
The Truth of Bengal: কেরালায় ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ২০টি আসনে কংগ্রেস-জোট পেয়েছিল ১৯টি আসন; বামজোট ১টি আসন। ওই লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস-জোট ভোট পায় ৪৭ শতাংশ; বাম জোট ৩৬ শতাংশ, বিজেপি–জোট ১৬ শতাংশ।এর পর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ওই রাজ্যে কংগ্রেস-জোট ৩৯ শতাংশ,এবং বাম-জোট ৪৩ ভাগ। ঐ নির্বাচনে বিজেপি বিধানসভায় কোনও আসন পায়নি। বামরা পায় ৯৯টি; কংগ্রেস-জোট পায় ৪১টি।সর্বশেষ এই দুই নির্বাচন বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, বিজেপি কেরালায় আসনের হিসাবে কোন অবস্থানই তৈরি করতে পারছে না। যদিও বিগত দশকের চেয়ে তাদের ভোটের হিস্যা সামান্য বেড়েছে। কিন্তু আজও এই রাজ্য থেকে লোকসভায় বিজেপি কোনো এমপি পেল না।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে বিজেপির হিন্দুত্ববাদ কেরালায় এসে আবেদন হারিয়ে ফেলে কেন?
কেরালা ধর্মীয় চরিত্রে বহুত্ববাদী, ৪৫ ভাগ জনসংখ্যা অ-হিন্দু
কেরালায় বিজেপির ব্যর্থতার প্রাথমিক কারণ এই রাজ্যের রাজনৈতিক সচেতনতার উঁচু মান। সাধারণ সাম্প্রদায়িক কলাকৌশলে এখানকার ভোটাররা কোনো দলের প্রতি আকর্ষিত হয়ে যায় না। সচরাচর বিজেপির রাজনীতির মূল পুঁজিই হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ বলে মনে করছে রাজনীতি মহল। এই পুঁজি নিয়ে দলটি প্রায় পুরো ভারত মাতিয়ে বেড়ালেও কেরালায় এসে তাদের বিজয়রথ থেমে যায়।মালায়ামবাসী কেরালায় হিন্দু বিশ্বাসের অনুসারী প্রায় ৫৫ ভাগ মানুষ, ২৭ ভাগ ইসলাম ধর্মাবলম্বী ও ১৮ ভাগ খ্রিষ্টান। যেহেতু রাজ্যে প্রায় ৪৫ ভাগ অ-হিন্দু মানুষ আছে, সে কারণে কেবল হিন্দুত্ববাদের ওপর ভর করে এখানে কোনো দলের নির্বাচনী সাফল্য পাওয়া অসম্ভব। এখানকার হিন্দু বিশ্বাসীদের মধ্যে আবার কমিউনিস্ট পার্টির উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক কাজ রয়েছে। রাজ্যের হিন্দু সমাজে ‘ইঝাভাহ’ নামে পরিচিত তুলনামূলকভাবে নিম্নবর্ণের কৃষিজীবী গোষ্ঠীতে বামদলগুলোর রয়েছে দৃঢ়ভিত্তি। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ানও একজন ইঝাভাহ। এই সম্প্রদায় হলো রাজ্যের হিন্দুদের চার ভাগের এক ভাগ। এদের মধ্যে কমিউনিস্টদের উপস্থিতি এবং মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের বিজেপি ভীতি মিলেমিশে থাকায় কেরালায় বিজেপির পক্ষে একচেটিয়া ঢেউ তোলা কঠিন হয়ে আছে। ওই রাজ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে তারা। কেরালার সামাজিক সংস্কৃতিতে অতি প্রাচীনকাল থেকে বহুধর্মীয় একটা ছাপ রয়েছে। ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ, সিনাগগ ও চার্চ কেরালাতেই রয়েছে। এসবই এখানকার মানুষকে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক মিলনের আবহে বড় করে তোলে, যা আরএসএস-বিজেপির রাজনীতির জন্য সহায়ক হয় না। তারা বিজেপির রাজনীতিকে স্বস্তি বিনষ্টকারী উপাদান হিসেবে দেখে এখনো।
এখানকার ভাসমান ভোটার ও প্রতি নির্বাচনে পছন্দ পরিবর্তনকারী ভোটার সংখ্যাই বেশি, যা রাজ্যের রাজনীতিবিদদের প্রশাসনিক বিষয়ে চাপে রাখে। প্রশাসন পরিচালনার যোগ্যতা দিয়েই এখানে ভোটের হিসাব অদল-বদল হয়, ধর্মভিত্তিক উন্মাদনায় নয়। এ ছাড়া উত্তর ও পূর্ব ভারতের সীমান্তঘেঁষা রাজ্যগুলোতে চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশকে ছদ্ম প্রতিপক্ষ বানিয়ে বিজেপি যেভাবে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরি করে, দক্ষিণে অনুরূপ সীমান্ত না থাকায় সেটাও অসম্ভব। যে কারণে কেরালার অনেক খ্যাতনামা পেশাজীবীকে দলে এনেও বিজেপি ভোটের দৌড়ে তাদের জিতিয়ে আনতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ইত্যাদি জায়গায় বিজেপি যেভাবে অন্য দলের নেতাদের নানা প্রলোভনে বাগিয়ে এনে নিজেদের নির্বাচনী আসন বাড়ায়, কেরালায় এটাও বেশ দুরূহ। এক দল ছেড়ে অন্য দলে যাওয়ার ঐতিহ্য বেশ কম এখানে। কেরালার আরেকটি নির্বাচনী বিশেষত্ব হলো, এখানকার পৌনে তিন কোটি ভোটারের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার প্রায় নয় লাখ বেশি। এই নারীদের বড় এক অংশ শ্রমজীবী। এরাও স্থানীয় বামদলগুলোর বড় ভোটব্যাংক। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে এই নারীরা বড় এক প্রাচীর হিসেবে কাজ করছে। জিততে মুসলমান-খ্রিষ্টান ভোট পেতে হয়, বিজেপির জন্য যা কঠিন সমকালীন ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে কেরালায় বিজেপির বারবার ব্যর্থতা থেকে কয়েকটি স্পষ্ট বার্তা মেলে। প্রথমেই যা ধরা পড়ে, তা হলো সংখ্যালঘুদের জন্য দলটির কোনো ইতিবাচক রাজনীতি নেই। বিজেপি পরিপূর্ণভাবে সংখ্যাগুরুর দল হয়ে পড়েছে—যা ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বেশ বেমানান। এ কারণে বিজেপি উত্তর ভারতে প্রায় একচেটিয়া হয়ে উঠলেও দক্ষিণ ভারতে কর্ণাটকের বাইরে তার অস্তিত্ব প্রত্যাশিত মাত্রায় সবল নয়। আবার যেহেতু উত্তর ভারতে বিজয়ের জন্য বিজেপি সংখ্যাগুরুর মনোরঞ্জনে জোর দেয়, সে কারণে কেরালার মতো দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলোতে তার চূড়ান্ত নির্বাচনী সফলতার সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতেও কম।তাই এখন দেখার বিষয় আগামী বছর ঘুরতেই লোকসভা ভোট ফল করে বিজেপি।
Free Access






