সম্পাদকীয়

পাচারের শিকার কন্যাশিশু, উদ্ধারই শেষ কথা নয়

এই সমস্যাকে কেবল সীমান্তবর্তী এলাকা বা নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলার সমস্যা বলে দেখলে চলবে না

সত্যগোপাল দে (লেখক— সাংবাদিক, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও সাইকোলিজিকাল কাউন্সেলর): বাণিজ্যিক যৌন শোষণ থেকে মুক্তির পরে চাই মর্যাদাপূর্ণ জীবন, কার্যকর পুনর্বাসন ও ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ, মিথ্যা বিয়ের প্রতিশ্রুতি, পরিচিত মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা পারিবারিক অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় অপরিচিত জগতে। সেখানে তাদের শরীর, স্বাধীনতা এবং মর্যাদা— সবই আক্রান্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাজ্য সীমান্ত, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের আর্থসামাজিক বৈষম্য মানবপাচার প্রতিরোধকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এই সমস্যাকে কেবল সীমান্তবর্তী এলাকা বা নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলার সমস্যা বলে দেখলে চলবে না। পাচারের উৎস, যাত্রাপথ এবং গন্তব্য— সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

অত্যন্ত আনন্দের বিষয় বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নারী ও শিশুদের প্রতি যে কোনও নির্যাতন শোষনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ নীতি গ্রহণ করেছেন।

যে কোন মানুষ এবং শিশু পাচারের শিকার, এই প্রতিবেদনে কন্যা শিশুদের কথাই বলব, যে কন্যাশিশুদের অনেকেই প্রান্তিক পরিবারের। কেউ দারিদ্র্যের কারণে, কেউ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে, কেউ আবার পরিবারের ভেতরের অস্থিরতা বা নির্যাতন থেকে মুক্তির আশায় প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন পরিচয়ের অপব্যবহারও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

তবে মনে রাখা দরকার, দারিদ্র্য পাচারের একমাত্র কারণ নয় এবং প্রান্তিক পরিবারের প্রতিটি শিশু পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে— এমন ধারণাও সঠিক নয়। প্রতারক ও পাচারকারীরা মানুষের বিশ্বাস, নিরাপদ জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং অসহায়তার সুযোগ নেয়। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা, নিরাপদ অভিবাসন, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো জরুরি, সেই লক্ষ্যে বর্তমান রাজ্য সরকার ব্রতী।

আগেই বলেছি এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শিশু ও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন, পুলিশ, প্রশাসন, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির সমন্বিত উদ্যোগে পাচারের শিকার শিশুদের উদ্ধার করা সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে মানবপাচার প্রতিরোধে প্রশাসনিক উদ্যোগ, পুলিশি তৎপরতা, শিশু কল্যাণ কমিটি এবং অন্যান্য শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আন্তঃরাজ্য ও আন্তর্দেশীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ও অপরিহার্য। এ ব্যাপারে মানব পাচার রোধের রাজ্য সরকারের টাস্ক ফোর্স তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছেন।

কিন্তু উদ্ধার অভিযান সফল হলেই শিশুটির বিপদ শেষ হয় না। অনেক সময় উদ্ধার হওয়ার পরেও তার সামনে দেখা দেয় পরিচয়সংক্রান্ত সমস্যা, পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার অনিশ্চয়তা, সামাজিক কলঙ্ক, শিক্ষার বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ। যে শিশু দীর্ঘদিন শোষণের মধ্যে থেকেছে, তার কাছে নিরাপদ পরিবেশে ফিরে আসাও একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া।

অতএব, উদ্ধার-পরবর্তী প্রথম কাজ হওয়া উচিত শিশুটিকে অপরাধের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার মতামত ও সর্বোত্তম স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা। চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা, আইনি সহায়তা এবং উপযুক্ত আশ্রয়ের ব্যবস্থা একই সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পুনর্বাসন কোনও এককালীন ব্যবস্থা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। প্রতিটি শিশুর অভিজ্ঞতা, বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি, শিক্ষা এবং মানসিক অবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বিশেষ করে কন্যা শিশু। তাই সবার জন্য একই ধরনের পুনর্বাসন পরিকল্পনা কার্যকর হতে পারে না। ভারত সরকারের মিশন বাৎসল্য প্রকল্পে এর রুপরেখা আছে।

