রাজ্যের খবর

বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় কথায় তিনি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী, জানেন তাঁর পরিচয়?

নিজের জীবনে নিশ্চিত চাকরি উপেক্ষা করে, ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসার জগতে এগিয়ে এসেছিলেন যুবকটি। তাতে সফলও হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত।

রাজু পারাল: কলকাতার ডালহৌসি চত্বরের জমজমাট একটি রাস্তার নাম ‘আর এন মুখার্জী রোড’। যাঁর নামে রাস্তা তাঁর নাম অনেকেরই অজানা আজও। এতটাই তিনি বিস্মৃতির অতলে চলে গেছেন। অথচ মার্টিন ট্রেন তথা মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার পূর্বে ভারতবর্ষের এক অন্যতম বাঙালি প্রজুক্তিবিদ ও শিল্পপতি স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। নিজের জীবনে নিশ্চিত চাকরি উপেক্ষা করে, ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসার জগতে এগিয়ে এসেছিলেন যুবকটি। তাতে সফলও হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। কিন্তু প্রশ্ন হল আত্মবিস্মৃত বাঙালি কতটা মনে রেখেছে তাঁকে।

প্রতি বছরই তাঁর জন্ম তারিখটি (২৩ জুন) নি:শব্দে চলে যায় আর বিস্মরণে রয়ে যান কলকাতা তথা বাংলার এই রূপকার। একজন ঠিকাদার হিসেবে জীবন শুরু করলেও পরবর্তীকালে হয়ে উঠেন একজন সুদক্ষ স্থপতিকার তথা সফল শিল্পপতি। বাঙালি এই যুবকটির সাফল্য দেখে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেন,’তিনি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী। ‘ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এক স্মরনসভায় তাঁকে ‘বাংলার তথা ভারতের শ্রেষ্ঠ পুরুষদিগের বাঙালি বলে অভিহিত করেছিলেন।

কর্মবীর রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট শহর থেকে কিছুটা দূরে ভ্যাবলা গ্রামে, মাতা ব্রহ্মময়ীর গর্ভে। পিতা ভগবান চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন বারাসাত কোর্টের প্রসিদ্ধ উকিল। রাজেন্দ্রনাথের যখন বয়স মাত্র ৬ বছর বয়স তখন তিনি মারা যান। পিতৃহারা বালক রাজেন্দ্রনাথ মায়ের কাছেই মানুষ হতে থাকেন। সারাটা জীবন তাই রাজেন্দ্রনাথের আচার – আচরণে, জীবন চর্চায় মায়ের প্রভাব বড় বেশি লক্ষ্য করা যেত।

রাজেন্দ্রনাথের লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় গ্রামের গুরু মহাশয়ের পাঠশালায়। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়ায় গণিতে তাঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি জন্মে। যা তাঁকে পরবর্তীকালে ব্যবসা বাণিজ্যে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভে সাহায্য করে। বাংলার আদ্র জলবায়ু রাজেন্দ্রনাথেরস্বাস্থ্যের অনুকূল না হওয়ায় পনেরো বছর বয়সে চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে উত্তরপ্রদেশের আগ্রায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় মাতামহের কাছে। উদ্দেশ্য ছেলে একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আদৰ্শ পুরুষ হয়ে উঠবে। বলবাহুল্য, রাজেন্দ্রনাথ মায়ের সংকল্প বাস্তবে পরিণত করেছিলেন।

আগ্রায় রাজেন্দ্রনাথের পড়াশোনার উৎসাহ লক্ষ্য করে মামা দ্বারকানাথ তাঁকে ‘ সেন্ট জনস কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করে দেন। ঐ স্কুলেই রাজেন্দ্রনাথ লেখাপড়ায় প্রভুত উন্নতি করেন। শিক্ষা চলাকালীনই পরিবারিক চাপে রাজেন্দ্রনাথের বিবাহ সম্পন্ন হয়। এরপর ভবানীপুরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে লন্ডন মিশন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চাকরির প্রত্যাশায় না থেকে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পাঠ নেওয়া শুরু করেন। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তা সমাপ্ত করতে পারেননি।

শেষপর্যন্ত মাত্র তিন হাজার টাকা পুঁজিকে সম্বল করে শুরু করলেন ঠিকাদারি ব্যবসা। যদিও সেই ব্যবসায় ওই সামান্য পুঁজি কিছুই নয় তবুও অসীম মনোবল, ধৈর্য্য, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও দুরদর্শিতাকে সম্বল করে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কলকাতা মহানগরীর একজন প্রসিদ্ধ ঠিকাদার হিসেবে সুনাম অর্জন করলেন। পরিশ্রমী এবং ঐকান্তিক চেষ্টা সম্বলিত মানুষকে ঈশ্বর কোনও না কোনও ভাবে সাহায্য করেন। ঈশ্বরের সেই ইচ্ছাতেই একটি ঘটনার মাধ্যমে রাজেন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায় তৎকালীন কলকাতা কর্পোরেশনের মুখ্য ইঞ্জিনিয়ার ব্রাডফোর্ড লেসলির সঙ্গে। লেসলি সাহেব চিড়িয়াখানার সামনে দেশীয় মজদুরদের দিয়ে একটা কাজ করাচ্ছিলেন। কিন্তু ভারতীয় মজদুররা ভাষাজনিত কারণে লেসলির নির্দেশ কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না। সৌভাগ্যবশত রাজেন্দ্রনাথ সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। ব্যাপারটা বুঝে তিনি এগিয়ে এসে মজদুরদের সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলেন সাহেবের নির্দেশ। পক্ষান্তরে রাজেন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানেই কাজটা সম্পন্ন হয়। ইঞ্জিনিয়ার লেসলি বুঝতে পারলেন রাজেন্দ্রনাথের কর্মদক্ষতা ও পরিচালন ক্ষমতা।

এর পরে লেসলি সাহেব রাজেন্দ্রনাথকে দিয়ে পলতা পানীয় জল প্রকল্পের কাজটি করান। কাজটি রাজেন্দ্রনাথ যে ভাবে দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করেন তা দেখে সকলেই বিস্মিত হন। পরে রাজেন্দ্রনাথ ভারতের বড় বড় শহরগুলিতে, বিশেশত উত্তর ভারতের এলাহবাদ, আগ্রা, লক্ষ্ণৌ, মিরাট, বেনারস এবং নৈনিতালের মতো শহরের জ্বলপ্রকল্পের কাজগুলিও একে একে সম্পন্ন করেন। এই কাজের সূত্রেই একদিন যোগাযোগ হয় টমাস অ্যাকুইনাস মার্টিনের সঙ্গে। ১৮৯২ সালে তাঁরই সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গড়ে তুললেন ‘ মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি ‘। মূলত রাজেন্দ্রনাথের উদ্যোগেই এই মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি বাংলা এবং বাংলার বাইরে ন্যারো রেল ব্যবস্থার পত্তন করে যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯০৬ সালে মার্টিন সাহেবের মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র ই.এস.মার্টিনকে সংস্থার পার্টনার হিসেবে নেওয়া হয় এবং রাজেন্দ্রনাথ এই কোম্পানির প্রধান অংশীদার হন। ১৯৪৭ সালের আগে পর্যন্ত মার্টিন কোম্পানি অজস্র ছোট রেল চালু করে ভারতবর্ষকে পৌঁছে দেয় রেলগাড়ির স্বর্ণযুগ রূপে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘মার্টিন ট্রেন ‘।

আমাদের পশ্চিমবঙ্গে হাওড়া – আমতা এবং হাওড়া – শিয়াখালা’র একটা বিরাট সংখ্যক মানুষের কাছে তো বটেই, পরবর্তীকালে বারাসাত – বসিরহাটেও এই লাইট রেলওয়ে চালু হয়ে মানুষের কাছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। পরে পূর্ব ও উত্তর কলকাতার বুক চিরে চলে যেত এই ট্রেন। শ্যামবাজার থেকে যাত্রা শুরু করে পাতিপুকুর, বাগুইআটি, হাতিয়ারা, রাজারহাট, লাঙলপোতা, হাড়োয়াখাল, খড়িবেড়ি, আমিনপুর, বেলিয়াঘাটা। বেলিয়াঘাটা ছিল জংশন স্টেশন। এখানেই সংযোগ হত বারাসাত থেকে হাসনাবাদ মার্টিন রেলের মুল শাখা। শ্যামবাজার থেকে আসা ট্রেন ক্রমশ বেলিয়াঘাটা, কার্তিকপুর, দেগঙ্গা, বেড়াচাঁপা, স্বরূপনগর, ধান্যকুড়িয়া, গাইন গার্ডেন হয়ে টাকি রোড প্রভৃতি স্টেশন ছুঁয়ে পৌঁছত হাসনাবাদে। কলকাতাস্থিত অফিসে যাতায়াতের কারণে অনেক লোকজন ছাড়াও প্রচুর মাছ, আনাজপাতি এই রেলপথে পরিবহন হত।

