সম্পাদকীয়

বাংলা সাহিত্যের ‘সব্যসাচী’ হেমেন্দ্রকুমার রায়

Hemendra Kumar Roy, the 'mastermind' of Bengali literature

Truth Of Bengal: রাজু পারাল: সেকালে মা-ঠাকুমাদের কাছে ঘর-গেরস্থালির কাজের শেষে গল্পের বই পড়া ছিল অন্যতম আকর্ষণ। কারণ এখনকার মতো তখন টেলিভিশন, শপিং মল, মোবাইল ইত্যাদির নেশা কারও ছিল না। তাই খেলাধুলো ছাড়া বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল বই। আর সেই বইয়ের যুগে অন্যতম আকর্ষণীয় লেখক হয়ে উঠেছিলেন সাহিত্যিক হেমেন্দ্রকুমার রায়। হেমেন্দ্রকুমারের কাহিনিগুলির টান টান উত্তেজনা সব বয়সী পাঠককে সম্মোহিত করে রাখত অবিশ্বাস্য ভাবে।

বাংলা সাহিত্যের অপরাধ কাহিনিতে বিজ্ঞান এবং অলৌকিক বিষয় ঢুকিয়ে নতুন রস সংযোজন করে একসময় পাঠকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন তিনি। হেমেন্দ্রকুমার সাহিত্য জগতে পা রেখেছিলেন কিশোর বয়সে। বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে দেওয়ার পর বাবাকে রোজ সন্ধ্যায় পড়ে শোনাতেন রাজ্যের বই– শেক্সপিয়র, শেলি, কিটস্, বায়রন, মিলটন। ফলে বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল বাল্যকালেই। বাবার কাছে শিখেছিলেন অনেক। তাঁরই প্রশ্রয়ে, উৎসাহে হেমেন্দ্রকুমার সাহিত্যের উন্মুক্ত চরাচরে হয়ে উঠেছিলেন অন্যতম ব্যক্তিত্ব। মাত্র পনেরো বছর বয়সে ‘বসুধা’ পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর প্রথম গল্প ‘আমার কাহিনি’। পরে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘ভারতী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন তিনি। প্রথম দিকে গল্প, উপন্যাস, কবিতা লেখার পর ১৯২৩ সালে ‘মৌচাক’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে লেখা শুরু করেন ‘যকের ধন’ শিরোনামে একটি উপন্যাস।

‘মৌচাক’ পত্রিকার পঁচিশ বছর উপলক্ষে পত্রিকাটির একটি সংখ্যায় ‘আমার মৌচাক’ শিরোনামাঙ্কিত স্মৃতিকথা লিখেছিলেন হেমেন্দ্রকুমার। যে লেখাটি আজও অগ্রন্থিত। ওই স্মৃতিকথায় উল্লেখ আছে কোন প্রেক্ষাপটে ‘যকের ধন’ উপন্যাসটি রচিত হয়েছিল। ওই অগ্রন্থিত রচনাটি থেকে জানা যায় ‘মৌচাক’-এর সম্পাদক সুধীরচন্দ্র সরকারকে হেমেন্দ্রকুমার রায় বলেছিলেন, ‘অ্যাডভেঞ্চার গল্প হচ্ছে বিলাতের ছোটদের সাহিত্যের একটি প্রধান অবলম্বন। আমার মনে হয়, এখানেও ছোটদের মহলে এ রকম রচনার আদর কম হবে না। একবার পরীক্ষা করে দেখলে কেমন হয়?’ প্রত্যুত্তরে সম্পাদক সুধীরচন্দ্র সরকার সম্মতি জানিয়েছিলেন। পরে হেমেন্দ্রকুমারের লেখা থেকে জানা যায়, এ ধরনের লেখার অসাধারণ জনপ্রিয়তা দেখে নাকি বাংলাদেশের অনেক বিখ্যাত লেখক ওইরকম উপন্যাস লিখতে আগ্রহী হন।

‘যকের ধন’-কে পুরোপুরি গোয়েন্দা কাহিনি বলা যায় না। বরং বলা যেতে পারে গুপ্তধনের সন্ধানে দুর্গম, অরণ্যসঙ্কুল পাহাড়ের এক অভিযান। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল গোপন সঙ্কেতের হেঁয়ালি সমাধান করার ব্যাপার। যার রহস্য শেষ পর্যন্ত ভেদ করা হয়েছে সম্পূর্ণ গোয়েন্দা-সুলভ যুক্তিজাল বিস্তার করে। কাহিনির নায়ক দুই বন্ধু ‘বিমল’ এবং ‘কুমার’। যারা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ছাড়াও মুখোমুখি হয়েছিলেন এক দুষ্ট এবং মারাত্মক খলনায়ক ও তার দলবলের।

