সম্পাদকীয়

দেশে বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় সঙ্কট আর্থিক অশিক্ষা

প্রথম বছরের মধ্যেই ৪০ শতাংশ নতুন ট্রেডার ক্ষতির কারণে বাজার ছেড়ে দেন।

ভোলানাথ দাস (সার্টিফায়েড রিসার্চ অ্যানালিস্ট): ভারতের শেয়ার বাজার আজ এশিয়ার অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল বাজার। যেখানে বিএসই সেনসেক্স ১৯৯১ সালে ছিল মাত্র ১,০০০ পয়েন্ট, আজ তা ৭৫,০০০ অতিক্রম করেছে। অথচ, বাস্তবতা হল দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও বাজারের মৌলিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। সেবি ইনভেস্টর সার্ভে ২০২৩ অনুযায়ী, মাত্র ২৭ শতাংশ ভারতীয় বিনিয়োগকারীর মৌলিক আর্থিক জ্ঞান রয়েছে। এর মানে, ১০ জনের মধ্যে ৭ জন বিনিয়োগ করছেন প্রায় অন্ধভাবে বন্ধুর পরামর্শে বা আবেগে ভর করে। ফলস্বরূপ প্রথম বছরের মধ্যেই ৪০ শতাংশ নতুন ট্রেডার ক্ষতির কারণে বাজার ছেড়ে দেন।

কোভিড সময়ে (২০২০–২১) প্রায় ২.৫ কোটি নতুন ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। তাদের অনেকেই মৌলিক নিয়ম না জেনে বাজারে ঢুকে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। এই তথ্য প্রমাণ করে আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।

অন্যদিকে, এনএসই রিপোর্ট বলছে, ভারতে প্রায় ৮ কোটি রিটেল বিনিয়োগকারী থাকলেও, নিয়মিত সক্রিয় আছেন মাত্র ১.৫ কোটি। অর্থাৎ সংখ্যার দিক থেকে অগ্রগতি হলেও মানের দিক থেকে ঘাটতি প্রকট।

বিনিয়োগের বাস্তব উদাহরণ– ভারতের বাজারে যারা ধৈর্য ধরে দীর্ঘমেয়াদে থেকেছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান। যেমন-

যদি কেউ ২০১০ সালে এশিয়ান পেইন্টে ১,০০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করতেন, ২০২৫ সালে তার মূল্য দাঁড়াত প্রায় ১০,০০,০০০ টাকা। একই সময়ে এইচডিএফসি বা রিলায়েন্সে বিনিয়োগ করলে ৪০০–৫০০ শতাংশ পর্যন্ত রিটার্ন পাওয়া যেত।

তুলনায়, একই ১৫ বছরে ফিক্সড ডিপোজিটে গড়ে বার্ষিক ৬–৭ শতাংশ সুদ দিয়ে সর্বোচ্চ ২,৫০,০০০–এর মতো রিটার্ন দিত। এই ডেটা প্রমাণ করে যে বাজার ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, সঠিক জ্ঞান, ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে শেয়ার বাজার এফডি-র মতো নিরাপদ বিনিয়োগকেও বহুগুণে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তবে আশার আলোও রয়েছে। বাংলাসহ পূর্ব ভারতের বহু তরুণ-তরুণী আজ ট্রেডিং ও বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। যদি স্কুল-কলেজ স্তর থেকেই আর্থিক সাক্ষরতা বাধ্যতামূলক করা যায়, তবে আগামী প্রজন্ম শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগই নয়, সঠিক বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ট্রেডিং শেখানোর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া উচিত। এতে ঝুঁকি কমবে এবং সাধারণ মানুষ আর্থিক সুরক্ষা পাবে।

আমার বিশ্বাস, বাজার ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু ঝুঁকিকে শিখে ও আয়ত্ত করেই এটিকে সুযোগে পরিণত করা যায়। এজন্য দরকার ধৈর্য, নিয়ম ও ধারাবাহিক শিক্ষা। আর এই বার্তাই আজকের ভারতের আর্থিক ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি।