আন্তর্জাতিক মানের গঙ্গাসাগর মেলা গড়ার উদ্যোগ, পুণ্যার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পরিষেবার মহাপরিকল্পনা নবান্নের
শুধু ধর্মীয় মেলা নয়, গঙ্গাসাগরকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সুশৃঙ্খল তীর্থক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরাই এখন নবান্নের লক্ষ্য
জ্যোতির্ময় দত্ত, কলকাতা: ‘সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার’—বাঙালির এই চিরপরিচিত প্রবাদকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও উজ্জ্বল করে তুলতে এবার বড়সড় পরিকল্পনা নিচ্ছে রাজ্য সরকার। শুধু ধর্মীয় মেলা নয়, গঙ্গাসাগরকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সুশৃঙ্খল তীর্থক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরাই এখন নবান্নের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে পুণ্যার্থীদের যাতায়াত, থাকা, খাওয়া, নিরাপত্তা থেকে শুরু করে পুণ্যস্নান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই একাধিক নতুন পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই গঙ্গাসাগর মেলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। এবার সেই ঘোষণাকে বাস্তবের রূপ দিতে প্রশাসনিক স্তরে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। নবান্ন সূত্রের খবর, এবারের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে পুণ্যার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পরিষেবার বিস্তৃত পরিসর। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কলকাতা থেকে গঙ্গাসাগর যাতায়াত, থাকা এবং খাওয়ার মতো একাধিক পরিষেবা বিনামূল্যে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা প্রায় ২০ লক্ষ অস্থায়ী টেন্ট তৈরির। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই শিবিরগুলিতে বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা করার ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় পানীয় জল, স্নান, আহার এবং ভাণ্ডারার আয়োজন করা হবে। শুধু মেলা প্রাঙ্গণেই নয়, রাজ্যে প্রবেশের পর থেকেই পুণ্যার্থীদের জন্য অভ্যর্থনা ও সহায়তার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রশাসন। পরিবহণ ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কলকাতা থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পুণ্যার্থীদের বিপুল ভিড় সামাল দিতে বাড়ানো হবে বাসের সংখ্যা। নদী পারাপারের জন্য অতিরিক্ত লঞ্চ চালানোর পাশাপাশি রেলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বিশেষ পরিষেবার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এমনকী পুণ্যার্থীদের বিনামূল্যে রেলযাত্রার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

পুণ্যস্নানের জন্য বাড়ানো হবে ঘাটের সংখ্যা। পুরুষ ও মহিলাদের জন্য পৃথক স্নানের ব্যবস্থা এবং কপিলমুনির আশ্রমে পুজো দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। মেলা প্রাঙ্গণে থাকবে আধুনিক অনুসন্ধান কেন্দ্র, সচিত্র পরিচয়পত্র এবং বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক। কোথাও কোনও সমস্যা হলে যাতে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যায়, তার জন্য বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হবে সহায়তা কেন্দ্র। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে চাইছে রাজ্য। কলকাতা থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট এবং মেলা চত্বরে সিসিটিভি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারির পরিকল্পনা রয়েছে। গোটা ব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষের আওতায় আনার ভাবনা। প্রাথমিক পরিকল্পনায় নজরদারির জন্য ১০টি হেলিকপ্টার রাখার কথা রয়েছে। প্রয়োজনে সেই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি আকাশপথ ও জলপথে রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর যৌথ নজরদারির ব্যবস্থাও করা হতে পারে।
এবারের মেলায় আরও একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হতে পারে ভিআইপি সংস্কৃতি বন্ধ রাখা। সাধারণ পুণ্যার্থী থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তি—সকলের জন্য একই ধরনের পরিষেবা নিশ্চিত করতে চাইছে প্রশাসন। অর্থাৎ আলাদা ভিআইপি ব্যবস্থা না রেখে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধার নীতি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। মেলার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা ধরে কর্মীদের বিভিন্ন শিফটে দায়িত্ব দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ভাবনা রয়েছে। মেলার প্রতিটি পরিষেবা পরিচালনার জন্য তৈরি হতে পারে বাধ্যতামূলক বিশেষ গাইডলাইন। কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতার বিষয়টিও এই আয়োজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসন।

ঐতিহ্যের মেলা, এবার আন্তর্জাতিক পরিচিতির লক্ষ্য
প্রতি বছর গঙ্গাসাগর মেলায় দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। কিন্তু বিপুল জনসমাগমের কারণে পরিবহণ, নদী পারাপার, থাকার জায়গা, পানীয় জল এবং নিরাপত্তা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় প্রশাসনকে। সেই পুরনো সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধান করেই মেলাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছে নবান্ন। তবে পরিকল্পনার ব্যাপকতা যতই নজরকাড়া হোক, তার বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ২০ লক্ষ টেন্ট তৈরি, বিনামূল্যে পরিবহণ ও খাবারের ব্যবস্থা, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি—সবকিছু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে, সেদিকেই তাকিয়ে ওয়াকিবহাল মহল। কারণ গঙ্গাসাগর মেলার সাফল্য শুধু আয়োজনের জৌলুসে নয়, লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতার উপরেই নির্ভর করবে। এবার তাই নবান্নের সামনে লক্ষ্য শুধু মেলা পরিচালনা নয়, গঙ্গাসাগরকে আন্তর্জাতিক তীর্থপর্যটনের মানচিত্রে বিশেষ জায়গা করে দেওয়া।