উপন্যাসটিতে বিমল ও কুমারের কাজ কারবার একেবারেই পোড় খাওয়া গোয়েন্দাদের মতো। ‘যকের ধন’ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল জনপ্রিয়তা পান হেমেন্দ্রকুমার। বাংলা সাহিত্যে ‘যকের ধন’ একটি মাইলস্টোন হয়ে ওঠে। ‘যকের ধন’ উপন্যাসটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে কিছুদিনের মধ্যেই বইয়ের পাতা থেকে তা চলচ্চিত্রের পর্দায় নিয়ে আসে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম কোম্পানি’। ১৯৩৯ সালের ১ এপ্রিল হরি ভঞ্জ পরিচালিত ছবিটি মুক্তি পায় উত্তরা প্রেক্ষাগৃহে। এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তখনকার দিনের মঞ্চ ও

অভিনয় জগতের সেরা কুশীলবরা। যেমন জহর গঙ্গোপাধ্যায়, রবি রায়, কালী বর্মন, কুমার মিত্র, অহিন্দ্র, তুলসী রায়, রাধারানি দে, ছায়া দেবী, নিভাননী দেবী, সুহাসিনী প্রমুখরা। বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম রোমাঞ্চকর কাহিনি হিসেবে ‘যকের ধন’ বিশ্ব সাহিত্যে সাড়া ফেলেছিল সেই সময়। সেই শুরু। তারপর থেকে রহস্য-রোমাঞ্চ-ভৌতিক-কল্পবিজ্ঞান কাহিনির একছত্র সম্রাট হয়ে ওঠেন হেমেন্দ্রকুমার। ঘরের কোণে বসে একঘেয়ে জীবনযাপনে অভ্যস্ত বাঙালি তাঁর হাত ধরেই পরিচিত হয়েছিল ‘অ্যাডভেঞ্চার’ নামক বস্তুটির সঙ্গে। হেমেন্দ্রকুমারের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ তাঁর অপূর্ব ভাষার প্রয়োগ। ছোটদের মনস্তত্ত্ব তিনি এত ভাল বুঝতেন যে পাঠকরা পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতেন তাঁর সৃষ্ট বর্ণময়, রূপময়, কল্পনার জগতে।

হেমেন্দ্রকুমার ছোটদের জন্যে যেমন লিখেছেন অসংখ্য বই, তেমনই বড়দের জন্যেও লিখেছেন অগণিত। ছোটদের কথা ভেবে লিখেছেন- আবার যখের ধন, মেঘদূতের মর্তে আগমন, ময়নামতীর মায়াকানন, জয়ন্তর কীর্তি, নীল সায়রের অচিনপুরে, নৃমুণ্ড-শিকারি, রবিন হুড, সুন্দরবনের মানুষ বাঘ, মানুষ পিশাচ, কিং কং, পঞ্চনদীর তীরে ইত্যাদি।

আবার বড়দের জন্য লিখেছেন বেনোজল, পদ্মকাঁটা, ঝড়ের যাত্রী, ধ্রুবতারা, নবযৌবনের কুঞ্জবনে, প্রিয়া ও প্রিয়, পথের মেয়ে, পায়ের ধুলো, পদ্মকাঁটা, পঞ্চশরের কীর্তি, ফুলশয্যা, ভোরের পূরবী ইত্যাদি। ঐতিহাসিক কাহিনিও তাঁর হাতে বরাবর নতুনতর ব্যাপ্তি পেয়েছে। লিখেছেন অনেক ভূতের গল্পও। অবিশ্বাসের ভৌতিক জগৎ তাঁর রচনাগুনে অন্তত সেই মুহূর্তের জন্য হলেও বিশ্বাসযোগ্যতা লাভ করে যা হেমেন্দ্রকুমারের রচনার বৈশিষ্ট্য। কাহিনি জমিয়ে তোলার অসামান্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। যা ছোটদের তো বটেই, অভিভূত করত বড়দেরও।

