বঞ্চিত বাংলার বকেয়া বেড়ে চলা কাম্য নয় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয়
একুশ মাস আগে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন— বাংলার প্রকল্পভিত্তিক বকেয়ার পূর্ণ হিসেবসহ শ্বেতপত্র প্রকাশ করার।
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্ক যেন এক সূক্ষ্ম সেতুবন্ধনের মতো— আস্থা, সহযোগিতা ও সাংবিধানিক দায়িত্ববোধের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বহুত্ববাদী ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার ভিতটিই নড়বড়ে হয়ে ওঠে যখন রাজ্যবাসীর ন্যায্য প্রাপ্য ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধের’ নামে আটকে রাখা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলার প্রতি কেন্দ্রীয় আর্থিক বরাদ্দের ধারাবাহিক অবহেলা যে শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতার ফল নয়, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের ইচ্ছাকৃত নীতিগত শীতলতা, তার প্রমাণ ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে সংসদ থেকে গ্রামবাংলার মাটিতেও। সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হতেই যখন তৃণমূল সাংসদরা সাদা কাগজ তুলে ধরলেন, অনেকেই ভাবলেন প্রতীকী প্রতিবাদের আরও একটি ছবি। কিন্তু সত্যিই কি এটি শুধু প্রতীকী? যখন কাগজটি সাদা থাকে, তা অনেক সময়ই বলে দেয়— জবাবদিহির নামান্তরে এক গভীর নীরবতা।
প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকার বকেয়া— এই সংখ্যাটি শুধু অর্থের অঙ্ক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার কোটি মানুষের জীবনধারণের মৌলিক অধিকার, উন্নয়ন প্রকল্পের গতি, গ্রামীণ পরিকাঠামোর মান, দারিদ্র্য বিমোচনের পথ, এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়তার ফলে যে দীর্ঘ স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তার অভিঘাত বোঝা যায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে। আবাস যোজনার নতুন ঘর উঠতে না উঠতেই থমকে গেছে বরাদ্দের অভাবে। আর যেখানে একশো দিনের কাজের উপার্জনকারীরা আজও অপেক্ষায়— কবে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক মিটবে।
একুশ মাস আগে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন— বাংলার প্রকল্পভিত্তিক বকেয়ার পূর্ণ হিসেবসহ শ্বেতপত্র প্রকাশ করার। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এ দাবি কোনও দলের দাবি নয়, এটি একটি রাজ্যের, বরং একটি সমগ্র জনগোষ্ঠীর দাবি। কিন্তু সেই শ্বেতপত্র আজও আসেনি, এর বদলে এসেছে অস্বস্তিকর নীরবতা। এই নীরবতা সরকারের আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে না, বরং প্রকাশ করে জবাবদিহির প্রতি অস্বীকৃতি। এমনকী সংসদের অভ্যন্তরে যখন বিরোধীরা একের পর এক প্রশ্ন তুলেছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা তা পাশ কাটিয়ে গিয়েছে কৌশলগত অস্পষ্টতায়। কিন্তু সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে কেন্দ্র নিজেই স্বীকার করেছে— একশো দিনের কাজের ক্ষেত্রে বাংলার জন্য বরাদ্দ কার্যত শূন্য। এই স্বীকারোক্তিই বলে দেয় পরিস্থিতির গভীরতা কোথায় দাঁড়িয়েছে।
