সুন্দরবনের জন্য বাজেটে বড় বরাদ্দ, হাসপাতাল থেকে বাঁধ—সবুজ প্রাচীর রক্ষায় একাধিক ঘোষণা
নদীবেষ্টিত দ্বীপাঞ্চলে দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে এই পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে
Truth of Bengal: বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে সুন্দরবনের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সোমবার বিধানসভায় ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৭৫.২৯ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন তিনি। সামাজিক প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ‘সবুজ প্রাচীর’ সুন্দরবনের সুরক্ষা এবং উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই বাজেটে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সুন্দরবনের জন্য বড় পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালকে সুপার স্পেশালিটি পরিষেবার আওতায় আনার পাশাপাশি সুন্দরবনেও সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য পরিষেবা আরও সহজলভ্য করতে আয়ুষ্মান ভারতের মতো স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প কার্যকর করার কথাও বাজেটে বলা হয়েছে। সুন্দরবনের ভৌগোলিক অবস্থানের কথা মাথায় রেখে মোটরবোট অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নদীবেষ্টিত দ্বীপাঞ্চলে দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে এই পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের জন্য দ্বীপভিত্তিক প্রসূতি কেন্দ্র গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।

সব সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের খাবারের জন্য মাথাপিছু খরচ ১১০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবন-সহ রাজ্যের যে সব রোগী চিকিৎসার জন্য মুম্বই বা ভেলোরে যাবেন, তাঁদের জন্য পিপিপি মডেলে থাকার ব্যবস্থার কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষি ও সেচ ক্ষেত্রেও সুন্দরবনের জন্য আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। রাজ্যের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব তুলে ধরে সরকার জানিয়েছে, কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে পদক্ষেপ করা হবে। সুন্দরবন-সহ সংবেদনশীল এলাকায় জলের জোগান বাড়াতে রাজ্যের প্রধান নদীগুলির জন্য নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নত করাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। এই বেসিন প্ল্যান তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক জলসম্পদ বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হবে। নদী ব্যবস্থাকে বৈজ্ঞানিকভাবে পুনর্গঠন এবং জলপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চলের কৃষি, সেচ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের সহায়তায় ১,৩৫৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মরা নদীখাত খনন করে সেগুলিকে মূল নদীর সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে নদীগুলিতে জলের সরবরাহ বাড়বে এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মৎস্যচাষের ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পাশাপাশি নোনা জল এবং জলাভূমিতে মৎস্যচাষের জন্য আধুনিক মৎস্য উৎপাদন কেন্দ্র, মৎস্য খামার, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সুন্দরবনের বহু মানুষের জীবিকা মৎস্যচাষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এই ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে সুন্দরবন ন্যাচারাল এমব্যাঙ্কমেন্ট প্রজেক্ট। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ সহায়তায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে বলে জানানো হয়েছে। এর জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
![]()
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় সুন্দরবনের বাঁধ ভাঙন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাই নতুন প্রাকৃতিক বাঁধ প্রকল্প সুন্দরবনের মানুষ, কৃষিজমি এবং বাস্তুতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বৃদ্ধিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে কাজে লাগিয়ে সুন্দরবন এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল তৈরির জন্য চলতি অর্থবর্ষে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই এই বরাদ্দ পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থানেও সাহায্য করবে। পশ্চিমবঙ্গে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গঠন করা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ জলবায়ু সহনশীলতা তহবিল এবং পশ্চিমবঙ্গ জলবায়ু অর্থায়ন ফেসিলিটি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সামলাতে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।