বড় কাছের, বড় আপন ছিল এই ট্রেন। কালের নিয়মে হারিয়ে গেলেও প্রবীণদের মনে এখনও উঁকি দেয় ঐ ট্রেন ঘিরে নানা ঘটনার স্মৃতি।কম খরচে অনাবিল আনন্দ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার স্মৃতি বারে বারে ফিরে আসে তাই। মার্টিন ট্রেনকে ঘিরে ফিরে আসে মজার সব গল্প, টুকরো টুকরো স্মৃতি বিজড়িত ইতিহাস। যে সব অতীত সহজে ভোলার নয়।
মার্টিন সাহেবের মৃত্যুর পর বিশাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ‘বার্ন কোম্পানি’ রাজেন্দ্রনাথ কিনে নেন। পরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই শিল্প সংস্থাই পরিচিতি পায় ‘মার্টিন বার্ন’ নামে।

কলকাতা শহরের একের পর এক অট্টালিকা নির্মাণের পিছনেও অসামান্য কারিগরি নৈপুণ্যের পরিচয় দেন স্যার রাজেন্দ্রনাথ। তাঁর হাতেই গড়ে ওঠে কলকাতার অন্যতম স্থাপত্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়ার ব্রিজ, বিধানসভা ভবন, বেলুড় মঠের মন্দির, ইসকো, গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স, চাটার্ড ব্যাংক বিল্ডিং, সেন্ট জেভিয়ারস কলেজ ইত্যাদি। কেবল তাই নয়, ভারতের মুম্বাই শেয়ার বাজার, বিহার ও উড়িষ্যা সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, ডাক ও টেলিগ্রাফ অফিস, হাইকোর্ট সহ পুরো ভারতে বহু ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য নির্মাণ করার পিছনে ছিলেন এই বঙ্গসন্তান।

কলকাতার বিখ্যাত ‘ক্যালকাটা ক্লাব ‘ গড়ার নেপথ্যেও ছিলেন রাজেন্দ্রনাথ। দমদমের ফ্লাই ক্লাবের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন প্রথম থেকেই। আজও তাঁর অবদানের সাক্ষ্য বহন করছে পলতা জল প্রকল্প। ব্যবসা ছাড়াও তিনি প্রশান্ত চন্দ্র মহালানবীশের অনুপ্রেরণায় তৈরী করেন ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট ‘। যা সংক্ষেপে আই. এস.আই.নামে পরিচিত। কাজের ব্যাপক সুনাম সত্ত্বেও ভারতে নেটিভ ইন্ডিয়ান হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন সময়ে রাজেন্দ্রনাথ নানা অবিচারের সস্মুখীন হন। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং ও বাণিজ্যক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভা ও কর্মকুশলতাই রাজেন্দ্রনাথের একমাত্র পরিচয় নয়। নানা ধরণের জনকল্যাণমূলক কাজে তিনি যথেষ্ট অর্থ দান করে গিয়েছেন। নিজের জন্মভূমি বসিরহাটের উন্নতির জন্য তিনি যা করেছেন তা সেখানকার লোকেরা চিরকাল স্মরণ করবে।

কর্মবীর এই মানুষটি নিজের জীবনকালে বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯০৮ সালে নিযুক্ত হন ‘অর্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান ‘ এর একজন অংশীদার হিসাবে। ১৯১১ সালে তিনি কলকাতার শেরিফ হন। ১৯২২ সালে তাঁকে রয়্যাল ভিক্টোরিয়ান অর্ডারের নাইট কমান্ডারের মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান ‘ডি এস সি’। ১৯৩৬ সালে প্রতিভাবান এই মানুষটি চিরশান্তির দেশে পাড়ি দেন। তিনি কেবল বাংলার নয়, সারা দেশের গৌরব ছিলেন। তাঁর কর্মজীবন বর্তমান যুবকদের ভবিষ্যত জীবনকে প্রভাবিত করতে পারবে বলেই মনে হয়।

Related Articles