সম্পাদকীয়

পুজোয় সিনেমা নিয়েও রাজনীতি? হাস্যকর এবং অনভিপ্রেত!

সেই সময় কলকাতা শহরে একটিও মাল্টিপ্লেক্স গড়ে ওঠেনি। তখনও কী প্রযোজকদের মধ্যে অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত না?

জয়ন্ত চক্রবর্তী (বিশিষ্ট সাংবাদিক): একটা সময় ছিল যখন দুর্গাপুজো মানেই নতুন বই (সিনেমাকে তখন এই নামেই ডেকে থাকতেন গড়পড়তা বাঙালি)। পুজো এসেছে আর উকু-সুসের নতুন বই আসেনি তখন ভাবতেও পারত না বাঙালি। উকু মানে যে উত্তমকুমার আর সুসে যে সুচিত্রা সেন তা আশা করি বুঝিয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই এই কলমের পাঠকদের। সেই সময় কলকাতা শহরে একটিও মাল্টিপ্লেক্স গড়ে ওঠেনি। সিঙ্গেল স্ক্রিনের রমরমা তখন। তখনও কী প্রযোজকদের মধ্যে অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত না? চলতো। এক স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা।

রাধা-পূর্ণ, প্রাচী নাকি মিনার-বিজলী-ছবিঘর অথবা শ্রী-পূর্ণ-উজ্জ্বলার চেন-এ ছবি মুক্তি পাবে তাই নিয়ে। তখনও ছবির প্রিমিয়ার হতো। স্টাররা আসতেন। কোকোকলার ঠান্ডা বোতলে চুমুক দিয়ে, জর্দা পানের তবক-এর খুসবু ছড়িয়ে ক্রাইসলার কিংবা পন্টিযাক গাড়িতে উঠে চলে যেতেন। মানুষ এই সব রক্তমাংসের কল্পনার দেব-দেবীকে হাতের কাছে পেয়ে খুশি হতেন। এখনও প্রিমিয়ার হয়। তবে তা মাল্টিপ্লেক্সে। সাধারণ মানুষের থুড়ি দর্শকদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আজও তারকরা আসেন। পছন্দশই চ্যানেলকে বাইট দেন। সেই আত্মিক যোগাযোগটা আজ আর নেই।

ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার রোগটা এই কলমচির আর গেল না। হচ্ছিল পুজো রিলিজের কথা, চলে গেলাম প্রিমিয়ার কাহিনিতে। তা এবার বাঙালির সেরা উৎসব দুর্গাপুজোয় শিকে ছিড়েছে। একটি দুটি নয়, চার চারটি বাংলা ছবি মুক্তি পাচ্ছে এই পুজোয়। দেবের রঘু ডাকাত, প্রসেনজিৎ চাটুজ্জের দেবী চৌধুরানী, শিবপ্রসাদ-নন্দিতার রক্তবীজ টু এবং অনীক দত্তর যত কাণ্ড কলকাতাতেই। একসঙ্গে চার চারটি বাংলা ছবির পুজো রিলিজ ভাবা যায় না। যাঁরা বাংলা ছবির দৈন্য নিয়ে বলে থাকেন তাঁদের মুখে ঝামা ঘষতেই যেন এই চারটি ছবির আগমন। কিন্তু, এই চারটি ছবির হল পাওয়া নিয়ে তীব্র এক সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাতে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা আসরে ঢুকে পড়েছেন। দেবের রঘু ডাকাত হল এবং মাল্টিপ্লেক্স পাওয়ার ব্যাপারে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে এই অভিযোগে সরব বাকিরা।

তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ দেব তাঁর মাসল পাওয়ার দেখিয়ে রঘু ডাকাতকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিছেন এমনটাই অভিযোগ। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ একটি যুক্তিসঙ্গত কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছে, চারটি ছবিই সমান সুযোগ পাক। এরপর ব্যবসা অনুযায়ী হল এবং মাল্টিপ্লেক্স মালিকরা ঠিক করবেন কোন ছবি তাঁরা চালাবেন আর কোন ছবি চালাবেন না। অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য। কিন্তু ঘোলা জলে মাছ ধরার সুযোগ কি কেউ ছাড়ে। বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়ও ছাড়লেন না। কুণাল ঘোষকে উদ্দেশ্য করে তাঁর প্রশ্ন, দলের সাংসদ দেব তাঁর রঘু ডাকাত-এর জন্যে হল পাচ্ছেন, তার জন্য কুণাল ঘোষের এত আক্ষেপ কেন?

বলাই বহুল্য যে, লকেটের ইঙ্গিত তৃণমূল কংগ্রেসের সমীকরণের দিকে। নিজের চরকায় তেল না দিয়ে তিনি তাই এই আলোচনায়। ও হরি ভুলেই গিয়েছিলাম, লকেট চট্টোপাধ্যায়ও তো একদা সিনেমা করতেন। হক কথা বলার অধিকার তাঁর আছে বৈকি। কিন্তু, পুজো রিলিজ নিয়ে এই যে রাজনৈতিক কচকচানি তা মেনে নেবেন তো বিনোদনপ্রেমী দর্শকরা? নাকি এটিকেও তাঁরা পূজো বিনোদনের অঙ্গ হিসেবে দেখবেন? এসভিএফ এবং দেব সত্যিই প্রভাব বিস্তার করছেন কিনা, প্রসেনজিৎ চাটুজ্যের প্রভাব সত্যিই কিছু আছে কী কিংবা শিবপ্রসাদ-নন্দিতার এই ভাবতে গিয়ে মাথার চুল ছিজুন এই এ্যহস্পর্শযোগের সাড়াশি আক্রমণে বিপর্যস্ত অনীক দত্ত কি ভাবছেন, যত কাণ্ড কলকাতাতেই।

Related Articles