Jagaddhatri Puja in Bengal: কৃষ্ণচন্দ্রের আমলেরও আগে বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজো! কোন প্রাচীন গ্রন্থে মিলল পুজোর প্রমাণ?
এই বাংলাতেই রয়েছে জগদ্ধাত্রী মন্দির যেখানে একদিন নয় বছরভরই পূজিতা হন দেবী জগদ্ধাত্রী।
Truth of Bengal: মন্দিরময় বাংলা। কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এক উৎসবের বিদায়ই বয়ে আনে পরের উৎসবের আগমন বার্তা। কালীপুজো, ভাইফোঁটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে সাড়ম্বরে জগদ্ধাত্রী পুজো করা হয়। কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলের বহু আগে থেকেই বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন ছিল বলে ১৪ শতকের স্মৃতিকার শূলপাণির “কাল বিবেক ” গ্রন্থ থেকে জানা যায়। এই বাংলাতেই রয়েছে জগদ্ধাত্রী মন্দির যেখানে একদিন নয় বছরভরই পূজিতা হন দেবী জগদ্ধাত্রী। হুগলির বলাগড়ের রায় পরিবারে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পূজিতা হচ্ছেন দেবী জগদ্ধাত্রী। বলাগড়ের সোমরা বাজারে রয়েছে প্রাচীন মন্দির, যেখানে অষ্টধাতুর জগদ্ধাত্রী দেবী পূজিতা হচ্ছেন। রায় পরিবার পরিচিত দেওয়ানজী পরিবার হিসাবে। কারণ, পরিবারের একজন সদস্য রামশঙ্কর রায় শেষ মোগল সম্রাট শাহ আলমের আমলে দেওয়ান ছিলেন। তিনিই ১৭৬৫ সালে এই মন্দির তৈরি করেন। আবার অনেকের মতে, পাল আমলের বাংলা, বিহার, ওড়িশার দেওয়ান রামশঙ্কর রায় এই মন্দির নির্মাণ করেন ১১৭২ খ্রিস্টাব্দে।
দেবী জগদ্ধাত্রীর অষ্টধাতুর বিগ্রহ পুজো করা হয় এই মন্দিরে। বছরভর দেবীর নিত্যসেবা হয়। তবে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন সাড়ম্বরে ষোড়শোপচারে দেবী জগদ্ধাত্রীর পুজো করা হয়। ওইদিন দেবীর ভোগে লুচি, মিষ্টি, পোলাও, খিচুড়ি, ৫ রকমের ভাজা, ছানার কালিয়া নিবেদন করা হয়। ১৯৬১ সালে আসল অষ্টধাতুর জগদ্ধাত্রী মূর্তি চুরি হয়ে যায়। নতুন ধাতুর মূর্তি গড়ে সেই বিগ্রহকে এখন পুজো করা হয়। জগদ্ধাত্রী এখানে মহাবিদ্যা নামে পূজিতা। মায়ের বাঁদিকে রয়েছে দেবাদিদেব মহাদেবের মূর্তি। কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর বিগ্রহও রয়েছে মন্দিরে। এখানে কোনো বলি হয় না। দেবী জগদ্ধাত্রী হলেন সমগ্র জগতের ধাত্রী বা পালনকর্ত্রী। দেবী হলেন সত্ত্বগুণের আধার। ত্রিনয়না দেবী জগদ্ধাত্রী সিংহবাহিনী। দেবীর বাহন সাদা সিংহ, সিংহের পদতলে থাকে একটি কাটা হাতির মাথা। এটি মহাহস্তিরূপী অসুর করীন্দ্রাসুরকে বধের প্রতীক। নানান অলঙ্কারভূষিতা দেবী জগদ্ধাত্রী গলায় নামযজ্ঞোপবীত ধারণ করে থাকেন। চর্তুভূজা দেবীর চার হাতে থাকে শাঁখ, ধনুক, চক্র ও বাণ। দেবীর গাত্রবর্ণ নবোদিত সূর্যের মতো।
কাত্যায়ণীতন্ত্রে জগদ্ধাত্রী দেবীর উৎপত্তি সম্বন্ধে পৌরাণিক কাহিনির উল্লেখ আছে। কাহিনি অনুসারে, একবার পবনদেব, অগ্নিদেব, বরুণদেব, চন্দ্রদেব প্রভৃতি দেবতারা নিজেদের সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বলে ভাবতে শুরু করেন। অসুরদের হারানোর পর নিজেদের শক্তি সম্পর্কে অহংকারী দেবতারা ভুলে গিয়েছিলেন মহাশক্তিরূপিনী দেবী দুর্গার শক্তিতে তাঁরা বলীয়ান। দেবী সব জানার পর দেবতাদের দম্ভ, অহংকারকে দূর করতে সচেষ্ট হলেন। জ্যোতির্ময়ী রূপ নিয়ে তিনি দেবতাদের সামনে হাজির হলেন। কোটি সূর্যের দীপ্তি আর কোটি চন্দ্রের প্রভাযুক্ত তেজরাশি দেখে ভয় পেলেন দেবতারা। দেবী তখন তাঁদের সামনে ছোট্ট ঘাসের টুকরো নাড়াতে বলেন। ঘাসের টুকরো নাড়াতে ব্যর্থ হওয়া দেবতারা বুঝতে পারেন জ্যোর্তিময়ী দেবীই সকল শক্তির আধার। দেবীর করুণাতেই তাঁদের শক্তিলাভ। সকল দেবতা তখন দেবীর স্তব শুরু করেন। স্তবে তুষ্ট হয়ে দেবী জগদ্ধাত্রী আবির্ভূতা হন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে প্রথম মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন। একবার খাজনা দিতে না পারায় নবাব মীরকাসেম মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে মুঙ্গের জেলে বন্দি করে রাখেন। দুর্গাপুজোর সময় মুক্তি পান মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। গঙ্গায় বজরায় চেপে কৃষ্ণনগরে আসার সময় ঢাকের বাদ্যি শুনে তাঁর মন খারাপ হয়ে যায়। ক্লান্ত কৃষ্ণচন্দ্র বজরায় ঘুমিয়ে পড়েন। স্বপ্নে দেবী জগদ্ধাত্রী তাঁকে দেখা দিয়ে কৃষ্ণনগরে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে পুজো করার নির্দেশ দেন। সেই থেকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর শুরু। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র চন্দননগরে তৎকালীন ফরাসি বণিকদের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর বাড়িতে প্রায়শই আসতেন। এই যোগাযোগের সূত্র ধরে চন্দননগরেও জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হয়।






