উৎসবের আড়ালে বিপদের হাতছানি, অন্ধ উন্মাদনা ও আসন্ন মহাবিপর্যয়
আলোর বন্যায় ভেসে যায় কলকাতা, নজরকাড়া মণ্ডপ দেখতে ভিড় জমায় লাখো মানুষ
রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী: শরতের নীল আকাশ, শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ আর ঢাকের বাদ্যি নিয়েই বাঙালির প্রাণের শারদোৎসব। আলোর বন্যায় ভেসে যায় কলকাতা, নজরকাড়া মণ্ডপ দেখতে ভিড় জমায় লাখো মানুষ। কিন্তু এই চোখধাঁধানো রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিদারুণ আতঙ্ক। উৎসবের দিনগুলোতে এই পুরনো শহরটি যেন একেকটি বারুদের স্তূপে রূপ নেয়। ভক্তি আর লোকদেখানো প্রতিযোগিতার নামে কোটি মানুষের জীবন নিয়ে এক বিপজ্জনক খেলা চলছে। সম্প্রতি শহরের একটি ঘিঞ্জি মণ্ডপে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; তা আসলে এক বিরাট ধ্বংসের পূর্বাভাসের ঘণ্টা। অন্ধ আবেগ আর ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে একে এড়িয়ে গেলে আলোর এই আনন্দ অচিরেই মহাশ্মশানে পরিণত হতে পারে।
কলকাতার ভৌগোলিক গঠন কোনও পরিকল্পিত আধুনিক শহরের মতো নয়। উত্তর থেকে দক্ষিণ— শহরের বহু জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে শত বছরের পুরনো, আঁটসাঁট আর সংকীর্ণ অলিগলি। সাধারণ দিনেই যেখানে দু’জন মানুষ পাশাপাশি হাঁটার জায়গা পান না, সেখানে বাঁশ, কৃত্রিম কাপড় আর সহজে আগুন ধরে এমন জিনিস দিয়ে বিশাল মণ্ডপ গড়ে তোলা হয়। প্রবেশের পথটি সুড়ঙ্গের মতো অপ্রশস্ত, আর বিপদে বেরোনোর পথ প্রায় নেই বললেই চলে।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, সাধারণ মানুষের বাড়ির সদর দরজা আটকে এবং জানলার আলো-বাতাস পুরোপুরি রুদ্ধ করে এই বাঁশের খাঁচা তৈরি করা হয়। কোনও পরিবারে হঠাৎ কোনও শারীরিক বিপদ দেখা দিলে একটি রোগীবাহী গাড়ি বা চিকিৎসকের সেখানে পৌঁছনোর ন্যূনতম পথটুকুও থাকে না। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়ে চলে এই উন্মাদনা। তার ওপর মণ্ডপ ঘেঁষে গড়ে ওঠে সারি সারি খাবারের দোকান; যেখানে খোলা আকাশের নিচে রাখা থাকে রান্নার গ্যাস, ফুটন্ত তেলের কড়াই আর সিলিন্ডার। বারুদের স্তূপের পাশে খোলা দেশলাই নিয়ে নাচার এমন আত্মঘাতী আচরণ সচরাচর দেখা যায় না।
গত কয়েক বছরে সরকারি ঢালাও আর্থিক সহায়তা পুজোকে আর সাধারণ ভক্তির মধ্যে আটকে রাখেনি; তা রূপ নিয়েছে দলীয় দাপট আর পেশিশক্তির প্রদর্শনীতে। কোনও ধরনের পরিকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও অনেকেই আজ আর্থিক বরাতের জোরে জনজীবনকে বিপন্ন করার ছাড়পত্র পেয়ে যাচ্ছে।
প্রশাসনের ভূমিকা এখানে রীতিমতো প্রহসনের সমতুল্য। দমকল ও পুলিশের দীর্ঘ নিয়মাবলি কেবল কাগজের পাতাতেই শোভা পায়। বাস্তবে দেখা যায়, রাজনৈতিক চাপের কাছে সব সুরক্ষাবিধি মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়। যে গলিতে দমকলের একটি মাঝারি মাপের গাড়ি ঢোকার জায়গা নেই, সেখানে কার নির্দেশে অনুমতি মেলে? কেন ভালো করে খতিয়ে দেখা হয় না জরুরি নির্গমন পথ? এই চরম অবহেলার কোনও সদুত্তর প্রশাসনের কাছে নেই।
