
Truth Of Bengal: কাজল ব্যানার্জী: ইহা খুবই সুখের বিষয় যে, ইদানীং আমাদের দেশে জাতীয়তাবোধ বেশ মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে। কেন্দ্রীয় সরকার গত কয়েক বৎসর যাবৎ দেশের সীমান্ত, পররাষ্ট্র এবং সর্বোপরি সেনাদের কার্যকলাপের বিষয়গুলিকে দেশবাসীর চর্চায় আনিতে সমর্থ হইয়াছে।
সমগ্র দিবসের পরিশ্রম শেষে যে সকল হিন্দু ও মুসলিম কৃষকদের একদা নিয়মিত একই বিপণিতে চায়ের আড্ডায় ফসলের ভালমন্দের গল্প করিতে দেখিতাম। অদ্য তাহাদের গল্পে চীন, পাকিস্তান, কাশ্মীর, অথবা এনআরসি-র বিষয়ে তর্কতর্কি দেখিতে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছি।
কাহারা দেশে থাকার ছাড়পত্র পাইবেন আর কাহারা দেশ থেকে বিতাড়িত হইবেন, সেই আশা-আশঙ্কা বা সংশয়ের দোলাচলে সরল, সাদাসিধা গ্রাম্যজীবনেও যেন বিভেদরেখা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। দেশাত্মবোধের জোয়ারে আমাদিগের জাত্যাভিমানও প্রকট হইয়াছে। ভিনধর্মীয় বন্ধুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতেও বক্রতা আসিয়াছে। যে হিন্দুকে ইতিপূর্বে গৃহে ঈশ্বর ভজনায় মাতিতে দেখি নাই, তিনিও বর্তমানে প্রতিটি তিথিতে ‘জন-কামাই’ করিয়া নিয়মিত মুর্তিপূজার মাধ্যমে আত্মতৃপ্তি লাভ করিতেছেন।
যে মুসলিম বন্ধুটিকে রমজান মাস ভিন্ন কখনেও নামাজ পড়িতে দেখিনাই, তিনিও আজ নিয়মিত নামাজ পাঠে নিজেকে অভ্যস্ত করিয়া তুলিয়াছেন। সকলেই যেন স্থির বিশ্বাসে উপনীত হইয়াছেন যে, ধর্মই তাহাদিগের মুক্তির একমাত্র পথ। এই সকল বিষয় প্রত্যক্ষ করিয়া ইদানীং ‘জাতীয়বোধ’ শব্দটির মধ্যে বড় ‘জাত বিষয়ক বোধ’-এর গন্ধ পাইতেছি।
পরাধীন ভারতবর্ষে সকলের অভিন্ন শত্রুরূপে ইংরাজ শক্তি আমাদিগকে পরস্পরের কাছে আনিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতালাভের পর আমাদিগের শক্র অভিন্ন নহে। আমরাই বর্তমানে পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হইয়া নিজ নিজ গাত্রেই উষ্ণতার অনুশীলন করিতেছি।
ফলে স্বাধীনতালাভের পর দেশবাসীর মধ্যে দেশাত্মবোধের যে ভাটা পড়িয়াছিল, তা ‘অভিনন্দনের’ বীর বিক্রমে অথবা সীমান্তে মৃত সেনাদিগের শববাহী যানের শোভাযাত্রায় আজ অনেকটাই ‘পুনরুদ্ধার’ হইয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে। সময় সময় দেশাত্মবোধের অনুভবে শরীর এমন অস্থির হইয়া উঠিতেছে যে গোলাবারুদ সহযোগে সীমান্তে যুদ্ধে যাইতেও মনে প্রবল বাসনার উদ্রেগ হইতেছে।
তবে সরকার দেশবাসীর দেশাত্মবোধে জাগ্রত করিতে সমর্থ হইলেই তাহার নিজ ক্রিয়াকলাপে অদ্যাবধি দেশাত্মবোধের নমুনা উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত হয় নাই। কয়েকটি ঘটনাই তাহার প্রমাণ নির্দেশ করিতেছে। কয়েক বছর পূর্বে সরকারি নিষেধাজ্ঞায় স্মার্টফোনে বিদেশি অ্যাপ বর্জিত হইলেও সেই দেশ হইতে হাজার হাজার কোটি টাকার স্মার্টফোন ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়া সরকার তাহার স্মার্টনেস প্রদর্শন করিতে পারে নাই।
কারণ, লকডাউনে ‘মিত্রের’ ডাটা-ব্যবসা ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিবার পথ প্রশস্ত করিতে এই মুহূর্তে বাজারে স্মার্টফোন আমদানি জরুরি হইয়া পড়িয়াছিল। দেশীয় পাটশিল্পের অন্তর্জলিযাত্রা ঘটিলেও বিদেশি প্লাসটিক বস্তার আমদানিতে সরকার বাহাদুর অদ্যাবধি নিষেধাজ্ঞা জারির সাহস দেখাইতে পারে নাই।
দেশের জনগণের জীবন বা স্বাস্থ্যের বিমাকরণ বা নিরাপত্তা প্রদান সরকারের কর্তব্য হইলেও তাহা সরকার তো করিতে পারেন নাই, উপরন্তু নাগরিক নিজ অর্থে সেই বিমা করিলে তাহার ওপরও কর বসাইয়া নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রীয় কর্তব্য তথা দেশাত্মবোধের স্বাক্ষর রাখিয়াছে। অনেক সামগ্রীই দেশে উৎপাদন যোগ্য হইলেও বিদেশ হইতে ক্রয় করিবার চলে ছেদ দেখিতেছি না।
রাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষের কথা বিবেচনায় না রেখে সর্ব বিষয়ে বেসরকারিকরণের যে সকল উদ্যোগ দৃষ্ট হইতেছে, তাহাতে সরকারকে অভিভাবকের পরিবর্তে ‘ব্যবসায়িক মহাজন’ বলিয়া মনে হইতেছে। করোনাকালে বিদেশের আবেদনে সাড়া দিয়া বিনা অর্থে ঔষধ পাঠাইতে সমর্থ হইলেও দেশের পরিযায়ী শ্রমিকের নিকট হইতে ট্রেন ভাড়া চাইতেও সরকারকে লজ্জিত হইতে দেখি নাই। দেশের সহায় সম্বলহীন প্রান্তিক মানুষদিগের প্রতি এই ঔদাসীন্য ও ব্যবসায়িক মানসিকতাকেই বোধহয় সরকারি সংজ্ঞায় ‘দেশাত্মবোধ’ রূপে আখ্যায়িত করা যায়!
এমনকি জাতীয় শিক্ষানীতিতেও দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষের লক্ষ্যে ইংরেজি শিক্ষাকে অনেকটাই ব্রাত্য করিবার পন্থা গৃহীত হইয়াছে। যে দেশের একটি বৃহদংশের শিক্ষার্থী প্রাথমিকের পর লেখাপড়া ছাড়িয়া দেয়, সেই দেশে সরকারি ও সরকার পোষিত বিদ্যালয় সমূহে ষষ্ঠ শ্রেণি হইতে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার সিদ্ধান্ত, দেশবাসীকে পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণায় ব্রাত্য করিয়া রাখিবার প্রয়াস বলিয়াই অনুমিত হয়।
এতসব দেখিয়া মনে বড় প্রশ্ন জাগিতেছে– নাগরিকের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে আন্তর্জাতিকতাবোধও কি গুরুত্বপূর্ণ নয়? না কি আন্তর্জাতিকতাবোধকে বাদ দিতে পারিলেই কি জাতিয়তাবোধের বিকাশের গতি ত্বরান্বিত হইবে? দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আস্থা ফেরানোর পদক্ষেপ অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। কিন্তু শুধু কণাদ পড়িয়াই ডালটন, রাদাফোর্ড বা নীলস্ বোর না পড়িলে কি পরমাণু সম্পর্কে সম্যক ধারণা জন্মিবে? সত্যেন্দ্রনাথের বোসন কণা জানিলেই নিউটন, আইনস্টাইন, ম্যাক্সওয়েল জানিবার প্রয়োজন পড়িবে না?
বরাহ মিহিরকে পড়িয়া কেপলার বা গ্যালেলিও না পড়িলে কি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ধারণা সম্পূর্ণ হইবে? রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি শেক্সপিয়ার, ওয়ার্ডসওয়াথ, বায়রন বা কীটস পড়িলে কি রবীন্দ্রসাহিত্য চর্চায় কি টান পড়িবে? তলস্তয়কে বাদ দিয়া গান্ধির দর্শন সম্পূর্ণ হইবে?
অতএব বিবিধ কার্যকলাপ দর্শন করিয়া ইহাই অনুমিত হয়, অদক্ষ শাসকের ভ্রান্ত্রনীতিতে অর্থনীতির যে বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ইতিমধ্যে ইহয়াছে যে, তাহাতে দেশের সীমাহীন দারিদ্র ও অর্থনৈতিক সংকট আসন্ন। তাহাকেই অতিক্রম করিবার জন্য ভক্তিভরে উপবাসের ন্যায় জাতীয়তাবোধ-কেই ব্রত করিতে হইতেছে। ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’ বলিয়াই জানিয়াছি। তাই বুভুক্ষু মানুষের আত্মোৎসর্গে দেশাত্মবোধ প্রতিষ্ঠা হইবে কি না তা নিশ্চিত না হইলেও, দেশ সকলের অন্নবস্ত্র বাসস্থান বা কর্মংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে পারিলে দেশের জয়গান নিশ্চিত হইতো– এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নাই।