একশো দিনের কাজ— ভারতের অন্যতম সফল কর্মসংস্থান প্রকল্প— গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। যে প্রকল্পটি গ্রামবাংলার মানুষের হাতে ন্যায্য শ্রমের বিনিময়ে ন্যূনতম আয়ের ভরসা দিয়েছিল, যা দারিদ্র্যকে সাময়িক হলেও দূরে রাখার একটি সুযোগ দিয়েছিল, সেটিই আজ রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ। অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক নয়, তথ্যেও তা স্পষ্ট— গত চার বছর ধরে বাংলা এক পয়সাও পায়নি, অথচ অন্যান্য রাজ্য নিয়মিত বরাদ্দ পেয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েও একশো দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা হয়েছে, যা বিচারব্যবস্থার প্রতি একরকম অবজ্ঞার সামিল।
এই টাকা আটকে গেলে প্রভাব পড়ে শুধুমাত্র শ্রমিকের পকেটে নয়— প্রভাব পড়ে গ্রামে অর্থের সঞ্চালনে, বাজারে, ছোট ব্যবসায়, এমনকী কৃষিকাজেও। শ্রমিক টাকা না পেলে দোকানদার মাল বিক্রি করতে পারে না। দোকানদার আয় না করলে কৃষকের বীজ কেনার পয়সা আসে না। কৃষক উৎপাদন কমালে বাজারে দ্রব্যের দাম বাড়ে। অর্থনীতির এই সরল চক্রের প্রতিটি ধাপে একটি রাজনৈতিক বঞ্চনার ঢেউ আঘাত করে। অর্থনীতির এই বাস্তবতা রাজনীতির কোলাহলে চাপা পড়ে যায়, কিন্তু গ্রামীণ পরিবারগুলির প্রতিদিনের জীবনে তা স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
গ্রামীণ রাস্তা প্রকল্প— যা গ্রাম ও শহরের মধ্যে জরুরি যোগাযোগ রক্ষা করে— তার অগ্রগতি একইভাবে আটকে গেছে। গ্রাম বাংলার রাস্তা মানে শুধু চলাচলের পথ নয়, এটি স্কুলে যাওয়া শিশুর নিরাপত্তা, কৃষকের পণ্যের বাজারে পৌঁছনোর সুযোগ, অসুস্থ মানুষের হাসপাতালে পৌঁছনো, এমনকী গ্রামে বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনাও সেই রাস্তার উপর নির্ভরশীল। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ আটকে গেলে এই প্রকল্পগুলোর কাজ অর্ধেক থেমে থাকে, আর তার দায়ভার পড়ে রাজ্যের উপর। কিন্তু রাজ্যের পক্ষে দেশের সবচেয়ে বড় গ্রামীণ রাস্তা নেটওয়ার্কগুলোর এককভাবে বহন করা প্রায় অসম্ভব।
আবাস যোজনার ক্ষেত্রেও একই ছবি। যেখানে গরিব মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হওয়ার কথা ছিল, সেখানে নির্মাণের কাজ থমকে গেছে। হাজার হাজার নতুন ঘর তৈরি হওয়া বাকি, অনুমোদন মিললেও টাকা না আসায় কাজ এগোয়নি। এর ফলভোগ করে সেই মানুষটাই, যার স্বপ্ন ছিল মাথার ওপর ছাদ। কেন্দ্র-রাজ্যের দ্বন্দ্বে এইসব মানুষের কোনও ভূমিকা নেই, অথচ তাদের ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকে অনিশ্চয়তার দড়িতে।
প্রশ্ন উঠতে পারে— কেন এই বঞ্চনা? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির পরাজয় কেন্দ্রীয় নীতির সুরেই প্রভাব ফেলেছে। কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজ্যের উন্নয়নকে নির্বাচনী প্রতিশোধের অজুহাতে আটকে রাখা সাংবিধানিক নৈতিকতার পরিপন্থী। ভারতের ফেডারেল কাঠামো একটি সমঝোতার উপর দাঁড়িয়ে— কেন্দ্র কখনও পিতৃতান্ত্রিক অভিভাবকের ভূমিকা নেবে না, বরং হবে সহযোগী সঙ্গী, সমমর্যাদার অংশীদার। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ভূমিকা যেন প্রতিপক্ষ, প্রতিশোধপরায়ণ এক প্রশাসনিক অবস্থান।
তৃণমূলের অভিযোগ অনুযায়ী কেন্দ্র বিশেষ উদ্দেশ্যে বঞ্চনার পথ বেছে নিয়েছে। যদিও কেন্দ্র পাল্টা যুক্তি দেয়—দুর্নীতির অভিযোগের কারণে টাকা আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু, বিচারব্যবস্থার নির্দেশ মানতে কেন্দ্রের অনীহা প্রশ্ন তোলে— দুর্নীতি রোধ যদি প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়, তবে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে আপত্তি কোথায়? তা ছাড়া, অন্য রাজ্যগুলোকে কোনও পর্যবেক্ষণ ছাড়াই টাকা দেওয়া হলে, দুর্নীতি শুধুমাত্র বাংলাতেই কেন এত বড় উপদ্রব? সমালোচকরা মনে করেন, কেন্দ্রের যুক্তি অনেক সময়ই রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত, যা বাস্তব তথ্যের তুলনায় বেশি বিভ্রান্তিকর।