ভক্তির আবেগে আমরা একটি পরম সত্য ভুলে যাই। লক্ষ লক্ষ ভক্ত দেবীর আশীর্বাদের আশায় মণ্ডপে ছোটেন। কিন্তু কোনও অদৃশ্য শক্তি প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মকে ভেঙে দেয় না; বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলে বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নিয়মে।
পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে— জ্বালানি, উত্তাপ আর বাতাসের সংযোগ ঘটলে আগুন জ্বলবেই; কোনও পুণ্য বা ভক্তি সেখানে বাধা হতে পারে না। রাসায়নিক উপাদানে তৈরি কাপড়ে সামান্য ফুলকি লাগলেই তা কয়েক সেকেন্ডে দাবানলে রূপ নিতে পারে। বিষাক্ত ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে গেলে এবং নিঃশ্বাস নেওয়ার বাতাস ফুরিয়ে এলে, সরু গলিপথে দিশাহারা মানুষ একে অপরের ওপর আছড়ে পড়বে। সেই মারাত্মক পদপিষ্ট অবস্থায় মানুষকে বাঁচাতে কোনও অলৌকিক শক্তি আকাশ থেকে নেমে আসবে না।
যদি কোনও এক সরু গলির মণ্ডপে আগুন লাগে এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে মানুষ অন্ধের মতো দিগ্বিদিক ছুটবে। এই শহরে আগুন নেভানোর মতো পর্যাপ্ত জলের অভাবও অত্যন্ত প্রকট। মাটির নিচের পুরনো সংযোগগুলো বহুদিন আগেই বিকল হয়ে গেছে বা আবর্জনায় বন্ধ হয়ে গেছে। শহরের বহু পুকুর আর জলাশয় ভরাট করে বড় বড় অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। দমকলের গাড়ি গলির মুখে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে; দীর্ঘ পথ পাইপ টেনে জল পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভেতরে আটকে থাকা মানুষগুলো ভস্মীভূত হয়ে যাবে। এই চরম অব্যবস্থাকে মেনে নেওয়া এক ধরনের নীরব অপরাধ।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতেও বিশাল উৎসব আয়োজিত হয়, তবে সেখানে ভিড় সামলানো হয় বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নিয়মে। উৎসবের আঙিনা এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়, যাতে প্রতি বর্গমিটারে দুজনের বেশি মানুষ কিছুতেই জমায়েত হতে না পারেন। ঢোকা ও বেরোনোর পথ সম্পূর্ণ আলাদা থাকে, যাতে জনস্রোতের কোনও মুখোমুখি সংঘর্ষ না হয়।
যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে ভিড়ের ঘনত্ব মাপা হয়। গতি সামান্য কমে গেলেই পেছনের মানুষের প্রবেশদ্বার নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি নির্গমন পথ এমনভাবে তৈরি থাকে, যাতে কয়েক মিনিটের মধ্যে লক্ষাধিক মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। আর খাবার তৈরির আগুন বা গ্যাস মূল উৎসব প্রাঙ্গণ থেকে বহু দূরে খোলা জায়গায় কড়া পাহারায় রাখা হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সতর্কতা ও বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করে মানুষ যেখানেই অন্ধ আবেগে মেতেছে, সেখানেই উৎসব পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। মক্কার হজের সময় সুড়ঙ্গে কিংবা মিনায় দুটি ভিন্নমুখী জনস্রোতের মুখোমুখি চাপে পদপিষ্ট হয়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। রান্নার গ্যাসের আগুনে নিমেষে পুড়ে শত শত মানুষ দগ্ধ হয়েছিলেন। সেই শিক্ষা থেকেই আজ তারা পুরো পরিকাঠামোকে সম্পূর্ণ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থায় রূপান্তর করেছে।
