সম্পাদকীয়

রাজনৈতিক বিক্ষোভ যখন জনজীবনে প্রভাব বিস্তার করে

সাধারণ নাগরিকদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা সম্পূর্ণ রূপে ব্যাহত হচ্ছে

বিভাস ঘোষ (লেখক— গ্রন্থাগারিক): ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতিতে সিজেপি, বাম, কংগ্রেস ও অন্যান্যরা মিলিত হয়ে যে ভাবে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী রাজনৈতিক বিক্ষোভ সমাবেশ সংগঠিত করছে বা দিল্লির যন্তরমন্তর এবং দেশের অন্যান্য জায়গায় সরকার বিরোধিতার নামে অরাজকতা সৃষ্টি করছে, তাতে সাধারণ মানুষ খুবই অসুবিধার মধ্যে পড়ছে। মানুষের কাজ কারবার রুটি-রুজির খুবই অসুবিধা হচ্ছে। সাধারণ নাগরিকদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা সম্পূর্ণ রূপে ব্যাহত হচ্ছে। এর পেছনে কি কোনও আন্তর্জাতিক বৃহৎশক্তির হাত আছে না এটা সম্পুর্ণ আন্তর্দেশীয় বা দেশের অন্তর্নিহিত বিষয়? এ বিষয়ে আলোচনা চলতেই থাকবে। তবে এই আন্দোলন যে বাম-কংগ্রেস বা ‘ইন্ডিয়া’ জোট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিরোধিতার নামে বাজারে টিকে থাকতে সিজেপি-কে ব্যবহার করছে এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। সিজেপি আসলে ‘কংগ্রেস জাগাও পার্টি’। ডুবন্ত কংগ্রেস পার্টি এখন খড়কুটোকে ধর বাঁচাতে চাইছে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, রাজনৈতিক বিক্ষোভ থাকবেই কিন্তু জনজীবনে তার প্রভাব ও বহিরাগত প্রভাব যখন জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন তাকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন তখন আর যাইহোক আন্দোলনের নামে এই অরাজকতা সম্পূর্ণ দেশবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক এ বিষয় কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতে সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম হলো শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির যৌথ প্রতিবাদ কর্মসূচি জনজীবন ও নাগরিক অধিকারের ভারসাম্যের প্রশ্নে বড়সড় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ নাগরিক ও সমালোচকদের মত, ঘন ঘন রাস্তা অবরোধ ও বিক্ষোভের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রুটি-রুজির মতো অপরিহার্য অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনস্বার্থ রক্ষা করা। অথচ দিল্লির যন্তরমন্তর থেকে শুরু করে দেশের প্রধান প্রধান সংযোগকারী সড়ক ও মেট্রোপলিটন এলাকাগুলিতে যেভাবে অবরোধ তৈরি করা হচ্ছে, তাতে সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সরাসরি লঙ্ঘিত হচ্ছে।

রুটি-রুজি ও দৈনন্দিন জীবিকা স্তব্ধ। অনির্দিষ্টকালের পথ অবরোধ ও যানবাহনে বাধার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, হকার এবং বেসরকারি সংস্থার কর্মচারীরা সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এক দিনের সড়ক অচলাবস্থার অর্থ হাজার হাজার প্রান্তিক পরিবারের রুজি-রোজগারে সরাসরি টান পড়া। জরুরি চলাচলের পথ আটকে দেওয়ার ফলে অ্যাম্বুল্যান্স ও জীবনদায়ী চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে। মুমূর্ষু রোগীর হাসপাতালে পৌঁছতে না পারা বা চিকিৎসায় বিলম্বের ঘটনা সংবিধানস্বীকৃত ‘জীবনধারণের অধিকার’-এর ওপর সরাসরি আঘাত। নিয়মিত স্কুল-কলেজের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সর্বভারতীয় প্রবেশিকা ও প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীরা সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছতে পারছেন না। তরুণ প্রজন্মের কেরিয়ার ও শিক্ষাজীবনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা সম্পূর্ণ অনৈতিক।

ভারতের সংবিধানে অবাধ অধিকার বলে কিছু নেই। অধিকারের সাথে দায়িত্ব ও যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯(১)(খ) অনুযায়ী অস্ত্রহীন শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার থাকলেও, অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ঘ) প্রতিটি নাগরিককে অবাধ বিচরণের স্বাধীনতা দেয় এবং অনুচ্ছেদ ২১ দেয় জীবন ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার গ্যারান্টি। একটি দলের প্রতিবাদের অধিকার কখনোই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকার অধিকারকে খর্ব করতে পারে না। শাহিনবাগ রায় (২০২০); দেশের শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় পর্যবেক্ষণ করেছিল যে, ‘গণতন্ত্র ও ভিন্নমত পাশাপাশি চলে, কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য সার্বজনীন স্থান বা চলাচলের সাধারণ রাস্তা দখল করে প্রতিবাদ জানানো যায় না।’ রেলওয়ে বোর্ড বনাম নিরঞ্জন সিং (১৯৬৯); আদালত নির্দেশ দেয় যে প্রতিবাদের অধিকার মানেই যেখানে খুশি প্রবেশ করা বা সরকারি-সর্বজনীন সম্পত্তি দখল করে রাখা নয়। শীর্ষ আদালতের এই দ্ব্যর্থহীন অবস্থান অমান্য করে রাস্তা অবরুদ্ধ রাখা সরাসরি আইনের শাসনের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ এবং সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি শুনানির সময় কর্মহীন কিছু তরুণকে ‘আরশোলা’ বা ‘ককরোচ’ বলে তুলনা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে (যদিও পরে তিনি স্পষ্ট করেন যে এটি শুধুমাত্র জাল ডিগ্রিধারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল)।

