সম্পাদকীয়

Green Economy: পুরনো মডেলের বিদায়! বিশ্ব অর্থনীতিতে কেন ‘সবুজ পথে বৃদ্ধি’ই এখন সুস্থায়ী ভবিষ্যতের একমাত্র সমাধান

এই প্রেক্ষাপটে ‘সবুজ অর্থনীতি’ (গ্রিন ইকোনমি) আধুনিক নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে সুস্থায়ী উন্নয়নের মূল দর্শন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে (ইউএনইপি, ২০১১)।

বিশ্বজিৎ বৈদ্য (লেখক– বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক): বিশ্ব অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যেখানে প্রথাগত বৃদ্ধির মডেলগুলোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অতিবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিমাত্রায় ব্যবহার, বায়ু ও জলদূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো প্রতিনিয়ত মানুষকে সচেতন করে তুলেছে যে, অর্থনৈতিক বিকাশকে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনঃগঠন করা অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে ‘সবুজ অর্থনীতি’ (গ্রিন ইকোনমি) আধুনিক নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে সুস্থায়ী উন্নয়নের মূল দর্শন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে (ইউএনইপি, ২০১১)। সবুজ অর্থনীতি এমন একটি কাঠামো যা আর্থিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায় এবং পরিবেশগত সংরক্ষণকে সমন্বিত করে। এটি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যেখানে উন্নয়ন মানে শুধুমাত্র জিডিপি বৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের জীবনমান, প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং সামাজিক অংশগ্রহণও সমানভাবে গুরুত্ব পায় (Green Economy)।

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন নীতি ও উদ্যোগ দেখাচ্ছে যে সবুজ অর্থনীতি কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যম নয়, বরং স্থানীয় উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ওইসিডি (২০১২) রিপোর্টে দেখা যায় যে, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, সুস্থায়ী কৃষি, সবুজ অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলো জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আয় ও সামাজিক কল্যাণ বৃদ্ধি করতে পারে। একইভাবে, ইউএনইপি, (২০১১) সবুজ অর্থনীতিকে বিশ্বে দারিদ্র্য হ্রাস এবং সুস্থায়ী উন্নয়নের পথ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারতের মতো বৃহৎ এবং বহুমুখী দেশগুলোতে, যেখানে জনসংখ্যার চাপ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চরম নির্ভরশীলতা বিদ্যমান, সেখানে সবুজ অর্থনীতি স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও জীবিকা সৃষ্টির এক কার্যকরী নীতি হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।

সবুজ অর্থনীতির মূল ধারণা হল— ‘বৃদ্ধি, কিন্তু সবুজ পথে’। এটি তিনটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে: মানুষের কল্যাণ (পিউপিল), পৃথিবীর সংরক্ষণ (প্ল্যানেট), এবং আর্থিক লাভ (প্রফিট)। অর্থনৈতিক সুস্থায়ীকতা নিশ্চিত করতে, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহার, দূষণ হ্রাস, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং সুস্থায়ী উৎপাদন প্রযুক্তি গ্রহণ অপরিহার্য। পরিবেশগত সংরক্ষণে জীববৈচিত্র্য, বনভূমি, জলাশয় এবং মাটি সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সামাজিক ন্যায়কে নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সমতা বজায় রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় (পিয়ার্স, মারকান্ড, ও বার্বিয়ার, ১৯৮৯; ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, ২০২০)।

স্থানীয় উন্নয়ন বা লোকাল ডেভেলপমেন্ট হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা স্থানীয় সম্পদ, সামাজিক কাঠামো এবং মানুষের উদ্যোগকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এটি একটি ‘নিচ থেকে উপরে’ (বটম-আপ) মডেল, যেখানে জনগণ নিজস্ব উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় সম্পদ যেমন— মাটি, জল, বন, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও কারুশিল্প— উন্নয়নের মূল ভিত্তি তৈরি করে, কিন্তু এদের অতিমাত্রায় ব্যবহার এবং দূষণ স্থানীয় উন্নয়নকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। সবুজ অর্থনীতি এই সমস্যার সমাধান প্রদান করে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, সুস্থায়ী জীবিকা এবং সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করে। ওইসিডি (২০১২) অনুসারে, স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করলে শুধু অর্থনৈতিক আয় বৃদ্ধি পায় না, বরং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যও বজায় থাকে (Green Economy)।

