সম্পাদকীয়

কেন তন্ত্রমতে কালীই আদ্যাশক্তি? ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ

কোজাগরী পূর্ণিমার রাত থেকেই যেন শুরু হয়ে যায় আসন্ন দীপাবলির প্রস্তুতি।

রাজু পারাল: তিনি আছেন বলেই সমগ্র জগৎ একটি নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি আছেন বলেই পরমাত্মা জাগরিত হচ্ছে। জীবজগতের জীবন-মৃত্যু, সৃষ্টি-ধ্বংস তারই ইশারায় চলে। তিনি আছেন বলেই আমরা সবাই মাতৃভাবে ভাবিত। মায়ের দেওয়া শক্তি থেকেই আসে অভয় শক্তি, যা অক্ষয়। তন্ত্রমতে দেবী কালী দশ মহাবিদ্যার প্রথম দেবী। শাক্ত মতে কালী, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ। দেবী কালী দেবী দুর্গার অন্য রূপ। যিনি ‘শ্যামা’ বা ‘আদ্যাশক্তি’ রূপে পূজিত হন। তার মূর্তিতে সারল্য ও কাঠিন্যের এক অপূর্ব সমাবেশ দেখা যায়। তিনি যেমন নৃমুণ্ডমালিনী, করালবদনা, ভয়ঙ্করী আবার তেমনই তিনিই বরাভয়দাত্রী। তার চোখ দুটি প্রভাতী সূর্যের মতো উজ্জ্বল। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘কালীই ব্রহ্ম, ব্রহ্মই কালী। তিনিই নানাভাবে লীলা করেন।’

কোজাগরী পূর্ণিমার রাত থেকেই যেন শুরু হয়ে যায় আসন্ন দীপাবলির প্রস্তুতি। ঠিক এক পক্ষকাল পরের অমাবস্যার গহন, ছায়াচ্ছন্ন নিশীথে বাংলার ঘরে ঘরে আমরা মেতে উঠি করালবদনা দেবী কালীর আরাধনায়। প্রশ্ন থেকে যায় কে এই দেবী কালী? যিনি রণে, বনে, জঙ্গলে আমাদের ‘অগতির গতি’ হয়ে উঠেছেন। বলা যেতে পারে তিনি আমাদের প্রেরণাদাত্রী, আবার অভয়প্রদায়িনীও। তিনি শুভের রক্ষাকত্রী, অশুভের বিনাশকারিণী। আসলে দশভুজা দুর্গার মতোই দেবী কালীও বাঙালির প্রাণের দেবী। দেবী দুর্গাকে নিয়ে মাতামাতি কেবল বছরের একটি সময়। কিন্তু কালী বছরভর, মানুষের ঘরে ঘরে।

হিন্দুদের অন্যতম দেবী কালীর রূপ অতীব ভীষণা, বিবসনা, করালবদনা, আলুলায়িত কেশরাশি, গলায় নরমুণ্ডের মালা, চতুর্ভূজা। লোল জিহ্বা। বাঁদিকের নিচের হাতে সদ্যছিন্ন মুণ্ড। ওপরের হাতে খড়্গ। ডানদিকের নিচের হাতে অভয় এবং ওপরের হাতে বরমুদ্রা। গায়ের রং

কালবৈশাখী মেঘের মতো। দেশ কালে ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আদৌ আবদ্ধ নন তাই তিনি দিগম্বরী। দেবীর অবস্থান শ্মশানে শায়িত মহাদেবের বুকের ওপর। এমনই পরিবেশ যেখানে রাতচরা প্রাণীরা ভীষণ আওয়াজ করে চলে। দেবী কালীর এই রূপ তান্ত্রিক শিরোমণি কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের মনে ধরেনি। তাঁর মনে হয়েছিল মায়ের এই ভয়ঙ্করী রূপ সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি চেয়েছিলেন মা হবেন অভয়া, সহাস্যবদনী, ক্ষমারূপা করুণাময়ী যা দেখে ভক্তদের মনে ঘটবে প্রেমাভক্তির আবেশ। বিনাশিনীর পরিবর্তে মা হবেন সর্বসিদ্ধিপ্রদায়িনী। দেবী কালীর

আশীর্বাদে শেষপর্যন্ত আগমবাগীশের ইচ্ছাই পূর্ণ হয়েছিল। করুণাময়ী শ্যামা বিগ্রহই সকলের কাছে পূজ্য হয়ে উঠেছিল। যা আজও প্রবহমান।