ইরাকের বাগদাদে সংকীর্ণ সেতুতে এক আত্মঘাতী বোমারুর নিছক গুজবে পদপিষ্ট হয়ে ও নদীতে ডুবে প্রায় হাজার পুণ্যার্থী মারা গিয়েছিলেন। কেরলের পুত্তিঙ্গাল মন্দিরে উৎসবের অনিয়ন্ত্রিত বাজির ফুলকি বারুদের গুদামে পড়ে শতাধিক প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। নয়না দেবী বা রতনগড়ের পাহাড়ি সংকীর্ণ পথে গুজবের জেরে পদপিষ্ট হয়েছিলেন বহু নারী ও শিশু। অতি সম্প্রতি সিউলের সংকীর্ণ ঢালু গলিতে এক উৎসবে মেতে ওঠা দেড় শতাধিক তরুণ প্রাণ নিছক মানুষের চাপে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান। এই প্রতিটি বিপদের মূলে ছিল এক সাধারণ সত্য— অপ্রস্তুত শাসনব্যবস্থা, সংকীর্ণ পথ এবং ভিড় সামলানোর বিজ্ঞানকে পুরোপুরি অবহেলা করা।
মহাবিপর্যয় এড়াতে অবিলম্বে কিছু জরুরি সংস্কার প্রয়োজন
রাস্তার মাপ অনুযায়ী পুজো– যে রাস্তা অন্তত ত্রিশ ফুট চওড়া নয়, সেখানে কোনও অবস্থাতেই বড় মণ্ডপ বা বাইরের ভিড় টানার অনুমতি দেওয়া চলবে না। সরু গলিতে কেবল স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য প্রতীকী পুজোর অনুমোদন থাকবে।
খোলা প্রাঙ্গণে যৌথ পুজো– যে পুজোয় প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ আসেন, সেগুলোকে পাড়ার গলি থেকে সরিয়ে শহরের বড় খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত উদ্যানে স্থানান্তর করতে হবে। একাধিক পুজোকে একত্রিত করে খোলামেলা জায়গায় মণ্ডপ তৈরির রীতি চালু করা দরকার।
ছোট দমকল ব্যবস্থার ব্যবহার– সরু গলির জন্য আধুনিক জলকণা ছড়ানোর ব্যবস্থা সংবলিত বিশেষ মোটরসাইকেল বা ছোট তিন চাকার যান মোতায়েন রাখতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিটি আয়োজক কমিটিকে নিজস্ব খরচে অন্তত পনেরো হাজার লিটার জলভর্তি অস্থায়ী পাত্র ও পাম্প মজুত রাখতে বাধ্য করতে হবে।
দাহ্য উপাদানের ওপর কড়া নজরদারি– কৃত্রিম কাপড় বা থার্মোকল পুরোপুরি বাদ দিয়ে কেবল আগুন-প্রতিরোধী রাসায়নিক তরলে ভেজানো সুতি কাপড় ও পোড়ামাটি ব্যবহার করতে হবে। খোলা তারের বদলে ধোঁয়াহীন, আগুনরোধী তার ও স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নকারী যন্ত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
জরুরি পথ ও খাবারের দোকানের দূরত্ব– মণ্ডপের গা ঘেঁষে কোনও খাবারের দোকান বসবে না; তা থাকবে অন্তত একশো মিটার দূরে। প্রতিটি মণ্ডপ থেকে মূল চওড়া রাস্তা পর্যন্ত অন্তত ছয় ফুটের একটি সোজা পথ কেবল চিকিৎসক ও উদ্ধারকারী কর্মীদের জন্য সব সময় ফাঁকা রাখতে হবে।
উৎসব মানুষের বেঁচে থাকার আনন্দকে উদযাপন করে, মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য উৎসব নয়। অন্ধ আবেগ কিংবা সস্তা বাহবার মোহে প্রশাসন যদি বিজ্ঞানের অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। একটি মাত্র দুর্ঘটনা পুরো শহরের আনন্দকে চিরতরে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে দিতে পারে। বিপদের শেষ সঙ্কেত পাওয়ার পরও কি আমাদের চৈতন্য ফিরবে না? নীতিনির্ধারকদের চোখ খোলার সময় এখনই; কারণ বারুদের স্তূপে আগুন লাগার পর হা-হুতাশ করার মতো সময়টুকুও অবশিষ্ট থাকবে না।






