স্বাস্থ্য

নবজাতকের চিকিৎসায় ভরসা ডাঃ অরুণ সিং, স্বাস্থ্য দফতরের উপদেষ্টা ফিরছেন রাজ্যে

একসময় কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের নিওন্যাটোলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি

Truth of Bengal: নবজাতকের মৃত্যুহার কমানো এবং অসুস্থ সদ্যোজাতদের উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্যে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন বিশিষ্ট নিওন্যাটোলজিস্ট ডাঃ অরুণ সিং। তাঁর উদ্যোগেই পুরুলিয়ায় গড়ে উঠেছিল সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট। পরবর্তী সময়ে সেই মডেল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এবার সেই অভিজ্ঞ চিকিৎসককেই দু’বছরের জন্য স্বাস্থ্য দফতরের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করল রাজ্য সরকার। রাজ্যের নবজাতক চিকিৎসা পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা এবং শিশুমৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে তাঁর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইছে সরকার। বর্তমানে রাজস্থানের যোধপুরের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস)-এর নিওন্যাটোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ডাঃ অরুণ সিং। একসময় কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের নিওন্যাটোলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। ২০০০ সালের গোড়ায় তাঁর উদ্যোগেই এসএসকেএমে নিওন্যাটোলজি বিভাগ চালু হয়। নবজাতকদের চিকিৎসার জন্য পৃথক বিভাগ গড়ে তোলার পাশাপাশি সেখানে উন্নত চিকিৎসা ও গবেষণার পরিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর।

নিয়োগের পর অরুণ সিং জানিয়েছেন, এই দায়িত্ব তাঁর কাছে সম্মানের। তাঁর কথায়, বাংলা অনেক কিছু হারিয়েছে। ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই চিকিৎসকের প্রত্যাবর্তনে রাজ্যের নবজাতক চিকিৎসা পরিষেবায় নতুন গতি আসবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। তিনি আরও বলেন, ‘এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলা। এখানে সংকীর্ণ চিন্তা থাকা উচিত নয়। প্রত্যেক অঞ্চলের মা এবং বাচ্চারা ভাল থাকতে পারে, সেটা দেখাই অগ্রাধিকার। আমরা একসঙ্গে কাজ করব। সরকারের সঙ্গে যেমন কাজ করতে হয়, তেমনই মানুষের সঙ্গেও কাজ করতে হয়। আমার চেষ্টা থাকবে ভাল করা। সরকারি চিকিৎসায় মানুষের আস্থা ফেরানো। ডাক্তারদের সম্মান দিয়ে কাজ করাতে হবে মানুষের জন্য।’

তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজের অন্যতম পুরুলিয়া মডেল। ২০০৩ সালে ইউনিসেফ এবং কলকাতার কয়েকটি চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো জেলা হাসপাতালে বিশেষ নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হয়। সেই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডাঃ অরুণ সিং। সে সময় পুরুলিয়ায় শিশুমৃত্যুর হার ছিল উদ্বেগজনক। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অসুস্থ নবজাতকদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা— এই সব কিছুর সমন্বয়ে তৈরি হয় পুরুলিয়া মডেল। স্থানীয় তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নবজাতকের পরিচর্যার কাজে যুক্ত করাও ছিল এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই মডেলের সাফল্য নজর কাড়ে দেশের স্বাস্থ্য মহলের। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজ্যের জেলা হাসপাতালে এসএনসিইউ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পুরুলিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। কেন্দ্রীয় সরকারের নবজাতক পরিচর্যা কর্মসূচির পরিকল্পনা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই ধরনের ইউনিট সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও পুরুলিয়া মডেল গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, বাংলার একটি জেলা হাসপাতালের উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্তরে অসুস্থ সদ্যোজাতদের চিকিৎসার পরিকাঠামো তৈরিতে পথ দেখায়। শুধু তাই নয় এই পুরুলিয়া মডেল আজ বাস্তবে প্রয়োগ করছে উপ মহাদেশের অনেক দেশ।

কিন্তু রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর অরুণ সিংয়ের কর্মজীবনে ছন্দপতন ঘটে। ২০১২ সালে তাঁকে এসএসকেএম থেকে সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে বদলি করা হয়। সেখানে তাঁর বিশেষজ্ঞতার উপযোগী নিওনেটোলজি বিভাগ না থাকায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রশাসনের সঙ্গে মতপার্থক্য এবং বদলির সিদ্ধান্তের জেরে শেষ পর্যন্ত রাজ্য ছাড়েন তিনি। পরবর্তী সময়ে ভিনরাজ্যে চিকিৎসা ও নবজাতক স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজে যুক্ত হন। জাতীয় স্তরে নানা কর্মসূচিতেও তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগে।

এবার রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর তাঁকে ফের স্বাস্থ্য দফতরের উপদেষ্টা পদে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিষেবাকে অগ্রাধিকার দিতেই এই নিয়োগ। প্রসূতিমৃত্যু রোধ এবং শিশুরোগের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে ডাঃ অরুণ সিংকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।

Related Articles