তন্ত্র পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপের কথা বর্ণিত হয়েছে। তোড়লতন্ত্রে ন’প্রকার কালীর উল্লেখ আছে। যেমন– দক্ষিণা কালী, কৃষ্ণকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, শ্রীকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও মহাকালী। আবার অভিনব গুপ্তের ‘তন্ত্রালোক’ ও ‘তন্ত্রসার’ গ্রন্থ দুটিতে  কালীর তেরোটি রূপের উল্লেখ আছে। এছাড়াও বিভিন্ন মন্দিরে ব্রহ্মময়ী, আনন্দময়ী, ভবতারিণী ইত্যাদি নামেও দেবী কালীর পুজো বা উপাসনা হয়ে থাকে।

বছরভর গৃহে ও মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কালী প্রতিমার পুজো হলেও কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে যে দীপান্বিতা কালীপুজো হয় তা বাংলায় বিশেষ জনপ্রিয়। এই উৎসব সাড়ম্বরে আলোকসজ্জা সহকারে পালিত হয়। সাধারণত মধ্যরাত থেকে পুজো শুরু হয় এবং তা চলে ভোররাত পর্যন্ত। এইভাবে, ভক্তিপ্রধান অঞ্চল বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে দেবী মহামায়ার আরাধনা। কথিত আছে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র অষ্টাদশ শতকে তাঁর সকল প্রজাকে শাস্তির ভয় দেখিয়ে কালীপুজো করতে বাধ্য করেন। সেই থেকে নদিয়ায় কালীপুজো বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরের দিকে কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রও বহু অর্থ ব্যয় করে কালী পুজোর আয়োজন করতেন।

কালীক্ষেত্র হিসেবে বাংলার নামডাক বা সুখ্যাতি বিস্তর। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় ছড়িয়ে রয়েছে বহু কালীমন্দির। খোদ কলকাতাতেই রয়েছে বিখ্যাত সব কালীমন্দির। কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত কালীমন্দিরটি হল কালীঘাটের মন্দির। একসময় স্রোতস্বিনী আদিগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠে একান্ন পীঠের অন্যতম মহাপীঠ ‘কালীঘাট’। এই কালীপীঠ মহাশক্তিপীঠ। সকল পীঠস্থানের শ্রেষ্ঠ। কালীঘাটের ধাত্রীদেবী মহাশক্তি স্বরূপিণী জগজ্জননী দক্ষিণাকালী। বিষ্ণু চক্রে খণ্ডিত সতীদেহের ডান শ্রীচরণের চারটি আঙুল (মতান্তরে একটি) আদি গঙ্গার তীরে পতিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছিল আজকের পুণ্যময় মহাতীর্থ ‘কালীঘাট’। কালীঘাটের কালীমন্দির নিয়ে বহু কিংবদন্তি জড়িয়ে রয়েছে। বহু সাধকের সাধনার কেন্দ্রভূমি এই শক্তিপীঠ। এই মহাতীর্থ দর্শন করে গিয়েছেন মহাসাধক বামাখ্যাপা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এখানে এসে দেবী কালিকার দিব্যদর্শন পেয়েছেন।

কালীঘাট ছাড়াও দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি, আদ্যাপীঠ, ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি, ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি ইত্যাদি কলকাতা অঞ্চলের বিখ্যাত কয়েকটি কালী মন্দির। এছাড়া শান্তিনিকেতনের কাছে কঙ্কালীতলা, কালনার সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, তারাপীঠের কালীমন্দির, জয়নগরের ময়দা কালীবাড়ি ও ধন্বন্তরি কালীবাড়ি, হালিসহরের রামপ্রসাদী কালীমন্দির ইত্যাদি পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত কয়েকটি কালীমন্দির। এছাড়া আসামের কামাখ্যা, ত্রিপুরার ত্রিপুরেশ্বরী কালীমন্দির বিশেষ জনপ্রিয়। ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির নতুন দিল্লি কালীবাড়ি একটি ঐতিহ্যপূর্ণ কালীমন্দির।

দেবী কালীকে বিষয়বস্তু করে সময়ে সময়ে রচিত হয়েছে বহু শ্যামাসঙ্গীত যা বাংলা সাহিত্যে সঙ্গীত ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে রয়েছে। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ সাধক এবং বিশিষ্ট কবিরা অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামসঙ্গীত লিখেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ ও লিখেছিলেন ‘মৃত্যুরূপা কালী’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা এবং তাঁর শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা ‘মাতৃরূপা কালী ‘নামে লিখেছিলেন একটি প্রবন্ধ।

উনিশ শতকের প্রাচ্যবাদী কথাসাহিত্যে দেবী কালী বর্ণিত হন ঠগী, হত্যাকারীদের পূজিত দেবীরূপে, যিনি ভক্তদের কাছে বলি দাবি করেন। আবার ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা মা কালীকে দেখেছিলেন গৌরবহৃত ভারত মাতা রূপে। বিংশ শতাব্দীতে নারীবাদীরা দেবী কালীকে দেখতে শুরু করেন মুক্তির প্রতীক হিসেবে।

Related Articles