রাজ্যের খবর

পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানে যুক্ত করার চক্রান্ত হয়েছিল! ইতিহাস স্মরণ করে কংগ্রেসকে কটাক্ষ প্রধানমন্ত্রীর

সেই চরম সংকটের মুহূর্তে বাংলার অস্তিত্ব রক্ষায় পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

Truth of Bengal: পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে রাখার নেপথ্যে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক ও অনবদ্য অবদানকে শনিবার হুগলির তারকেশ্বরের সভামঞ্চ থেকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দেশবাসীকে জানান যে, দেশভাগের সময় একটা বড়সড় চক্রান্তের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার নীলনকশা তৈরি হয়েছিল। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তৎকালীন সময়ে সেই কুচক্রী ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে চূড়ান্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু সেই চরম সংকটের মুহূর্তে বাংলার অস্তিত্ব রক্ষায় পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর সেই আপসহীন ও দূরদর্শী লড়াইয়ের ফলেই আজকের পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে।

মূলত এই ঐতিহাসিক ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ উদযাপনের মেগা কর্মসূচিতে অংশ নিতেই শনিবার দু’দিনের সফরে রাজ্যে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দুপুরের দিকে তিনি কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে হেলিকপ্টারে চেপে রওনা দেন হুগলির তারকেশ্বরের উদ্দেশে। বিকেল ৪টের কিছু পরে প্রধানমন্ত্রীর চপার তারকেশ্বরের সভাস্থলে এসে পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন ও রাজকীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মোদীকে স্বাগত জানাতে সভামঞ্চে আগেই উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল আর.এন. রবি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সভামঞ্চে প্রধানমন্ত্রী পা রাখতেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাংলার ঐতিহ্যবাহী ডোকরার তৈরি একটি অপরূপ দুর্গামূর্তি এবং তারকনাথের একটি পবিত্র ছবি দিয়ে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। একই সঙ্গে বাংলার চিরন্তন সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে রসগোল্লা এবং জলভরা সন্দেশের হাঁড়িও তুলে দেওয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের সঠিক তারিখ নিয়ে রাজ্যের পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে এক বিরাট রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাংলার পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষের দিনটিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে সরকারিভাবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার সেই নিয়ম বদলে ঐতিহাসিক সত্যকে পুনরুদ্ধার করেছে। নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে ২০ জুন দিনটিকেই আনুষ্ঠানিক ও রাজকীয়ভাবে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৪৭ সালের এই ২০ জুন দিনটিতেই অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় ভোটাভুটির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানের গ্রাস থেকে মুক্ত করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত পাশ হয়েছিল, যার মূল কারিগরই ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

প্রাদেশিক আইনসভার সেই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই বিজেপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এই দিনটিকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের এই আয়োজনটি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেশজুড়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী পালন করা হচ্ছে। রাজ্যে পালাবদলের পর এটিই প্রথম সরকারি পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপন, তাই অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় বিন্দুমাত্র খামতি রাখেনি রাজ্য প্রশাসন। ভিভিআইপিদের সুরক্ষায় গোটা তারকেশ্বর চত্বরকে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে। শুধু তাই নয়, সভাস্থলের জাঁকজমক বাড়াতে আন্তর্জাতিক স্তর থেকে ফুল আমদানি করা হয়েছে। মঞ্চ সাজাতে থাইল্যান্ড থেকে আনা হয়েছে মূল্যবান ‘অ্যান্থোরিয়াম’ এবং তামিলনাড়ুর উটি থেকে এসেছে রকমারি জারবেরা ও লিলি। এছাড়া পাঁচ রকমের দেশি-বিদেশি গোলাপ, ব্লু ডেইজি ও রজনীগন্ধার সুবাসে মণ্ডপ ভরিয়ে তোলা হয়েছে। সাধারণ দর্শকদের বসার জন্য সভাস্থলে তৈরি করা হয়েছে পাঁচটি বিশাল আধুনিক হ্যাঙ্গার। পুরো মাঠটি সাজানো হয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী হলুদ ট্যাক্সি, হাতে টানা রিকশা, দক্ষিণেশ্বর মন্দির এবং বেলুড় মঠের ছবির কোলাজে, যা বাংলার সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছে।

এর আগে, শনিবার সকালে দিল্লির বুক থেকে পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পূর্বেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই রাজ্যবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, “পশ্চিমবঙ্গে আমার প্রিয় বোন ও ভাইদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। এই পুণ্যভূমি সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প, আধ্যাত্মিকতা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য এবং সমাজ সংস্কারের মতো বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের মাধ্যমে ভারতের গৌরবময় ইতিহাসকে রূপদান করেছে এবং আমাদের জাতীয় চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে।” একই সঙ্গে ২০ জুনের ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য বর্ণনা করে মোদী তাঁর পোস্টে পুনরুল্লেখ করেন, “পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ২০ জুন দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনটিতেই নিশ্চিত হয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ থাকবে। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অমূল্য অবদান ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। ২০২৬ সালে আমরা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তাঁর ১২৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি।” তারকেশ্বরের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রার যোগ করল।

Related Articles