হেমেন্দ্রকুমারের প্রতিভা কেবল সাহিত্যকেন্দ্রিক নয়। বহুদিকে ছিল তাঁর বিস্তার। ছিলেন প্রকৃত শিল্পরসিক। নিজে ছবি আঁকতেন ভাল। শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভক্ত ছিলেন। পরবর্তী জীবনে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর বাড়িতে গিয়েছেন, অনেক আলাপ-আলোচনার সুযোগও পেয়েছেন। অবনীন্দ্রনাথও অত্যন্ত স্নেহ করতেন হেমেন্দ্রকুমারকে। একাধিক স্মৃতিমন্থনে তিনি ধরে রেখেছিলেন সেই স্নেহময় সম্পর্কের কথা। ‘ভারতী’র জন্য সম্পাদিকার হাতে ‘প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলা’ বিষয়ক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন হেমেন্দ্রকুমার।

সেই সময়ে ‘ভারতী ‘পত্রিকা সম্পাদনা করতেন স্বর্ণকুমারী দেবী। হেমেন্দ্রকুমারকে সম্পাদিকা বলেছিলেন, ‘এ লেখার সঙ্গে অজন্তার দুই-একখানা ছবি দেওয়া দরকার। তুমি অবনীন্দ্রনাথের কাছে যাও, আমার নাম করলে সেখান থেকেই ছবি পাবে।’ এই বিবরণটি পাওয়া যায় হেমেন্দ্রকুমারের’ এখন যাঁদের দেখছি ‘গ্রন্থের’ মানুষ অবনীন্দ্রনাথ ‘রচনায়। খানিকটা দ্বিধা-সংশয় নিয়ে অবনীন্দ্রনাথের কাছে হেমেন্দ্রকুমার এলে ছবি তো তিনি দিয়ে ছিলেনই, হেমেন্দ্রকুমার তাঁর আন্তরিক স্নেহের স্পর্শও পেয়েছিলেন। হেমেন্দ্রকুমার যখন ‘ভারতী’ পত্রিকায় যুক্ত ছিলেন, সেই সময় ‘প্রসাদ দাস রায়’ ছদ্মনামে শিল্প বিষয়ে বহু লেখা লিখেছিলেন।

আর্ট চর্চার আগ্রহ থেকেই বাগবাজারের তিনতলার বাড়িতে এক সময় হেমেন্দ্রকুমার নির্মাণ করেছিলেন নিজস্ব সংগ্রহশালা। যেখানে স্থান পেয়েছিল দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ, অদ্ভুত সব মূর্তি, পেন্টিং ইত্যাদি। শিল্পকলা সম্বন্ধে এমন সব বই তাঁর কাছে ছিল যা ভারতে দুর্লভ। সাহিত্য ও শিল্পকলা ছাড়াও হেমেন্দ্রকুমারের সহজাত দক্ষতা ছিল সঙ্গীত ও নৃত্যে। গান লিখেছিলেন হাজারেরও বেশি। তাঁর লিখিত গান রেকর্ডও বের হয়েছিল। তবে তিনি স্মরণীয় অবদান রেখে গিয়েছেন নাট্য ও স্টেজ বিষয়ের রচনায়।

নাট্য জগতের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ থাকায় সম্পর্ক গড়ে ওঠে শিশির ভাদুড়ি, ক্ষীরোদপ্রসাদ, নির্মলেন্দু লাহিড়ি, যোগেশ চৌধুরি, নৃত্যসম্রাট উদয়শঙ্কর প্রমুখের সঙ্গে। নাট্যকলা নিয়ে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের চিন্তাধারা কেবল আধুনিক নয়, নিজস্বতার আলোকে আলোকিত। ‘সৌখীন নাট্যকলায় রবীন্দ্রনাথ’ নামে একটি মূল্যবান বই তিনি রচনা করেছিলেন। নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়িকে নিয়ে তিনি ‘বাংলা রঙ্গালয় ও শিশিরকুমার’ নামে একটি গুরুপ্তপূর্ণ বই লিখেছিলেন। অবিস্মরণীয় নাট্য ব্যক্তিত্ব শিশিরকুমারকে জানার জন্য আজও এই বইটি আমাদের প্রধান অবলম্বন।

দুর্ভাগ্যের বিষয় অনেকটা সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরও বহুমুখী ক্ষমতাসম্পন্ন এই মানুষটির প্রতিভা আড়ালেই রয়ে গিয়েছে আজও। বর্তমানেও তিনি যে শিশু সাহিত্যিক হিসাবেই চিরস্থায়ী হয়ে রয়েছেন সে বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই।