‘কভারেজ’ থেকে কবিরাজি, খাদ্য রসিক বাঙালির জন্য কলেজ স্ট্রিটের ‘দিলখুসা কেবিন’
'Dilkhusa Cabin'

The Truth of Bengal: ‘দিলখুসা’র কবিরাজি বা কাটলেট এখনও হাজির স্বমহিমায়। আদতে শব্দটা ‘কভারেজ’, কিন্তু বাঙালির মুখে মুখে সেটা হয়ে গেল কবিরাজি। অর্থাৎ যে-কোনও কিছুর উপরে একটা সুন্দর পুরু আস্তরণ, মানে ‘কভারেজ’, খাদ্য রসিক বাঙালি যেটাকেই পরিচিত করল ‘কবিরাজি’ নামে। আর কবিরাজি মানেই কলেজ স্ট্রিট-মহাত্মা গান্ধী মোড়ের ‘দিলখুসা কেবিন’। কলেজ স্ট্রিট এবং মহাত্মা গান্ধী রোডের মোড়ে যেখানে এখনও ‘দিলখুসা কেবিন’-এর জাজ্বল্যমান উপস্থিতি, তার থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বেই পটলডাঙার টেনিদার অধিষ্ঠান ছিল। টেনিদার যেমন কোনও বিকল্প নেই, তেমনই ‘দিলখুসা কেবিন’-এর কবিরাজিও একমেবাদ্বিতীয়ম। এই করেনা পর্বকে অতিক্রম করেও সে আবার ফিরে এসেছে স্বমহিমায়। টেনিদার মতো বাঙালি ভোজনরসিকদের তৃপ্ত করতে। করোনা পর্বে বিভিন্ন বিধিনিষেধের জন্য যেহেতু কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাই আড্ডা জমাতে অনেকেই ভিড় করছে ‘দিলখুসা কেবিন’-এ। আর দিলখুসা মানেই তো দিল খুশ করে দেওয়া কবিরাজির আয়োজন। ফিশ কবিরাজি সবচেয়ে বিখ্যাত, কিন্তু তার সঙ্গে মটন কবিরাজি, চিকেন কবিরাজি বা এমনকি প্রন কবিরাজির মাহাত্ম্য কি কম? ভিতরে পুরু করে মাছ কিংবা চিকেন, মানে যার নামে ‘ডিশ’-এর নাম, আর তার উপরে সেই বিখ্যাত ‘কভারেজ’, মানে কবিরাজি’ আস্তরণ।
এর সঙ্গে আলাদা বাটিতে কাসুন্দি আর কুচো স্যালাড। অতীতের ঐতিহ্য অনুযায়ী এখনও ‘দিলখুসা কেবিন’-এর কবিরাজি গোটা প্লেট দখল করে নেয়। একেবারে টাটকা অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি কবিরাজি আড়ে অথবা বহরে এতটুকুও কমেনি। টেনিদা দেখলে নিশ্চিন্ত হতে পারতেন এখানে কোনও ‘যোগসপ’- এর হস্তক্ষেপ হয়নি। এমন নয় যে ‘দিলখুসা কেবিন’-এ অন্য কিছু পাওয়া যায় না। ভেজ ফ্রাইড রাইস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফ্রাইড রাইস, চাউমিন, চিলি চিকেন, এমনকি বিরিয়ানিও আছে ‘দিলখুসা কেবিন’-এর মেনু তালিকায়। কিন্তু কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়ার মতোই এই ‘ফুড আউটলেট’-এর আসল খ্যাতি বিভিন্ন ধরনের কবিরাজি, কাটলেট এবং ডেভিলের জন্য। তবে একেবারে হালফিলে চেখে দেখলাম এখনও ফিশ কবিরাজি বা মাটন ব্রেস্ট কাটলেটের তুলনা মেলা ভার। ভিতরে এখনও মাছ কিংবা মাংস পুরু করে ঠাসা, আর তার সঙ্গে সেই অসাধারণ ‘কভারেজ’ আর কাসুন্দির যুগলবন্দি। চায়ের সঙ্গে ‘টা’ যাঁরা ভালবাসেন, তাঁদের জন্য ‘দিলখুসা কেবিন’ বার বারের ঠিকানা। কলেজ স্ট্রিট যেমন বিখ্যাত তার বইপাড়ার জন্য, কিংবা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রেসিডেন্সির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক উত্তাপের জন্য, তেমনই মহাত্মা গান্ধী রোডের ওই মোড়ও তো সাক্ষী বহু বিখ্যাত বা মোড় ঘোরানো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা মিছিলের জন্য। আসলে কিন্তু এই সব ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘দিলখুসা কেবিন’ এর ‘ফুড হিস্ট্রি’ বা এত বছরের খাওয়াদাওয়ার ঐতিহ্য।
কত সাহিত্যে, কত উপন্যাসে বা কত সিনেমায় বারে বারে ফিরে এসেছে। দিলখুসা কেবিন’ বা তার কবিরাজিকে নিয়ে গল্প, স্মৃতিচারণা বা ভাল লাগার অভিজ্ঞতার কথা। ‘দিলখুসা’কে কেন্দ্র করে এই যে বাঙালির স্মৃতিমেদুরতা বা একই সঙ্গে পেলব রোমান্টিকতা, সেটাই আসলে এই ‘ফুড আউটলেট’-এর আসল ইউ এস পি। এখনও সেই টানে যেমন ষাট পেরিয়ে যাওয়া প্রবীণরা ‘দিলখুসা’তে ভিড় জমান তেমনই ওই নস্টালজিয়ার কথা জেনে তা খুঁজতে ফিরে আসেন একেবারে তরুণ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা। বাঙালি শব্দটার সঙ্গে যা যা জড়িয়ে আছে, তাতে যেমন ফেলুদা, টেনিদারা সব সময় থাকবেন, তেমনই কলকাতা শহরের বিভিন্ন সব স্মৃতি বিজড়িত রেস্তোরাঁ বা ফুড আউটলেট। ব্যাপারটা শুনতে যতই ভোঁতা হোক, কলকাতার বাইরে বাঙালির সঙ্গে যেমন জড়িয়ে আছে রসগোল্লা বা ইলিশের অনুষঙ্গ, তেমনই এই শহরের ‘দিলখুসা কেবিন’-এর মতো কিছু ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ, কলকাতায় এলে এখনও প্রবাসী বাঙালিরা যেখানে একবার ঢুঁ মারবেনই। আগে ‘দিলখুসা কেবিন’-এর আর একটি বৈশিষ্ট্যের কথা সকলের জানা ছিল, সেটা পর্দা ঝোলানো কেবিন। করোনা কাল অতিক্রম করার পর ‘দিলখুসা যখন আবার নিজের পরিচিত ‘ইলেভেন’ নিয়ে মাঠে, হাজির, তখন সেই পর্দা ঝোলানো ‘কেবিন’ আর নেই, কিন্তু মহিলা বা পরিবার নিয়ে যাঁরা আসছেন, তাঁদের খাওয়া দাওয়ার জন্য আলাদা বসার বন্দোবস্ত আছে।






