বঙ্গোপসাগরে পরপর ঘূর্ণিঝড়: কারণ, বায়ুমণ্ডলীয় গতিবিদ্যা ও উপকূলীয় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
এল নিনো–দক্ষিণী দোলন এবং তার তীব্র পর্যায় হিসেবে পরিচিত সুপার এল নিনো
ডক্টর সুজীব কর: পরিবর্তনশীল ঘূর্ণিঝড়–পরিবেশ
বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর অন্যতম ঘূর্ণিঝড়প্রবণ সামুদ্রিক অঞ্চল। পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, বাংলাদেশ ও মায়ানমারের উপকূলীয় জনজীবন, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য বারবার ঘূর্ণিঝড়ের অভিঘাতে বিপর্যস্ত হয়। সাধারণত এপ্রিল–মে মাসে প্রাক্-বর্ষা এবং অক্টোবর–ডিসেম্বরে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এখানে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ ও বৈশ্বিক জলবায়বিক পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি, তীব্রতা ও গতিপথ বদলে যেতে পারে।
এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হল এল নিনো–দক্ষিণী দোলন এবং তার তীব্র পর্যায় হিসেবে পরিচিত সুপার এল নিনো। তবে সুপার এল নিনো হলেই বঙ্গোপসাগরে পরপর ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হবে, এমন কোনও প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই। বরং গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এল নিনো বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যকলাপ কমিয়েও দিতে পারে। তাই এই সম্পর্ক বুঝতে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের সম্মিলিত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা জরুরি।
সুপার এল নিনো কী?
এল নিনো হল নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৃহৎ জলবায়বিক ঘটনা। এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলীয় সংবহন, বায়ুচাপের বিন্যাস, মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে। এল নিনোর বিপরীত পর্যায় হলো লা নিনা। এই দুই পর্যায়ের সঙ্গে দক্ষিণী দোলনের বায়ুচাপের পরিবর্তন মিলিয়ে ‘এসনো’ বলা হয়।
অত্যন্ত শক্তিশালী উষ্ণতার পরিস্থিতিকে সাধারণভাবে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। তবে এটি সর্বজনস্বীকৃত পৃথক কোনও আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগ নয়। এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর বায়ুমণ্ডলীয় সংবহন এবং ওয়াকার সার্কুলেশনের পরিবর্তন ঘটে, যার পরোক্ষ প্রভাব ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরেও পড়তে পারে। ফলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পরিবেশ অনুকূল অথবা প্রতিকূল— দুই-ই হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি ও শক্তিবৃদ্ধির জন্য কয়েকটি শর্ত একসঙ্গে কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা, পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প, নিম্নস্তরের বায়ুপ্রবাহের ঘূর্ণন, মাঝারি বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা এবং তুলনামূলকভাবে কম উল্লম্ব বায়ু-শিয়ার এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সাধারণত ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ঘূর্ণিঝড়ের বিকাশে সহায়ক হতে পারে। উষ্ণ সমুদ্র থেকে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প প্রবেশ করে। সেই বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করার সময় সুপ্ততাপ মুক্ত করে, যা ঘূর্ণিঝড়ের অভ্যন্তরীণ ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে শুধু উষ্ণ সমুদ্র থাকলেই ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয় না।
সুপার এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি সরাসরি বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় না। বঙ্গোপসাগরের তাপীয় অবস্থা স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত, বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রের গভীর স্তরে সঞ্চিত তাপের ওপরও নির্ভরশীল।
সমুদ্রের ওপরের স্তরে তাপের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বাতাস সমুদ্রের জলকে মিশিয়ে দিলে গভীর স্তরের ঠান্ডা জল উপরে উঠে এসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমাতে পারে। কিন্তু উষ্ণ জলের স্তর গভীর হলে এই শীতলীকরণ তুলনামূলক কম হতে পারে, ফলে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিবৃদ্ধির অনুকূলতা বজায় থাকতে পারে।
এল নিনো কি ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ায়?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৭২–২০১৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে বঙ্গোপসাগরে এল নিনোর শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও সঞ্চিত ঘূর্ণিঝড়-শক্তির নেতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০২২ সালে এনপিজে ক্লাইমেট অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক সায়েন্স-এ প্রকাশিত গবেষণাতেও এল নিনো এবং ধনাত্মক ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরুর সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অনুকূলতা হ্রাসের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ, সুপার এল নিনো মানেই বঙ্গোপসাগরে বেশি ঘূর্ণিঝড়— এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়। তবে কোনও নির্দিষ্ট বছরে স্থানীয় সমুদ্রের উষ্ণতা, বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা, নিম্নস্তরের ঘূর্ণন এবং বায়ু-শিয়ার অনুকূল থাকলে একাধিক ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে। তাই কোনও একটি বছরের ঘূর্ণিঝড়ের জন্য এল নিনোকেই একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