সবুজ অর্থনীতি ও স্থানীয় উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক। স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং ভোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে, এবং সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। কৃষি ক্ষেত্রে, জৈব চাষ, ড্রিপ সেচ, কম রাসায়নিক সার ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা এবং খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়। ক্ষুদ্র শিল্প এবং হস্তশিল্পে পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি ও সবুজ উদ্যোগ গ্রহণ করলে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। শক্তি ক্ষেত্রে সৌর ও বায়ু শক্তি ব্যবহার করলে গ্রামীণ বিদ্যুদয়ন এবং শক্তি স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। পর্যটন ক্ষেত্রে ইকো-ট্যুরিজম এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন স্থানীয় মানুষের আয় বাড়ায় এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণে সহায়তা করে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সার্কুলার ইকোনমি ও পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি দূষণ হ্রাস করে এবং স্থানীয় জীবিকা সৃষ্টিতে অবদান রাখে (আইএলও, ২০১৮)।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সবুজ অর্থনীতি ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার পর ওইসিডি (২০১১) ‘টুওয়ার্ডস গ্রিন গ্রোথ’ রিপোর্টে দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কেবল সবুজ বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্ভব। ইউএনইপি (২০১১) ‘গ্রিন ইকোনমি রিপোর্ট’–এ দেখানো হয়েছে যে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, সুস্থায়ী কৃষি এবং সবুজ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ জিডিপি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কার্যকর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২০ সালে ‘ইউরোপিয়ান গ্রিন ডিল’ ঘোষণা করেছে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ মহাদেশ হওয়ার জন্য। চিন ও দক্ষিণ কোরিয়া ‘গ্রিন গ্রোথ স্ট্রাটেজি’–এর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তি ও ইকো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন করছে। এসব আন্তর্জাতিক উদাহরণ প্রমাণ করে যে সবুজ অর্থনীতি কেবল পরিবেশ সংরক্ষণ নয়, বরং সুস্থায়ী উন্নয়নের প্রধান ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

ভারত সরকারও সবুজ অর্থনীতিকে জাতীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০০৮ সালে গঠিত ন্যাশানাল অ্যাকশন প্ল্যান অন ক্লাইমেট চেঞ্জ–এর আটটি মিশনের মধ্যে ন্যশানাল সোলার মিশন, ন্যশানাল মিশন ফর এনহ্যান্সড এনার্জি এফিসিয়েন্সি, ন্যাশানাল ওয়াটার মিশন এবং গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন সবুজ অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেছে। নীতি আয়োগ (২০১৮)–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগ ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। গ্রিন স্কিল ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম–এর মাধ্যমে স্থানীয় যুবকদের পরিবেশবান্ধব কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ভারতের কৃষি, শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন ক্ষেত্রে সবুজ উদ্যোগ ধীরে ধীরে স্থানীয় অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। রাজস্থান, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সবুজ উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিকে সবুজ পথে এগিয়ে নিচ্ছে (Green Economy)।

যদিও সবুজ অর্থনীতি সম্ভাবনাময়, বাস্তবায়নে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, যেমন নবায়নযোগ্য শক্তি ও তথ্য প্রযুক্তির ঘাটতি, স্থানীয় উদ্যোগকে প্রভাবিত করে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, যেমন কেন্দ্র–রাজ্য নীতির সমন্বয়, এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাব বাস্তবায়নকে জটিল করে তোলে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা, যেমন অতিবৃষ্টি, খরা এবং তাপমাত্রা পরিবর্তন, অনেক প্রকল্পের স্থায়িত্ব হ্রাস করে।

সুস্থায়ী ভবিষ্যতের জন্য সবুজ অর্থনীতি এবং স্থানীয় উন্নয়নের সংযোগ আরও সুদৃঢ় করতে স্থানীয় পরিকল্পনা, অংশগ্রহণমূলক শাসন, সবুজ আর্থিক নীতি, শিক্ষাদীক্ষা ও প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং স্থানীয় বাজারে সবুজ পণ্যের প্রসার অপরিহার্য। স্থানীয় পর্যায়ে সবুজ উদ্যোগ গ্রহণ করলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, সামাজিক সংহতি বজায় থাকে, এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা হয়। এইভাবে সবুজ অর্থনীতি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সমাজের সমতা, এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে।

সবুজ অর্থনীতি কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের নীতি নয়, এটি একটি দার্শনিক রূপান্তর, যেখানে উন্নয়ন মানে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় নতুন দিক নির্দেশ করছে, এবং ভারতের মতো দেশে এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও সমাজকে আত্মনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব পথে এগিয়ে নিচ্ছে। টেঁকসই উন্নয়নের যুগে সবুজ অর্থনীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক কাঠামো নয়, এটি মানুষের, প্রকৃতি ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি নবজাগরণের সেতুবন্ধন (Green Economy)।

Related Articles