সম্পাদকীয়

Freedom Pioneer: বিপ্লবী গুরু অশ্বিনীকুমার

একাধারে তিনি আদর্শ শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবী, তেমনই সমাজ সংস্কারের প্রাণপুরুষ।

নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস: আজ আমরা পরাধীনতার গ্লানিমুক্ত স্বাধীন ভারতবর্ষের নাগরিক (Freedom Pioneer)। ভাবতে কষ্ট হয়, জানি না, স্বাধীনতার মর্ম আমরা কতখানি অনুধাবন করতে পেরেছি। বিস্ময় জাগে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর শহিদবৃন্দ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কেমন স্বাধীন ভারতবর্ষ দেখতে চেয়েছিলেন। আর কেমন স্বাধীনতা আজ আমরা উপভোগ করছি। পরাধীন দেশমাতার পায়ের শিকল মুক্ত করতে কত তরতাজা যুবক-যুবতী রক্তঝরা আন্দোলনে সশস্ত্র সংগ্রামে প্রাণ বলি দিয়েছিল তার সঠিক হিসাব আজও নেই। আজ আর কেউ চাই না অতীত দিনের কদর্য ইতিহাস ঘাঁটতে। অবকাশ আজ কারও নাই। তাই শোনা যায় না কারও মুখে বিপ্লবী গুরু মহান অশ্বিনীকুমার দত্তের আত্মত্যাগের কথা।

আমরা অনেকেই জানি না, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরু কে? তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন আত্মভোলা একনিষ্ঠ সমাজসেবী অশ্বিনীকুমার দত্ত। একাধারে তিনি আদর্শ শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবী, তেমনই সমাজ সংস্কারের প্রাণপুরুষ। জন্মেছিলেন ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারি, তখনকার অবিভক্ত বাংলাদেশের বরিশাল জেলার পটুয়াখালি মহকুমার অন্তর্গত বাটাজোর গ্রামের এক উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন কায়স্থ ভরদ্বাজ গোত্রীয় দত্ত পরিবারে। পিতা ছিলেন মুন্সিপ ব্রজমোহন দত্ত। পরে তিনি সাব জজ, জেলা জজে উন্নীত হয়েছিলেন। মাতা ছিলেন বানোরি পাড়ার রাধাকিশোর গুহের কন্যা প্রসন্নময়ী দেবী। তাঁরা ছিলেন দুই ভাই, চার বোন।

অশ্বিনী কুমার ছিলের সকলের বড়। অশ্বিনীকুমারের বাবা-মা দুজনেই ছিলেন মানবতাবাদী ও স্বদেশপ্রেমী (Freedom Pioneer)। চাকুরে পিতার দৌলতে তিনি ঢাকা, দৌলত খাঁ, রংপুর প্রভৃতি বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেছেন। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে অশ্বিনীকুমার প্রবেশিকা পরীক্ষা বসতে উৎসুক হন। তখন তাঁর বয়স মাত্র চৌদ্দ বছর। সতেরো বছরের নীচে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসতে না পারায়, বয়স বাড়িয়ে পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে এফএ পাশ করে যান এলাহাবাদ হাইকোর্টে। সেখান থেকে আইন পাশ করে বাংলায় ফিরে আসেন।

১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ২৩ বছর বয়সে তিনি বিএ পাশ করেন। এক বছর বাদে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে বিএল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সে বছরেই তিনি শ্রীরামপুরের সন্নিকটে চাতরা উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদে নিয়োগপত্র পান। মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ অশ্বিনীকুমার সমাজসেবার সঙ্গে সমাজ সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। সমাজকল্যাণকর কাজ ও বরিশাল জেলার উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ (Freedom Pioneer)।

তখনকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রমেশচন্দ্র দত্তের অনুরোধে সুযোগ্য সুসন্তান অশ্বিনীকুমার দত্ত পিতা কলকাতার জজ ব্রজমোহন দত্তের নামে বরিশাল শহরে তাঁদেরই দানের জমির উপর ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ শে জুন ব্রজমোহন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে পিতার পরামর্শ নিয়ে বিদ্যালয়টি পূর্ণাঙ্গ কলেজে রূপান্তর করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেও পিতা ব্রজমোহনের জীবদ্দশায় সক্ষম হননি। প্রথম দফায় ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন বিএম স্কুলে এফএ ক্লাস যুক্ত করলে বিদ্যালয়টি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজের মর্যাদা পায়। পরবর্তী সময়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগর কলেজের অধ্যক্ষ রো সাহেবের পৃষ্টপোষকতায় কলেজটি প্রথম শ্রেণিতে রূপান্তর ঘটে। প্রথম চেয়ারম্যান হন ফাদার স্ট্রং সাহেব এবং ১৮৮৯- ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের জন্য অধ্যক্ষ নিয়োজিত হন জ্ঞানেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী। অশ্বিনীকুমার দত্ত বরিশাল শহরে ব্রজমোহন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নামে আরও একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