তবুও প্রশ্ন থাকে— সমস্যার সমাধান কোথায়? প্রথমত, শ্বেতপত্র প্রকাশই এই সমগ্র বিতর্কের মূল চাবিকাঠি। সমস্ত রাজ্যের বকেয়া, বরাদ্দ, নিষ্পত্তি— সব কিছুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশে কেন্দ্র বাধ্য হলে রাজনীতি নয়, তথ্য কথা বলবে। আর তথ্যে কোনও পক্ষপাত থাকে না। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বিত বৈঠক নিয়মিত হওয়া দরকার যাতে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বজায় থাকে। দেশের উন্নয়ন কোনও দলের রাজনৈতিক উঠে পড়া নয়— এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। তৃতীয়ত, সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের নির্দেশ অবজ্ঞা করলে তা গণতন্ত্রের ভিতকে দুর্বল করে। তাই বিচারবিভাগীয় আদেশ পালনে কেন্দ্র বা রাজ্য কোনও পক্ষেরই রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশ চলতে পারে না।
বাংলার রাজনৈতিক জমি বহু দশকের সামাজিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও মানবিক সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। উন্নয়ন ও অধিকার এই রাজ্যের মানুষের মৌলিক দাবি। এই দাবি পূরণে যদি কেন্দ্রীয় বরাদ্দ রাজনীতির খেলার ছকে বন্দি হয়, তবে ক্ষতি শুধু বাংলার নয়, ক্ষতি হয় ভারতের সাংবিধানিক সংহতিরও। কারণ, বঞ্চনা যখন নজির হয়ে দাঁড়ায়, তখন অন্য রাজ্যও ভবিষ্যতে একই রাজনৈতিক আচরণের শিকার হতে পারে। সেই পথ বিপজ্জনক। কারণ তা ভারতের গণতন্ত্রকে ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়করণের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে কেন্দ্রই সর্বশক্তিমান, আর রাজ্যগুলো ভিক্ষুকের অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে।
এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করার। একটি দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মানে কোনও রাজ্যের জনগণের মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া নয়। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান, সব রাজ্যের উন্নয়ন সমান গুরুত্বের। তৃণমূল সাংসদদের সাদা কাগজ সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে— জবাবদিহি এড়ানো যায় না। প্রশ্ন করা, প্রতিক্রিয়া জানানো, তথ্য প্রকাশ করা— এই সমস্তই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেন্দ্র যদি এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তা হলে গণতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
আগের বাম সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল বাংলায়। আজ সেই প্রতিবাদ নতুন রূপে ফিরে এসেছে। কিন্তু ইতিহাস বলে- বঞ্চনা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সত্য শেষ পর্যন্ত জিতেই যায়। কেন্দ্র-রাজ্যের এই টানাপোড়েনের মধ্যেও বাংলার মানুষ আশা রাখে— ন্যায্য প্রাপ্য একদিন ফিরেই আসবে। রাজনীতি বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু মানুষের অধিকার বদলায় না। সেই অধিকারই আজ বাংলার বকেয়ারূপে কড়া নেড়ে বলছে— ‘এবার জবাব দাও।’
একটি ফেডারেল দেশের শক্তি তার ন্যায্যতা ও ভারসাম্যে। কেন্দ্রের দায়িত্ব রাজ্যকে বঞ্চিত করা নয়, বরং তার হাত ধরেই অগ্রগতির পথে নিয়ে যাওয়া। রাজনৈতিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে এই সত্য গ্রহণ করাই হল সমাধানের পথে প্রথম পদক্ষেপ। বকেয়া শুধু টাকার নয়, বকেয়া সহযোগিতার, বকেয়া আস্থার। সেই বকেয়া মেটানোই আজকের একমাত্র পথ।