প্রথমত, শিশুটির জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয় নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপযুক্ত পরিচর্যা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, শিক্ষায় প্রত্যাবর্তন, বয়সোপযোগী দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজ্য সরকারের ডাইরেক্টরেট অফ চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড ট্রাফিকং এ বিষয়ে সদা জাগ্রত।

পরিবারের কাছে প্রত্যাবর্তন অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সব সময় নিরাপদ বা উপযুক্ত নাও হতে পারে। শিশুটির পরিবারের পরিস্থিতি যাচাই, তার নিজের মতামত গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। যেখানে পারিবারিক পরিবেশ নিরাপদ নয়, সেখানে আইনসম্মত বিকল্প পরিচর্যা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হবে।

এই কাজে সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিশু কল্যাণ কমিটি, সমাজকর্মী, মনোবিদ, আইনজীবী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ থাকা দরকার। পুনর্বাসনের অগ্রগতি শুধু আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার সময় দিয়ে নয়, শিশুটি কতটা নিরাপদ, স্বনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী এবং সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত।

বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার শিশুরা বিশেষ করে কন্যাশিশুর জন্য ক্ষতিপূরণ, ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থের বিনিময়ে হারানো শৈশব বা মানসিক আঘাত ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবু ক্ষতিপূরণ চিকিৎসা, শিক্ষা, পুনর্বাসন, নিরাপদ বাসস্থান এবং ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতিতে বাস্তব সহায়তা দিতে পারে।

ভারতে অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত আইনি কাঠামো রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির পূর্ববর্তী ৩৫৭এ ধারার পরিবর্তে বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩-এর ৩৯৬ ধারায় ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ প্রকল্পের নিয়ম রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রযোজ্য ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যোগ্য ভুক্তভোগীদের সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাস্তবে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি শিশুটির কাছে সহজবোধ্য ও সহায়ক হওয়া জরুরি। আবেদনপত্র, প্রয়োজনীয় নথি, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে একজন নির্দিষ্ট সহায়ক বা কেসওয়ার্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। ক্ষতিপূরণের আবেদন, তার অগ্রগতি এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে নিয়মিত অনুসরণ থাকলে সহায়তা আরও কার্যকর হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণকে পুনর্বাসনের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। অর্থসাহায্যের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পাচার বিশেষ করে কন্যা শিশু পাচার  প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন, পুলিশ, শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয় আরও সুসংহত করার সুযোগ রয়েছে। জেলা ও রাজ্যস্তরে নিয়মিত পর্যালোচনা, আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে।

একই সঙ্গে পাচারের শিকার শিশুদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলির দায়িত্বও কম নয়। কোনও শিশুর অভিজ্ঞতা প্রকাশের সময় তার পরিচয়, ছবি বা এমন তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা তাকে নতুন করে সামাজিক অপমান বা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অপরাধীদের  নেটওয়ার্ক এবং শিশুদের বিশেষ করে কন্যা শিশুদের প্রতারণার কৌশলগুলিকে চিহ্নিত করা। প্রতিরোধমূলক উদ্যোগকে বিদ্যালয়, পরিবার, পঞ্চায়েত, নগর স্থানীয় সংস্থা এবং সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলতে হবে।

একটি কন্যাশিশুকে উদ্ধার করা মানে তাকে বিপদ থেকে সরিয়ে আনা; আর তাকে পুনর্বাসিত করা মানে তার সামনে নতুন জীবনের দরজা খুলে দেওয়া। এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ পথ— যেখানে দরকার ধৈর্য, পেশাদারিত্ব, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক সহযোগিতা।

পাচারের শিকার শিশুকে তার অতীতের পরিচয়ে আটকে রাখা নয়, তার সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। সে যেন আবার বিদ্যালয়ে ফিরতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শেখে এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে। বর্তমান রাজ্য সরকার এই লক্ষ্যে আশার আলো প্রজ্বলিত করেছে।

Related Articles