সম্পাদকীয়

পরিবেশের সুস্থতা রক্ষায় ভরসা গ্রিন এনার্জি

গ্রিন এনার্জির প্রসার শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ নয়, মানব সভ্যতার জন্য অপরিহার্য।

বিশ্বজিৎ বৈদ্য (বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক): মানব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি, শিল্পায়ন এবং নগরায়নের বিস্তার পরিবেশের ভারসাম্যকে ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আজকের বিশ্বে বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলি প্রতিদিনের বাস্তবতা। উন্নয়ন ও আধুনিকতার স্বপ্ন কখনও কখনও পরিবেশের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করেছে যা প্রকৃতিকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশের সুস্থতা রক্ষার একমাত্র কার্যকর উপায় হল স্থায়িশীল, দূষণমুক্ত এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎস গ্রহণ করা। গ্রিন এনার্জি (Green Energy) সেই সমাধানের মূল হাতিয়ার।

গ্রিন এনার্জি বলতে বোঝায় এমন সকল শক্তি উৎস যা পুনর্নবীকরণযোগ্য, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল। সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি, জলবিদ্যুৎশক্তি, জৈব শক্তি এবং ভূ-তাপীয় শক্তি— এসবই গ্রিন এনার্জির প্রধান উদাহরণ। তুলনামূলকভাবে, জীবাশ্ম জ্বালানি যেমন কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস প্রচুর কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে, যা গ্রিনহাউস প্রভাব বাড়ায় এবং জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট করে। আইপিসিআর-এর ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৬০ শতাংশ দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি। এই নিঃসরণ কমানো না হলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং অপ্রত্যাশিত প্রভাব ফেলবে। তাই গ্রিন এনার্জির প্রসার শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ নয়, মানব সভ্যতার জন্য অপরিহার্য।

গ্রিন এনার্জির অন্যতম প্রধান সুবিধা হল দূষণমুক্ত শক্তি উৎপাদন। সৌরশক্তি ব্যবহারে বাতাসে কোনও ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয় না। বায়ু শক্তি উৎপাদনও পরিবেশে দূষণ ছড়ায় না। হাইড্রোইলেকট্রিসিটি নদী বা জলাশয় ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে, যা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ। এর ফলে শিল্পায়ন ও নগরায়নের চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব, পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। এই শক্তি ব্যবহারে বায়ুদূষণজনিত রোগ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং গ্রিনহাউস প্রভাব হ্রাস পায়।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও গ্রিন এনার্জি (Green Energy) গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগ করে দেশগুলো শুধু পরিবেশ রক্ষা করে না, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করে। সৌর শক্তি খাতে প্যানেল উৎপাদন, হাওয়ার টারবাইন স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ— এসব ক্ষেত্রে কোটি কোটি মানুষ যুক্ত হয়েছেন। গ্রিন এনার্জি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সুস্থায়ী দিকনির্দেশনা দেয় এবং পরিবেশ ও অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখে।

তর্কের পক্ষে আরও যুক্তি হল— গ্রিন এনার্জি দেশের নির্ভরতা কমায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ওঠাপড়ার কারণে দেশগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তায় পড়ে। গ্রিন এনার্জি গ্রহণ করলে দেশগুলো নিজস্ব শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে এই অনিশ্চয়তা কমাতে পারে। ফলে এটি কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তারও প্রতীক।

কিন্তু বিপক্ষে যুক্তি হল, গ্রিন এনার্জি (Green Energy) নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সৌর বা বায়ু শক্তির প্রথম বিনিয়োগ অনেক বেশি। সৌর প্যানেল, হাওয়ার টারবাইন বা হাইড্রোস্টেশন নির্মাণে অর্থ ব্যয় অনেক। এছাড়া, এই শক্তি উৎপাদন প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল—সূর্যের আলো, বাতাসের গতিবেগ বা জলপ্রবাহ। কখনও কখনও পর্যাপ্ত উপাদান না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থাপনা এই সীমাবদ্ধতা কমাতে সাহায্য করে।

গ্রিন এনার্জি গ্রহণের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা অস্বীকার করার উপায় নেই। সৌর শক্তি স্কুল, হাসপাতাল, শিল্প কারখানা ও বাসস্থানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন শক্তি সরবরাহ করতে পারে এবং বায়ুদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে। বায়ু শক্তি বাতাসের গতিবেগ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, যা প্রাকৃতিক উপাদানের ক্ষতি না করে শক্তি নিশ্চিত করে। জলবিদ্যুৎ নদী বা জলাশয় ব্যবহার করে স্থায়ী এবং নির্ভরযোগ্য শক্তি উৎপাদন করে।

বিশ্বের কিছু দেশ ইতিমধ্যেই গ্রিন এনার্জির মাধ্যমে পরিবেশ সুস্থতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিয়েছে। ডেনমার্ক এবং জার্মানি বায়ু ও সৌর শক্তি ব্যবহার করে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমিয়েছে। চিন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রে সৌর শক্তি খাত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। ভারতের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই উদ্যোগ শুধু পরিবেশের জন্য নয়, অর্থনৈতিকভাবে দেশগুলোকেও শক্তিশালী করছে।

গ্রিন এনার্জির (Green Energy) সামাজিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। এটি গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান তৈরি করে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী সৌর প্যানেল ইনস্টলেশন, হাওয়ার টারবাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও জৈবিক বায়োমাস ব্যবস্থাপনায় সরাসরি যুক্ত হয়। ফলে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয় এবং পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ গ্রিন এনার্জি পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সামাজিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে।

তর্কের বিপক্ষে যুক্তি হল, যদিও গ্রিন এনার্জি দূষণ কমায়, তবে এর ব্যবহারের ফলে কিছু পরিবেশগত প্রভাবও দেখা দেয়। হাইড্রোস্টেশন নির্মাণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হয়, যা জলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করতে পারে। বায়ু টারবাইন স্থাপন করলে পাখি ও বাদুড়ের প্রজনন চক্রে প্রভাব পড়তে পারে। সৌর প্যানেল উৎপাদনের সময় কিছু রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তবে এই সমস্যাগুলো প্রযুক্তিগত উন্নতি, যথাযথ পরিকল্পনা এবং পরিবেশমূলক প্রভাব মূল্যায়নের মাধ্যমে কমানো সম্ভব।

পরিবেশ সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে গ্রিন এনার্জি (Green Energy) অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি ক্রমশ বেড়ে চলেছে। আইপিসিসি-এর ২০২২ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে যদি নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি না পায়, তবে গ্লোবাল ওয়ার্মিং ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। গ্রিন এনার্জির প্রসার না হলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় এলাকা ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি নিশ্চিত।

ডেনমার্কের বায়ু শক্তি ব্যবহার একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত। দেশটি তার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৪০শতাংশ বায়ু শক্তি থেকে উৎপন্ন করে। জার্মানি তার ‘এনার্জিওয়েন্ডে’ নীতি অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানির নির্ভরতা কমিয়ে ৬০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করছে। চিনে সৌর শক্তি খাতের বিস্তার দ্রুত হচ্ছে, যেখানে প্রতি বছর ৫০ গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ সংযুক্ত হচ্ছে। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ও নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তি গ্রহণ করা সম্ভব এবং এটি পরিবেশের জন্য কার্যকর।

ভারতে ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, সৌর শক্তি ও বায়ু শক্তিতে মোট বিনিয়োগ ৮০০ বিলিয়ন টাকা ছাড়িয়েছে। সিকিম, কেরল, রাজস্থান, গুজরাটসহ বিভিন্ন রাজ্যে সৌরখাত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। হাইড্রোইলেকট্রিসিটি খাতেও নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে শক্তি উৎপাদন নিশ্চিত করা হচ্ছে। এই প্রকল্পগুলো পরিবেশবান্ধব, সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ এবং অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর। নবায়নযোগ্য শক্তি খাতের মূল চ্যালেঞ্জ হল স্থায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করা। সৌর শক্তি ব্যাটারি স্টোরেজের মাধ্যমে রাতের সময়ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম। বায়ু শক্তির ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড ও ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম ব্যয় কমাতে এবং বিদ্যুৎ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। জৈব বায়োমাস ব্যবহার করে গ্রামীণ শক্তি চাহিদা পূরণ করা যায় এবং কৃষিবর্জ্য অপচয় রোধ করা যায়। গ্রিন এনার্জি গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়ায়। সৌর প্যানেল ইনস্টলেশন, হাওয়ার টারবাইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং বায়োমাস ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মানুষরা যুক্ত হয়। ফলে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয় এবং পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হয়ে ওঠে। এটি একটি বহুমুখী উন্নয়নের উদাহরণ।

উপসংহারে বলা যায়, পরিবেশের সুস্থতা রক্ষায় গ্রিন এনার্জি (Green Energy) অপরিহার্য। এটি দূষণ হ্রাস করে, নবায়নযোগ্য শক্তি নিশ্চিত করে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করে। যদিও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে, তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও সচেতন নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। গ্রিন এনার্জি গ্রহণের মাধ্যমে আমরা শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও স্বাস্থ্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ ও সবুজ পৃথিবী নিশ্চিত করতে পারি।