনি ‘রাজা’ নন… ভারতবর্ষের মানুষ তাদের অন্তরের গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে গ্রহণ করেছিল বলেই তিনি ‘রাজা’। এই রাজাই ছিলেন ভবিষ্যৎ ভারতের নবজাগরণের বার্তাবাহী দূত এবং অগ্রপথিকও বটে। এ প্রসঙ্গে বিপিন চন্দ্র পাল বলেন, ‘রাজা রামমোহন হইতেই বাংলার নবজাগরণের সূচনা, অনেকে এ কথা কহিয়া থাকেন। কথাটা সত্য বলিয়া মনে হয়। রাজাই প্রথম বাংলার সনাতন স্বাধীনতা প্রবৃত্তি ও মানবতাকে বর্তমানের উপযোগী করিয়া ফুটাইয়া তুলিতে চাহেন। জীব যেমন জাগে ও ঘুমায়, সমাজও সেইরূপ এক-একবার জাগিয়া উঠিয়া আপনার লক্ষ্য সাধনে প্রবৃত্ত হয়, আবার সেই লক্ষ্য ভুলিয়া গিয়া যেন ঘুমাইয়া পড়ে। নিদ্রা টা তমোগুনের প্রাবল্য হেতু আমাদিগকে আসিয়া আচ্ছন্ন করে।
কোনও জাতি যখন ঘুমাইয়া পড়ে তখন এই তমোগুনের দ্বারাই সে একান্তই অভিভূত হয়। আলস্য, অজ্ঞানতা এ সকলই তমোগুনের লক্ষণ। তম অভিভূত হইলে সমাজ যাহা চলিয়া আসিতেছে তাহাতেই গা ঢালিয়া দেয়। ধর্ম এবং কর্ম উভয়েই তখন প্রাচীন নেমিবৃত্তি অবলম্বন করিয়া একান্ত গতানুগতিক হইয়া পড়ে।শাস্ত্রাদির প্রামান্য তখন বিচারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় না। যেখানে জিজ্ঞাসাই জাগে না সেখানে বিচারের অবসর কই? আমাদের সমাজও রাজা রামমোহনের সময়ে এই দশাই প্রাপ্ত হইয়াছিল।’
এই সময়ে বা এই অবস্থায় রামমোহনের নেতৃত্বে একটি জাতির জাগরণ শুরু হয় বা বলা যেতে পারে তিনিই যেন তাঁর যাদুকাঠির স্পর্শে একটি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর যে উদার মানবিকতাবোধ ও যুক্তিবাদী মন তা কিন্তু মানুষের মধ্যেকার তমকে দূর করে এক নতুন আলোর সন্ধান দিয়েছিলেন। তাঁর মতে মানুষের মধ্যে এই উদার অজ্ঞাতসারে নিজের প্রকৃতির মধ্যে সুপ্ত থাকে। তাকে জাগ্রত করতে হয়। সবাই তা পারে না। আর তখনই প্রয়োজন হয় কোনো যুগন্ধর পুরুষের সাহায্য – এই কাজটিই করেছিলেন রামমোহন। আমরা আগেই বলেছি যে নবজাগরণের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যই হল মানবতাবাদ।এটা শুধু ভারতীয় নবজাগরণের ক্ষেত্রেই নয়, ইতালির রেনেসাঁশেও লক্ষ্যনীয়। তাই প্রথিতযশা ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন, হিউম্যনিজিমকে রনেশাঁসের একটি বিশেষ লক্ষন অবদান বলে ধরা হয়। কি তার স্বরূপ? … ‘ হিউম্যানিস্ট ‘এর বদলে আমরা মানবতাবাদী শব্দ ব্যবহার করি, যেন চন্ডীদাসের ‘সবার উপরে মানুষ সত্য ‘ বা সহজিয়াদের সাধনার সঙ্গে হিউম্যানিজিমের কোন তফাৎ নেই।
অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি যে নবজাগরণের বৈশিষ্ট্য যে মানবতাবাদ তা কিন্তু মানুষকে কেন্দ্র করেই। সেদিক থেকে দেখতে গেলে নবজাগরণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষ। মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গল , অগ্রগতি ভাবনার বিকাশ ও অন্তরের অফুরন্ত সৌন্দর্য ভান্ডার ও সম্ভাবনাকে বিকশিত করার, তার মধ্যেকার যুক্তিশীলতাকে, ইতিবাচক দিকগুলির বিকাশ সাধন করাই ছিল নবজাগরণের মূল কর্ত্তব্যের মধ্যে প্রধান। অর্থাৎ একটি মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনই ছিল এর উদ্দেশ্য। আর এই কাজে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে ভারতবর্ষকে নেতি থেকে ইতির দিকে এগিয়ে দিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। এক পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের যে আকাঙ্ক্ষা সেই আকাঙ্ক্ষাকে বহন করেই রামমোহন এই কাজে নেতৃত্ব দেন। পৃথক পৃথক জাতির ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম এবং তার ধর্মীয় বিধান মানুষকে পৃথক করে রাখে।
তিনি এই সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গিকে উচ্ছেদ করে এক অখন্ড মানসিক ঐক্যভূমি গড়তে চেয়েছিলেন।” হিন্দুর যা ছিল শ্রেষ্ঠতম, মুসলমানের যা ছিল সর্বাপেক্ষা প্রিয়তম, খ্রিস্টানদের যা ছিল গভীরতম তার সঙ্গে তিনি নিজেকে পরিচিত করেছিলেন। দেশকালের সীমাকে অতিক্রম করে, বিশেষ বিশেষ জায়গায় আবদ্ধ মানব গোষ্ঠীর সংকীর্ণতাকে ত্যাগ করে চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। তিনি জীবন-দর্শন বোধের একনিষ্ঠ পূজারী ও দিগভ্রষ্ট মানুষজনের দিশারী। আসলে রামমোহনের ইতিহাস চেতনা ছিল প্রবল। তাই তিনি ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থাকে বেশ ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাঁর সেই অনুভব ও জ্ঞান তাকে পরিচালিত করেছিল এক দৃঢ় মানববাদী ধারণা প্রতিষ্ঠার বৃহৎ ও মহৎ কর্মযজ্ঞে। তিনি তাঁর স্বদেশকে চিনতে পেরেছিলেন তাই তাঁর আহ্বান ছিল এক সুমহৎ ঐক্যের আহ্বান, সাম্যেরএবং মৈত্রীর আহ্বান।
তাঁর উজ্জ্বল জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হৃদয়ে হিন্দু- মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কারু প্রতিই কোনও সংকীর্ণতা কাজ করেনি। এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ না করে পারছি না, তা হলো রামমোহনের একটিমাত্র প্রতিকৃতি পাওয়া যায় যা ব্রিস্টলের যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এই ছবিটি এঁকেছিলেন বিশ্ব বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এইচ পি ব্রিগস্। এই ছবিতে রয়েছে রাজার হাতে একটি বাইবেল আর ছবির পিছনের প্রেক্ষাপটে রয়েছে একটি মন্দির ও মসজিদের ছবি। এই ছবিটি রামমোহন সম্বন্ধে আমাদের কাছে রেখে যায় অনেক গভীর তথ্য ও তথ্যের ইঙ্গিত। আমাদের ভাবনার জগতকে এক গভীর স্তরে নিয়ে যায়।
মানবতাবাদী রামমোহন জানতেন যে একটি ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হলে আগে যায় শিক্ষা।
রামমোহনের স্বপ্নই ছিল উন্নত ভারতবর্ষ গড়ে তোলা এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য শিক্ষাই একটি মস্ত বড় হাতিয়ার। রামমোহনের এই সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছিল তাঁর পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্যই। ইউরোপীয় মহাদেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান বিভিন্ন সমাজ সংস্কার ও মানবতা আন্দোলন এবং বিপ্লবের আদর্শ তাঁর মনোভূমি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল যথার্থই বলেছেন,”… he helped to establish public education in India on the basis of real and useful knowledge, more particularly science, and the application of science to industry, similarly he avoided the fallacy of the physiocratia economists in putting agriculture against manufacturer “.
এই উদ্ধৃতি থেকেই রামমোহনের শিক্ষা ভাবনার মধ্যে যে উদার মানসিকতার সঙ্গে গভীর আধুনিকতার ঘনিষ্ট যোগাযোগের সূত্রটিকে। তিনি বুঝেছিলেন ও উপলব্ধি করেছিলেন যে ভারতবর্ষের মন- মানসিকতা মধ্যযুগীয় জাতি, ধর্ম,বর্ণ লাঞ্ছিত ভাবধারায় পরিপূর্ণ। এর থেকে মানুষের মুক্তি পেতে হলে শিক্ষার আধুনিকীকরণ ও প্রসার অবশ্যম্ভাবী। অনেকেই মনে করেন যে রামমোহন আমাদের বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষার প্রচার ও প্রসারে যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাংলা ভাষার প্রচারেও প্রসারে তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এই মুহূর্তটি মেনে নেওয়া যায় না। কারণ রামমোহনের ছিল এক উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও তার বিশ্ববীক্ষা ছিল শুধু মানুষের জন্যই।
এই প্রসঙ্গে কয়েকটি উদ্ধৃতি এখানে জরুরী হয়ে পড়ছে। রামমোহনের বাংলা ভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমীহ ভাব ছিল। তিনি ইংরেজির উপরে বাংলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় মর্যাদা বোধের বিরল দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। রামমোহনই সর্বপ্রথম ইংরেজিতে বাংলা ব্যাকরণ লিখে এবং বাংলা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন ।রামমোহন আন্তরিকভাবেই চেয়েছিলেন ইংরেজরা বাংলা ভাষা শিখুন, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলুন; অবাধে পারস্পরিক ভাবের প্রদান করুন। তাই তিনি প্রস্তাব দিলেন, The English in India should adopt Bengali as their language.
শুধু তাই নয় বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে তিনি যে ব্যাকরণটি লেখেন, সে সম্বন্ধে ভাষাচার্য ডঃ সুকুমার সেন একটি অব্যর্থ বাক্য লিখেছিলেন। তিনি সেই বাক্যে বলেন যে রামমোহন রায়ের এই ভালো ব্যাকরণখানি ছিল বলিয়াই বোধকরি বিদ্যাসাগর শিশু পাঠ্য বাংলা ব্যাকরণ লিখেন নাই। শুধু তাই নয় তার লেখা ব্যাকারণটি যে ছিল বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে লেখা- একথা রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীও বলেন। এছাড়া রামমোহনের মানবতাবাদী শিক্ষা চিন্তার একটি স্বচ্ছ ধারণা পাই প্রভাচন্দ্র গাঙ্গুলীর লেখায়।
তখন পাশ্চাত্য শিক্ষাকে উপেক্ষা করে প্রাচ্য শিক্ষার উপর ভারতীয়দের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। কিন্তু রামমোহনের সতর্কিত মন এই বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করেন, কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান দূরে সরিয়ে রাখলে আমরা কখনোই ইউরোপীয়দের দ্বারা আমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতির উপর যে প্রাধান্য রয়েছে তাকে পরাস্ত করতে পারব না। এ থেকেই রামমোহনের শিক্ষা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সর্বোপরি এক আধুনিক মন মানসিকতাকে বোঝা যায়। যে মন সবসময় তাঁর দেশের মানুষের মঙ্গল সাধনের সাধনায় নিমগ্ন থাকত, নবজাগরণের যে উজ্জ্বল মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তা উপরের বিষয়টির মধ্যেই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
আধুনিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই সমাজের নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ যেমন জরুরী, তেমনি নারীর মর্যাদাও প্রয়োজন। মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা মধ্যে আটকে থেকে নারীকে নানাভাবে নিষ্পেষণ করে সমাজকে পঙ্গু করে দিলে আধুনিকতার স্বপ্ন কোনদিনই যেমন সফল হয় না তেমনি সমাজে নারীর অবস্থানটাও হয়ে যায় দ্বিতীয় শ্রেণী নাগরিকের সমতুল্য।
আমাদের ভারতের সামাজিক ইতিহাসে সমাজে নারীর অবস্থান কি ছিল তা আমরা জানি। পিতা , স্বামী ও পুত্রের অধীন তাদের জীবন ছিল এক বদ্ধ জলাশয়ের ন্যায়। কোন সামাজিক স্বাধীনতা তো তাদের ছিলই না বরং অনেক সময় তাদের প্রতি গৃহপালিত পশুর ন্যায় আচরণ করা হয়েছিল (অকাল বিবাহ) বাল্যবিবাহ, সহমরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন লাঞ্ছনা অত্যাচারে সেটা পারিবারিক হোক অথবা সামাজিক হোক সব দিক থেকেই ছিল জর্জরিত এবং অবমাননাকর। মানুষ হিসেবে তাদের তখন কতখানি দেখা হতো তা সন্দেহ আছে। ঠিক এই জায়গা থেকেই রামমোহনের অনেক অনেক সমাজ সংস্কার মূলক কার্যাবলীর মধ্যে নারীর পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার রক্ষা ও সতীদাহ প্রথা রদের আন্দোলনের আলোচনা করা যায়।
এখানে আমরা দেখি যে সমাজে নারীর অমর্যাদা মূলক অমানবিক অবস্থান নিয়ে তিনি ছিলেন ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন। তাঁর কাছে মানুষ ‘MAN’ শব্দটির একটা বিশেষ তাৎপর্য ছিল। মানুষ বলতে এখনো আমাদের ধারণায় প্রথমেই একজন পুরুষের অবয়ব ফুটে ওঠে। তাঁর কাছে কিন্তু তা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ‘শাশ্বত মানুষের” বা ইটারনাল ম্যানের যে ধারণা তা মূর্ত হয়ে ওঠে রামমোহনের কাজের মধ্যে। তাঁর কাছে… the ward ‘man’ does not mean merely that incomplete half which is the Purusha , but complete to whole in the perfect union of the Prakriti…
নারীদের সম্পর্কে তাঁর এই ধারণা উপরের উদ্ধৃতি থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। তাঁর সময়কালে ভারতীয় নারীদের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয়। তিন নারীকে শুধুমাত্র জননী ,জায়া, ভাগিনী, কন্যা অথবা শুধুমাত্র পুরুষের অনুগামিনী হিসেবে দেখেননি। তিনি নারীকে এক নতুন যুগের, নতুন প্রভাতের আলোর কিরণে দেখতে চেয়েছিলেন। নারীর ব্যক্তি স্বত্তা ও স্বাধীনতার উপর জোর দিয়ে নতুন যুগের জন্য, আধুনিক সমাজ গড়ার জন্য, নারীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন এক মুক্তি সূর্যের পতাকা।
সেই সময়কালে নারীদের তিনি যেমন দেখেছিলেন তার উপর ভিত্তি করে তিনি একটি কবিতা লেখেন –
“কি ভুলালো হায়
কল্পনাকে সত্যি করি জান, একি দায়!
আপনি গড়ে যাকে,
যে তোমার বশে তাঁকে
কেমন ঈশ্বর ডাকে,করে অভিপ্রায়?
কখন ভূষণ দেও, কখনো আহার;
ক্ষনেকে স্থাপহ, ক্ষনেক কর্মজীবন সংহার।
প্রভু বলি মানে যারে
সম্মুখে নাচাও তারে—-
হেন ভুল এ সংসারে দেখেছ কোথায়?”
এক গভীর মানবতাবাদী উপলব্ধি থেকে তাঁর এই উচ্চারণ। তাই তদানীন্তন ভারতীয় মহিলাদের প্রতি বিভিন্ন অবিচার ও পীড়ণ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তিনি আন্দোলন শুরু করেন—-যার মধ্যে অন্যতম ছিল সতীদাহ প্রথা বা সহমরণের মতো এক বর্বর ও অমানুষিক প্রথা। এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে গোঁড়া হিন্দু সমাজের প্রতিরোধের এবং প্রতিহিংসার সম্মুখীন হতে হয়েছে বারবার । কিন্তু মানবতাবাদী, অকুতোভয়, দৃপ্তচিত্তের অধিকারী রামমোহন এই অসম যুদ্ধে জয়লাভ করেন প্রবল মানসিক দৃঢ়তা ও তার গভীর শাস্ত্র জ্ঞানের দ্বারা। গোঁড়া হিন্দুদের তিনি শাস্ত্রের অস্ত্রেই কুপোকাত করেন এবং অবশেষে ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ সরকারকে এই সতীদাহ প্রথা রদ আইন পাশ করাতে সমর্থ হন।
বাল্যবিবাহ সম্পর্কে রামমোহনের কোনো রচনা না পাওয়া গেলেও আমরা বলতে পারি যে তাঁর মতো যুগন্ধর পুরুষ নিশ্চয়ই এই বাল্যবিবাহকে সমর্থন করতেন না এবং তার প্রমাণ আমরা পাই তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যাকে তিনি বিয়ে দিয়েছিলেন ১৬ বছর উত্তীর্ণ হওয়ার পর। তিনি বহু বিবাহেরও বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর অন্যতম সাফল্য ছিল সতীদাহ প্রথা আইন মোতাবেক রদ করা। নারী শিক্ষা ও নারীর সম্পত্তি অধিকার সম্বন্ধেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সচেতন।
বিলাতে গিয়ে সেখানকার নারী সমাজের অবস্থা দেখে বুঝতে পারেন যে নারীরা আপন ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল ও ভাস্বর। অনন্ত তাদের মধ্যেকার সম্ভাবনা। অথচ ভারতীয় নারীদের এদের তুলনায় ভারতীয় সমাজ নানান কুসংস্কার এবং নারী বিরোধী নীতি গ্রহণ করে তাদের দমিয়ে রেখেছে। এই অবস্থা থেকে তাদের মুক্তির প্রয়োজন; প্রয়োজন এই নিপীড়নের হাত থেকে উদ্ধার করা। রামমোহনের এই যে নারী প্রগতির ভাবনা তা কিন্তু ভারতীয় নবজাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সবশেষে আমরা বলতে পারি যে রামমোহন ছিলেন নবজাগরণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু মানবতাবাদের এক অন্যতম প্রবক্তা। ভারতবর্ষের মানবিক ও সামাজিক উত্তরণের জন্য তিনি কখনোই পশ্চিমের বিশুদ্ধ রাজনৈতিক তত্ত্বকে বা প্রতিষ্ঠানের আমদানিকে সমর্থন করেননি। আমরা তাঁর কাছ থেকেই তো আধুনিক নেশনের ধারণার ভিত্তিতে জাতীয় সংহতির ধারণাকে ধারণ করতে পেরেছি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষণের ধারার সাথে ব্যক্তিসত্তার স্বীকৃতি ও বিকাশের সূত্র গুলি তিনি তো আমাদের মধ্যে বপন করেছেন । ভারতের বাস্তব অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখেই তিনি তাঁর বিপুল কর্মযজ্ঞে এগিয়ে গেছেন- এক একলা পথিকের এক প্রত্যয়ী, নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতাকে অবলম্বন করে। ভারতবর্ষকে আধুনিকতার পথনির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন। এখানেই তিনি অনন্য এবং সর্বাধিনায়ক। তিনি ভারত পথিক। সার্থক তাঁর জীবন দর্শন।