পরপর ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিতে ম্যাডান–জুলিয়ান অসিলেশন, বায়ুপ্রবাহ ও আইওডি–এর ভূমিকা
ম্যাডেন–জুলিয়ান দোলন বা ম্যাডান-জুলিয়ান অসিলেশন হল ক্রান্তীয় অঞ্চলে মেঘ, বৃষ্টিপাত ও বায়ুমণ্ডলীয় সংবহনের একটি বৃহৎ আকারের পূর্বমুখী সঞ্চারশীল প্রক্রিয়া। এর সক্রিয় পর্যায় বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে অতিক্রম করলে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা, মেঘের বিকাশ এবং নিম্নস্তরের ঘূর্ণায়মান বায়ুপ্রবাহ বাড়তে পারে। এই সময় একাধিক নিম্নচাপের বীজ অনুকূল পরিবেশ পেলে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া, বিভিন্ন দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু কোনও অঞ্চলে মিলিত হলে বায়ুপ্রবাহের অভিসরণ ঘটে। এর ফলে বায়ু উপরের দিকে উঠতে বাধ্য হয় এবং পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে ঘন মেঘ ও প্রবল বৃষ্টিপাত সৃষ্টি হয়। নিম্নস্তরের ঘূর্ণন অনুকূল থাকলে নিম্নচাপ আরও সংগঠিত হতে পারে।
উল্লম্ব বায়ু-শিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসের গতি ও দিকের পার্থক্য বেশি হলে ঘূর্ণিঝড়ের কাঠামো ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে, বায়ু-শিয়ার কম থাকলে ঘূর্ণিঝড় সুসংগঠিত হয়ে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়।
ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ও পূর্বাংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর ধনাত্মক ও ঋণাত্মক পর্যায় বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রের তাপীয় বিন্যাসকে প্রভাবিত করে। ‘এসনো’, ‘আইওডি’ এবং এমজেও-র পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া কোনও নির্দিষ্ট সময়ে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অনুকূলতা বাড়াতে বা কমাতে পারে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও উপকূলীয় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়বিক প্রক্রিয়া, অন্যদিকে মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ। উষ্ণায়নের ফলে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও ওপরের স্তরে সঞ্চিত তাপ বাড়তে পারে। অনুকূল বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিতে এর ফলে কিছু ঘূর্ণিঝড় আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়। উষ্ণ বায়ুমণ্ডলে অধিক জলীয় বাষ্প ধারণের ক্ষমতার কারণে ঘূর্ণিঝড়-সম্পর্কিত অতিবৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মানেই প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়বে, এমন নয়। ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা, তীব্রতা, দ্রুত শক্তিবৃদ্ধি ও স্থলভাগে আঘাতের প্রবণতা পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চল বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বাঁধের ক্ষতি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং কৃষিজমি ও পানীয় জলের উৎসের দূষণ উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করতে পারে। কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলেও প্রবল বৃষ্টিপাত, জলনিকাশির সমস্যা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও পরিবহণ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলেও জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জনবসতি স্থানচ্যুতির আশঙ্কা রয়েছে।
পরপর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে প্রথমটির ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার আগেই দ্বিতীয়টি এসে পড়তে পারে। ফলে উদ্ধারকাজ, ত্রাণ, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং কৃষি পুনর্বাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
পূর্বাভাস ও উপসংহার
সুপার এল নিনো পর্যায়ে বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা মূল্যায়নের জন্য নিনো ৩.৪ অঞ্চলের তাপমাত্রা, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা, বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা, নিম্নস্তরের ঘূর্ণন, উল্লম্ব বায়ু-শিয়ার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। উপগ্রহচিত্র, সমুদ্রের ভাসমান পর্যবেক্ষণযন্ত্র এবং সংখ্যাতাত্ত্বিক আবহাওয়া পূর্বাভাসের তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি ও গতিপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস ও সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করা জরুরি।
সারকথা, সুপার এল নিনো এককভাবে বঙ্গোপসাগরে পরপর ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির কারণ নয়। সমুদ্রের তাপীয় অবস্থা, বায়ুমণ্ডলীয় গতিবিদ্যা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্মিলিত প্রভাব নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড়ের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই বিপদের মূল্যায়নে শুধু ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা নয়, তার তীব্রতা, দ্রুত শক্তিবৃদ্ধি, গতিপথ, জলোচ্ছ্বাস, বৃষ্টিপাত এবং উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্বলতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্বাভাস, সময়মতো সতর্কীকরণ এবং কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতিই উপকূলীয় বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রধান উপায়।