এই মন্তব্যের প্রতিবাদে এবং তীব্র বেকারত্ব ও শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির ক্ষোভ থেকে আম আদমি পার্টির প্রাক্তন সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপকে ১৬ মে ২০২৬ সালে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্রতীকী বা ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। এটি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত কোনও রাজনৈতিক দল নয়।

শীর্ষ আদালত সিজেপি’র এই আন্দোলন কে জেন-জি’দের আন্দোলন বলে মানতে রাজি নয়। ১৯৯৭-২০১২ এর মধ্যেকার জেনারেশনকে জেন-জি বলে ধরা। অভিজিৎ, আশুতোষ  সৌরভ, নেহা এর কেউ এই সময়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এই সংগঠনের অর্থনৈতিক উৎস কি জানতে চান। এই সংগঠনের ব্যায় সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য পেশ করতে বলেন।

এই আন্দোলন যে অরাজনৈতিক ও সতন্ত্র এবং এটি যে কোন রাজনৈতিক সংগঠন সাথে যৌথ আন্দোলনে সামিল নয় তারও প্রমাণ দিতে বলেন।

একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত বিষয়। বিরোধী দলগুলির এই লাগাতার অচল করার কৌশল জাতীয় ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ক্ষতিসাধন করছে। শিল্পাঞ্চলে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে থাকা, কাঁচামাল সরবরাহে ব্যাঘাত এবং লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। জাতীয় অর্থনীতিতে কৃত্রিম মন্দা তৈরির চেষ্টা প্রকারান্তরে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত যখন বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান দৃঢ় করছে, তখন রাজধানী অবরুদ্ধ হওয়ার চিত্র আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা দেয়। দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পরোক্ষভাবে বৈরী বহিরাগত শক্তিগুলির স্বার্থ রক্ষা করে।

সীমান্ত সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমনে যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর মনোযোগ থাকা জরুরি, সেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোলযোগ ও আইনশৃঙ্খলার নামে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ নীতি ও সংস্কারকে বানচাল করতে কোনো আন্তর্জাতিক লবি বা বিদেশি থিংক ট্যাঙ্কের আর্থিক বা কৌশলগত ইন্ধন কাজ করছে কি না, তা নিয়ে গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক মহলে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিদেশি অর্থায়ন বা স্বার্থান্বেষী মহলের পরোক্ষ ভূমিকা যদি এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তা সরাসরি ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ নিয়ে মুখ খুললেন মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও। তবে এই বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আমেরিকা কোনও মন্তব্য করবে না।

আন্দোলনটি ভারতের বাইরেও ঢাকার মতো প্রতিবেশী অঞ্চলের কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীও ভারতের এই সিজেপি আন্দোলনের প্রতি সংহতি ও জোটবদ্ধ সমর্থন প্রকাশের চেষ্টা করায় গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ ও ‘ইসলামিক যোগসূত্রের’ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভারত তেড়ে টুকরে হঙ্গে স্লোগান দেওয়া সেই উমর খালিদ এর সমর্থনে সিজেপি-দের প্রতিবাদ তাদের উগ্র বাম যোগ প্রতিষ্ঠা করে।

গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় আইনসভা এবং ব্যালট বাক্সের মাধ্যমেই সরকারি নীতি বা সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বিধেয়। সংসদীয় প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে রাস্তা আটকে ক্রমাগত রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতাকে ধূলিসাৎ করে।

ডুবন্ত রাজনৈতিক অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় সুবিধা পেতে সিজেপি, বাম, কংগ্রেস ও তাদের সহযোগীদের এই সার্বিক অচলাবস্থার রাজনীতি কোনওভাবেই ইতিবাচক সমাধান আনতে পারে না। ভিন্নমত প্রকাশের স্থান সংসদ, নির্ধারিত বিক্ষোভ স্থল এবং জনসভা; সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির রাস্তা বা মুমূর্ষু রোগীর পথ নয়। জনস্বার্থকে পণবন্দি করে জাতীয় সুরক্ষাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া এই আন্দোলন তার গণতান্ত্রিক বৈধতা হারিয়ে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, সংবিধান পরিপন্থী এবং জনবিরোধী এক নৈরাজ্যে পর্যবসিত হয়েছে।

Related Articles