
The Truth of Bengal, সুমন ভট্টাচার্য: বাংলাদেশ মানেই একটা আবেগ। যে আবেগ শুধুমাত্র ভাষার কারণে প্রাণ দিতে পারে, যে আবেগ একটা রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারে। বাংলাদেশে ঘুরতে গিয়ে এই যে আবেগ, সেটা সব জায়গায় টের পেয়েছি। বাংলাদেশের কোনও বাড়িতে খেতে গেলেও আসলে আমরা ভর্তা বা মাছের ঝাল খাই না, এই আবেগটাকেই চেটেপুটে খেয়ে নিই। সেই জন্যই বাংলাদেশের সবচেয়ে নামী শিল্পপতিও দুপুরে অফিসে খাবার নিমন্ত্রণ করলে বাড়ি থেকে শুঁটকি রান্না করে আনতে ভোলেন না। এবং সলজ্জ হেসে মনে করিয়ে দেন, আপনাদের মধ্যে একজন চট্টগ্রামের আছেন বলে বাড়ি থেকে শুটকি টা নিয়ে আসলাম! আবার ফ্লাইট ধরার তাড়া আছে, এটা বললে পরেও ইফতারে অন্তত ৩৬ রকমের পদ অপেক্ষা করে! তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে গাড়িতে আঠার জন্য ইফতারে ৩৬ রকমের পদ দেখে বাংলাদেশের নামী প্রকাশক এবং লেখক ফরিদ ভাইয়ের স্ত্রী তানি আহমেদ আপাকে হখন জিজ্ঞেস করেছি, এত রকম। তখন তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ভাই, তাড়া আছে বললেন বলে তো সব রকম পদ আপনাদের জন্য করিনি।
এই যে বাংলাদেশের অবাক করা আতিথেয়তা সেটাই বারবার ধানসিঁড়ি অথবা কপোতাক্ষ তীরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই আতিথেয়তার কাছে যা ব্রেকফাস্টেও খিচুড়ি আর পদ্মার ইলিশ নিয়ে অপেক্ষা করতে পারে। সেদিন আসলে সকালের ফ্লাইট ছিল। তাই সাংবাদিক এবং চিত্রপরিচালক হাসিবুর রেজা কল্লোল-এর বাড়িতে প্রাতরাশ সেরে এয়ারপোর্ট চলে যাব, এমনটাই পরিকল্পনা করা ছিল। কিন্তু কল্লোল, যে কল্লোল কলকাতার নায়িকা পাওলি দামকে ঢাকার সুপারস্টার শাকিব খানের বিপরীতে নায়িকা করে দুই বাংলাকে চমকে দিয়েছিল, সেই কল্লোল এবং তার স্ত্রী বীথি আপ্যায়ন করলেন খিচুড়ি, বেগুন ভাজা আর পদ্মার ইলিশ দিয়ে। এমন যদি হয় ব্রেকফাস্ট, তাহলে আপনি দুপুরে খাবেন কী? বাংলাদেশে আসলে খাবার নিয়ে এতটাই আন্তরিকতা এবং ভালোবাসা রয়েছে যে কোনো কিছুতেই না বলা যায় না!
কিংবা ধরুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামাতো ভাই এবং দেশের প্রাক্তন মন্ত্রী শেখ সেলিমের বাড়িতে ডিনার করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা টেবিলে আস্ত একটা ইলিশ মাছ রয়েছে দেখে প্রথমে আমি এবং আমার দিল্লি মুম্বাইয়ের সঙ্গীরা চমকে গিয়েছিলাম। পরে যখন ছুরি দিয়ে কেটে সেই মাছই প্লেটে এল, তখন বুঝলাম ইলিশ রান্না করে কাঁটা ছাড়িয়ে বোনলেস ইলিশে রূপান্তরিত করে টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অতিথিদের আপ্যায়ন এর জন্য বাংলাদেশের আইকনিক ইলিশ আছে, কিন্তু কাঁটা বাছার হাঙ্গামা নেই। এতে দিল্লি মুম্বাইয়ের প্রবাসী বাঙালিদের জন্য কাঁটা বাছার যন্ত্রণা নেই, আবার ইলিশের স্বাদ একেবারে জিভের ডগায়। প্রতিটি রান্নায় এই যে উদ্ভাবনী কৌশল, আর তার সঙ্গে মিশে থাকা আন্তরিকতা, এটাই বোধহয় বাংলাদেশের ইউএসপি। এই ইউনিক সেলিং পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশের যে কোনো নিমন্ত্রণ এপার বাংলার কোনও আমন্ত্রণকে বলে বলে ১০ গোল দিতে পারে! ফুটবলের মত যদি রান্নাবান্না বা আতিথেয়তার কোনও এএফসি কাপ হতো তাহলে বোধহয় সেই এশিয়ান ফুড কাপ প্রতিবছরই ঢাকায় যেত!
কত রকম মাছ এবং কত ধরনের মাংসের পদ যে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে গিয়ে চেয়েছি তা বোধ হয় হিসেব করে শেষ করতে পারবো না। একবার ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলের মালিক এবং বাংলাদেশের প্রথিতযশা ব্যবসায়ী নুর আলি আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর সোনারগাঁওয়ের গ্রামের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজনের জন্য। আমি এবং আমার এক দক্ষিণ ভারতীয় বন্ধু সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে যে বিশাল সাইজের গলদা চিংড়ি আর ইলিশ মাছ খেয়েছিলাম, তা এখনও সেই দক্ষিণী বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলেই মনে করিয়ে দেন। নুর আলি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, আমরা ভাই, ওই নৌকায় ওঠার সময় মনে করিয়ে দিই না মধ্যাহ্নভোজন সেরে যেতে পারতেন! আমরা কাউকে সঙ্গে নিয়ে গেলে, বা দুপুরে কেউ বাড়িতে এলে মধ্যাহ্নভোজন করিয়েই ছাড়ি। সেই মধ্যাহ্নভোজন যে কি পেটপুরে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা, তা যাঁরা বাংলাদেশের যাননি, তাঁরা বুঝতে পারবেন না। এই যে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে একটা আলাদা আন্তরিকতা, ভালোবাসা বা উচ্ছ্বাস, সেটাই ঢাকা শহরে বারবার আমার ফিরে যাওয়ার প্রধান কারণ। কোনও বন্ধু হয়তো নিয়ে যাবেন পুরনো ঢাকার বিউটি বোর্ডিং দুপুরের মধ্যাহ্নভোজন করাতে। বিউটি বোর্ডিংয়ে যাওয়া মানে তো শুধু কলাপাতার থালায় অনেক পদের মাছ খাওয়া নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, বাংলাদেশের প্রতিরোধ আন্দোলন আর বাঙালি আবেগে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়া। ঠিক একইভাবে কেউ হয়তো সকালবেলা গাড়িতে করে নিয়ে যাবেন পুরনো ঢাকায় নেহারি আর পরোটা খাওয়াতে। সেই খাওয়া কি শুধুই খাওয়া? আসলে তো বাঙালির ইতিহাস এবং জাতীয় সত্তাকে একটু একটু করে চেনা।






