ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি নিয়ে বিশেষ আলোচনা দিল্লিতে ‘ব্রিক্স’ সম্মেলনে মস্কো, তেহরানের বিদেশমন্ত্রীর
বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের নেতৃত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে যোগ দিতে বুধবার গভীর রাতে ভারতে পৌঁছেছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি।
Truth of Bengal: দিল্লিতে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু দু’দিনের ব্রিকস বিদেশমন্ত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এই বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি, ইরান-আমেরিকা সংঘাত এবং তার জেরে হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া জ্বালানি উদ্বেগ। চলতি বছর ব্রিকস গোষ্ঠীর সভাপতিত্ব করছে ভারত। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের নেতৃত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে যোগ দিতে বুধবার গভীর রাতে ভারতে পৌঁছেছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি। কূটনৈতিক মহলের মতে, যুদ্ধ-উত্তপ্ত আবহে আরাঘচির উপস্থিতি সম্মেলনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। জানা গিয়েছে, আরাঘচির বিমানের নাম ‘মিনাব ১৬৮’, যা মার্কিন হামলায় নিহত ১৬৮ জন ইরানি ছাত্রীর স্মৃতিকে বহন করে—এ বিষয়টিও আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই দিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সার্গেই লাভরভ। বুধবার সন্ধ্যায় তিনি ভারতে এসে এস জয়শঙ্করের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের পরে জয়শঙ্কর জানান, বর্তমান অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার সময়ে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্রের দাবি, আলোচনায় জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার বিষয় উঠে এসেছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারে। ভারত-সহ যেসব দেশ আমদানির উপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেতে পারে। সেই কারণেই ব্রিকস বৈঠকে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেও ভারত, চিন ও রাশিয়াকে ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে এই দেশগুলির জাহাজ চলাচল চালু থাকবে। ফলে ভারতের তেলবাহী জাহাজগুলি বিশেষ অনুমতি নিয়ে ওই পথ ব্যবহার করতে পারছে বলে জানা গিয়েছে। তবে একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিষয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির পর ইরান সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ব্রিকস জোটে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও সদস্য হওয়ায়, এই পরিস্থিতিতে সম্মেলনে কী ধরনের আলোচনা হয়, তা নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে।
ব্রিকস সম্মেলনের সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সমাপতন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে একাধিকবার ব্রিকসকে ‘আমেরিকাবিরোধী’ বলে আক্রমণ করেছেন এবং শুল্কনীতি নিয়ে সংঘাতের আবহে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ঘটনাচক্রে, দিল্লিতে ব্রিকস বৈঠক এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ট্রাম্প চিন সফরে রয়েছেন। সেই কারণে চিনের বিদেশমন্ত্রী বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। তাঁর বদলে প্রতিনিধিত্ব করবেন চিনা রাষ্ট্রদূত শি ফেইহং।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি প্রস্তাব বারবার ভেস্তে যাওয়ায় সংঘর্ষবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এই অবস্থায় ব্রিকসের মতো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মঞ্চকে ব্যবহার করে আমেরিকার ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে ইরান। যদিও এখনও পর্যন্ত ব্রিকস গোষ্ঠী এই যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি কোনও কঠোর অবস্থান নেয়নি, তেহরান চাইছে পশ্চিমী আধিপত্যের বিরুদ্ধে জোটের ঐক্যবদ্ধ বার্তা আরও স্পষ্ট হোক।
এই সফরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কানেক্টিভিটি নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে সূত্রের দাবি। কূটনৈতিক মহলের মতে, এতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।বর্তমানে ব্রিকস জোটে ভারত, রাশিয়া, চিন, ব্রাজ়িল ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি রয়েছে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি।
সব মিলিয়ে দিল্লির এই দু’দিনের সম্মেলনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে আসতে পারে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।






