আপন করে নেওয়ার অভ্যাস কাল হয়েছে বাঙালির
Bengalis have become accustomed to adopting the past

Truth Of Bengal: শ্যামল কান্তি ধর: বাঙালির সকলকে আপন করে নেওয়ার সহনশীলতা ও পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এই বঙ্গ সব ভাষাভাষীর কাছে এক শান্তির মরূদ্যান, আবাসস্থল, শান্তির অভয়ারণ্য। ঠিকই তবে সেই পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গির অবারিত খোলা মনের দ্বার দিয়ে ঢুকে পড়েছে ভাইরাসের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি। যে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার বা রুখে দাঁড়ানোর অনুকূল সময় এসেছে। বর্তমানে বাংলার বুকে, কলকাতার বুকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে হিন্দির রমরমা। বাংলার ব্যবসা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বড়বাজার, পোস্তা, বৈঠকখানা, নিউমার্কেট, হরিশা হাট, শেয়ার বাজার ইত্যাদি জায়গাগুলিতে হিন্দির দাপট চলে আসছে।
এছাড়া হাওড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ব্যবসায়িক কমপ্লেক্স, শিল্পাঞ্চল-সহ সারা বাংলার বিভিন্ন ছোট বড় কালকারখানা এলাকাতে অবাধে চলছে হিন্দির রমরমা। রেলের দফতরগুলি, বিভিন্ন রেল স্টেশনের কাউন্টারগুলিতে বাংলা প্রায় অস্তমিত। বিভিন্ন রেল ওয়ার্কশপগুলিতে গেলে যেন মনে হয় আমরা নিজ ভূমে পরবাসী জীবন যাপন করছি। এছাড়া ট্রেনে-বাসে বাংলার মফস্বল শহরগুলি, স্টেশন চত্বর, হাটে বাজারে বাংলা কথা বলাই দায় হয়ে পড়েছে। সর্বত্র হিন্দির চাষে ভরে গিয়েছে। আপনি ট্রেনে বর্ধমান পার করুন বাংলায় কথা বলতে পারবেন না। যদিও বাংলা মার্কা হিন্দিতে কথা বলেন আপনাকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ শুরু হয়ে যাবে, হবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। দেখা যাবে আপনার টিকিট কাটা সংরক্ষিত আসনে সব দল বেঁধে বসে আছে। ঠিক যেন মাছের বাজার।
আপনি স্বাভাবিক সাবলীল বাংলার মার্জিত ভাষায় কথা বলে তাদের বোঝাতেই পারবেন না যে এটা আপনার জন্য সংরক্ষিত আসন। আসানসোল পার করলে তো ফ্যামিলি নিয়ে কতক্ষণ যে আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, তা ঠিক নেই। সবটাই তাদের মর্জির ওপরে নির্ভর করবে আপনার সিট পাওয়া না পাওয়া। চেকিং স্টাফ বা অন্য কোন আধিকারিকরা মূল্যহীন দর্শক। এ তো গেল ট্রেন জার্নির কথা। বর্তমানে তো এমন পরিস্থিতি বাংলার মফস্বল শহরগুলির কিছু কিছু জায়গায় যেখানে দোকানের সাইনবোর্ড হিন্দি আর ইংরেজিতে লেখা, বাংলার চিহ্ন মাত্র নেই। আবার কিছু কিছু জায়গায় সে ক্রেতা হোক বা বিক্রিতা হিন্দিতে কথা না বললে সেই খরিদ্দারকে পাত্তাই দেবে না। বেশি জোরের সঙ্গে কথা বললে দু-চার চড় থাপ্পড় পর্যন্ত বাদ যাচ্ছে না। কিছুদিন আগে এ ধরনের ঘটনার কথা সকলের কানে এসেছে। বর্তমানে রাজ্যের টাউনশিপগুলিতে এই কালচারে ভরে গিয়েছে। কী অবস্থা– একবার ভাবুন।
নিজের নিজের সাহেব বা বসকে সন্তুষ্ট করার জন্য বাঙালিবাবুদের মধ্যে হিন্দি বলার প্রতিযোগিতা চলছে। কে কত হিন্দি রপ্ত করতে পারে এ যেন তার প্রতিযোগিতা চলছে এবং তাতেই যেন জীবনের মোক্ষ লাভ হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হল, এর কারণটা ঠিক কী? আমার যতটুকু জানা আছে বা সচরাচর যেটা শোনা যায় বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেটা দেখা যায় তা হল, ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এই কালচার নেই বললেই চলে। সেখানে নিজের নিজের ভাষা প্রচণ্ড ভাবে প্রাধান্য পায়। সেই প্রদেশের ভাষা বা তাদের মাতৃভাষার প্রতি যে আনুগত্য ভালবাসা এবং সম্মান তারা সুন্দরভাবে রক্ষা করে। এবং ১০০ শতাংশ প্রয়োগ করে।
সেখানে কোনও দ্বিচারিতা নেই। তাদের স্পষ্ট অভিব্যক্তি, আমার রাজ্যে তুমি ভিন রাজ্যের মানুষ। এখানে এসেছো, আমাদের ভাষায় তোমাকে কথা বলতে হবে। না পারলে তোমার কাজ হোক বা না হোক আমাদের কোনও দায়ভার নেই। কিছু কিছু রাজ্যে তো বাধ্যতামূলক সেই রাজ্যের ভাষাতে কথা বা কাজকর্ম। যাই বলুন করতে হবে এটাই সিস্টেম। আমরা বাঙালিরা স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে খুব অনুকরণ প্রিয় হয়ে পড়েছি। সঙ্গে দোসর আমাদের পুরনো মনোভাব ও আচরণ। যাকে বদঅভ্যাস বলবো। অবিলম্বে এর ইতি টানার সময় এসেছে। যদিও বাঙালি ইতিমধ্যে তার পুরনো বদভ্যাসের জন্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাঙালিবাবুদের কেরানির চাকরির মনোভাব ব্যবসায়িক ঝুঁকি না নেওয়ার মনোভাব।
তুষ্টিকরণের এক নিপুণ কলা। যে যত নিপুণতার পরিচয় দিতে পারবে তার তত বেশি রমরমা। এই কারণে অনেকের পারিবারিক জীবনে হোক বা সামাজিক জীবনে হোক অনেক মূল্য চোকাতে হয়েছে বা হচ্ছে। যদিও এ সমস্ত ঘটনার তো আর নেক টু নেক প্রমাণ হয় না, বা এর প্রয়োজনও নেই। কিন্তু এটাই বর্তমান কালের বাস্তবতা বা চালচিত্র। পুরো সিস্টেমটাই এই বিপরীত মেরুতে চলছে।
এর বিরোধিতা যে বা যারাই করতে যাবে সেই বাঙালির কর্মজীবনে নেমে আসবে দুর্ভোগ। এ যেন ভাই ভাইয়ের পথের কাঁটা। সুতরাং অতি সত্বর এর পরিবর্তন হওয়া উচিত এবং বিহিত হওয়া দরকার। এখানে আমার প্রয়াত নীরোদ সি চৌধুরীর একটি আপ্তবাক্য মনে পড়ে যাচ্ছে, তিনি বহুবছর আগে বলে গিয়েছিলেন যে বাঙালি আত্মঘাতী জাতি। এই বাংলায় ভিন প্রদেশের সরকারি বেসরকারি যে আমলা বা রাজনীতিকই আসুন না কেন, তাঁরা সব জেনেই এই বাংলায় কাজ করতে আসেন।