মহান পুরুষ অশ্বিনীকুমার দত্ত। তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের শারীরিক মানসিক ও নৈতিক বিকাশের জন্য জীবনের কুড়িটি বসন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নিঃস্বার্থে শিক্ষাদান করেছেন। শুধু তখন কেন এখনকার দিনেও এমন নজির চোখে পড়া দুষ্কর। তবে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এমন এক মহান পুরুষের সান্নিধ্য আমার সঙ্গে পেয়েছিলেন অনেকে। তিনি ছিলেন কলিকাতার এক দরিদ্র পরিবারের সুসন্তান, আমার মাস্টারমশাই জিতপুর পাল উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পরিমলকৃষ্ণ রায়। তিনিও ছিলেন সমাজসেবী ও মানবপ্রেমী (Freedom Pioneer)। নিরামিষ ভোজী মাস্টারমশাই নিজের খাওয়া-পরা বাদে মাসিক বেতনের সমস্ত অর্থ দুঃস্থ ছাত্র ও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতামাতাদের দান করতেন। তাঁর জীবনের দীর্ঘ ইতিবৃত্ত বর্ণনায় যাচ্ছি। অশ্বিনীকুমার দত্ত জীবনভর সাহিত্য ও সমাজ সেবায় নিয়োজিত থেকে স্থানীয় জনমানবের চোখে দেবতা স্বরূপ হয়ে উঠেন।

সমাজের অপ্রিয়, বঞ্চিত অবহেলিত মানুষদের তিনি সত্যিকারের মানুষ গড়ে তুলেছিলেন। বাউণ্ডুলে বখাটে চরিত্রের মুকুন্দ দাসকে রাস্তা থেকে নিজের বাড়িতে তুলে আনেন। খাইয়ে পরিয়ে লেখাপড়া শিখিয়ে গড়ে তুললেন নতুন মানুষ চারণকবি। তাঁরি আন্তরিক প্রচেষ্টায় মুকুন্দদাস, চারণসম্রাট মুকুন্দ দাস হয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। পারিবারিক অর্থবৈভব ও সামাজিক দায়িত্ববোধ, কর্তব্যপরায়ণতায় তিনি এমন জনসমর্থন অর্জন করেন, যা তাঁকে ১৯০৫-১৯১১ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সংকীর্ণ জেলা থেকে বৃহত্তর প্রাদেশিক রাজনৈতিক আঙিনায় পৌঁছে দেয়। কার্যসাধনে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘জয়সমিতি’ ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ‘বাখরগঞ্জ হিতৈষীসভা’ প্রভৃতি স্থানীয় সংগঠনগুলির সহায়ক, পথপ্রদর্শক হয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে অশ্বিনীকুমার দত্ত বরিশাল পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ অবধি দায়িত্ব পালন করেন।

কংগ্রেস দলের কর্মী হয়ে অশ্বিনীকুমার অন্যান্য সংগঠনের সমর্থকদের নিয়ে শহরের চরম ও নরমপন্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থেকে অতি সন্তর্পণে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখেন (Freedom Pioneer)। তাঁর হাতে গড়া স্বদেশবান্ধব সমিতির স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে বরিশালে স্বদেশি আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেন। তাঁর নেতৃত্বে সারা জেলায় ১৬০টিরও বেশি শাখা গড়ে উঠে। ভয় পেয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁকে বরিশালেই গ্রেফতার করে। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সংগঠিত সমিতির উপর নিষেধাঞ্জা জারি হয়। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ অবধি তিনি লক্ষ্মৌ জেলে বন্দি থাকেন।

স্বদেশি ব্যাঙ্ক, হিন্দুস্থান কোঅপারেটিভ ইনস্যুরেন্স এবং কো অপারেটিভ নেভিগেশন লিমিটেড প্রভৃতি অর্থনৈতিক সংস্থাগুলির সঙ্গে অশ্বিনীকুমার সক্রিয় ভাবে জড়িত থেকেছেন। বরিশালে স্বদেশবান্ধব সমিতির মুখপত্র বরিশাল হিতৈষী পত্রিকা প্রকাশের তিনিই প্রধান সহায়ক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, আমাদের দেওয়া বক্তৃতাগুলি যদি যাত্রাপালা হিসাবে প্রতিটি গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতাম তা হলে এত সময়ের অপচয়, অর্থ খরচে সভার আয়োজন করে ভাষণ দেওয়ার প্রয়োজন হতো না।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে আরও বেশি মজবুত ও জোরালো করতে, বরিশালের টাউনহলে এক জ্বালাময়ী ভাষণে অশ্বিনীকুমার দত্ত, গণসচেতনতা বাড়াতে পত্রপত্রিকার প্রচারের স্পষ্ট অভাববোধ লক্ষ্য করে বিস্তারিত ব্যক্ত করেন (Freedom Pioneer)। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় ‘বিকাশ’, ‘স্বদেশী’, ‘বরিশাল’, ‘বরিশাল হিতৈষী’ প্রভৃতি পত্রিকাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল। ‘দুর্গোৎসব তত্ত্ব’ ‘আত্মপ্রতিষ্ঠা’ ‘ভারতগীতি’ ‘ভক্তিযোগ’ ‘কর্মযোগ’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলি ও প্রায় শতাধিক গান তিনি রচনা করে গেছেন। ১৯১০ থেকে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ অবধি অসুস্থ শরীরে রোগের সঙ্গে লড়াই করে দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। সম্ভবত ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি অথবা শেষের দিক থেকে ভীষণ শারীরিক অসুস্থতা বোধ করতে থাকেন।

অবশেষে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর কলিকাতার বাসভবনে বরিশালের রূপকার ভারতবর্ষের স্বাধীনতা বিপ্লবী গুরু অশ্বিনীকুমার দত্তের হৃৎস্পন্দন চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। জীবনের শেষ কটাদিন কলিকাতার বাগুইআটির যে এলাকায় তিনি থাকতেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর স্মৃতি রক্ষায় ও সম্মান জানাতে এলাকাটির নামকরণ করেছেন ‘অশ্বিনী নগর’।

Related Articles