‘নো কিংস’ আন্দোলনেই কি জব্দ ট্রাম্প!
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ আমেরিকার মানুষজন কেমনভাবে এই আগ্রাসনকে নিয়েছিলেন তারও ছবি প্রকাশ্যে এসেছে
অশোক অধিকারী: আপাতত যুদ্ধবিরতি! সঙ্গে সঙ্গে চির প্রত্যাশিত হরমুজ খুলে গেল। উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরানের স্নায়ুশক্তির কাছে হার মেনে ক্ষমাঘেন্না দিয়ে ‘হাল্লা চলল হোয়াইট হাউসে’। একবগ্গা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার সওয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েলের নেতানিয়াহু সরকারকে সঙ্গে নিয়ে যে খেলায় মেতেছিলেন, তাতে রাষ্ট্রসঙ্ঘ-সহ তাবড় দেশগুলি বিশেষত শক্তিশালী দেশ হিসাবে চিন বা রাশিয়া ট্রাম্পের এই একনায়কতান্ত্রিক অভিযানের বিরোধিতায় সজাগ ও দঢ় ছিল। মুশকিলটা সেখানেই যে ট্রাম্প চাইলেও এ যুদ্ধ বেশিদিন স্থায়ী করতে অপারগ এবং এই বার্তা ক্রমে ক্রমে রটে গিয়েছিল অনেক আগেই। মার্কিন দেশটির কপালে যে শোনিত রেখা বারবার অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে তাতে তার ভূখণ্ড দখলের বায়নাক্কা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যাহত ও পর্যুদস্ত হয়েছে। ইরানের তেল, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সামগ্রীর দখল নেওয়ার ছকটি বেশ পুরনো। তাতে তার মদতেপুষ্ট দেশগুলি পাশে এসে দাঁড়ালেও কখনও সোচ্চার হয়নি সেভাবে। ব্যতিক্রম যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু। প্যালেস্তাইনের লক্ষ শিশু নারী ও সাধারণ মানুষের রক্তের স্বাদ তিনি পেয়ে গেছেন। তাই গাজা ভূখণ্ডের যে হত্যালীলা তাতে তিনি দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে ট্রাম্পের পাশে এসে দাঁড়িয়ে তাঁর তাঁবেদারি করে মজা লুটের আশায় ভরপুর আনন্দে ছিলেন। আজ যখন একপ্রকার পালিয়ে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করে তিনি বাঁচলেন তখন ইরানের জন্য ঘোষিত ‘শেষ রাত’ একটি উজ্জ্বল দিন হয়ে এল বিশ্বের মানুষের কাছে। সম্মানজনক পলায়ন পর্বের মুখে তাঁর দেওয়া বিবৃতির যে অংশে তিনি বলছেন, ‘আমরা আমাদের সার্বিক সামরিক লক্ষ্য অর্জনে সফল। ইরান দুই সপ্তাহের জন্য সম্পূর্ণ রূপে হরমুজ প্রণালী খুলতে রাজি হয়েছে। ইরানের তরফে আমরা একটি দশ দফা প্রস্তাব পেয়েছি। তার ভিত্তিতে আমরা সমঝোতার আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী; সেখানে ইরান ট্রাম্পের দাবি মেনেছে না ট্রাম্প বাধ্য হয়েছে এই তেতো ওষুধ গিলতে তার অলক্ষ্যে এই ক্ষমতাধর দেশটির আভিজাত্য যে ধুলোয় মিশেছে তাতে সন্দেহ নেই।
ইরানের খনিজ সম্পদের দখল নেওয়ার যুদ্ধ যখন অতিমাত্রায় দানা বেঁধেছে। উভয় দেশের ক্ষয়ক্ষতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তখন এই যুদ্ধ শুরুর যিনি প্রধান হোতা সেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ আমেরিকার মানুষজন কেমনভাবে এই আগ্রাসনকে নিয়েছিলেন তারও ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ‘নো কিংস’ হাতে নেওয়া ব্যানার ও ফেস্টুন যখন শহরের মূল রাস্তাগুলিতে সোচ্চারে উত্তাল তখন ট্রাম্প পড়তে পেরেছিলেন দেওয়ালের লিখন, ‘…প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের দেশটিকে স্বৈরাচারীর মতো শাসন করতে চান। ভাবী রাজার মতো তাঁর আচরণ হলেও মনে রাখা দরকার এ দেশটিতে এখনও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে নির্বাচন হয়। দেশের মানুষের কথাই শেষ কথা। প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ধনবান স্তাবকবৃন্দের তাই এ দেশে কোনও জায়গা নেই।’ ‘নো কিংস’ মিছিলের যে বয়ান আর তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক মানুষের কন্ঠের যে ভাষ্য তাতে ট্রাম্প প্রশাসন নড়ে উঠেছে সন্দেহ নেই। যা, লক্ষ মিসাইল বর্ষণের সমান! কিন্তু দেশ হিসাবে ভারত রাষ্ট্রের যে এই যুদ্ধের প্রেক্ষিতে যে আশ্চর্য নীরবতা তাতে ‘যং যেন তং তেন’ (যখন যেমন তখন তেমন) এই আপ্তবাক্যে কাউকে যে চটানো ঠিক হবে না তার নীরব ভাষ্য ফুটে উঠেছে রাষ্ট্রের মুখে। আমেরিকার মতো প্রবল প্রতাপশালী দেশের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট সহ অন্যান্য দেশচালকের কুশপুতুল নিয়ে সে দেশটি যখন মিছিল করে তখন যে ছোঁয়াচে সাহসের উপর ভর দিয়ে তা সংঘটিত হয় তখন মনে মনে তাঁদের কুর্নিশ না জানিয়ে পারা যায় না। ছ’হপ্তার যুদ্ধে ইরানের যে সাড়ে তিন হাজার মানুষের প্রাণ গেছে, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যাও কয়েকশো ছাড়িয়েছে। আট ভারতীয়ও প্রাণ হারিয়েছেন; তাতে এই দখলনামায় ট্রাম্পের যে মুখ পুড়েছে সন্দেহ নেই। আজ যখন প্রস্তাবিত দশ দফার অন্যতম ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিমের ওপর থেকে ট্রাম্পের নজর সরাতে হবে এবং হরমুজের শুল্কের ভাগ আমেরিকাকে দিতে হবে বলে একটা আবদার ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে আসছে বলে শোনা যাচ্ছে তাতে জল ঢেলেছে ইরান। একমাত্র ওমান হরমুজের শুল্কের ভাগ পেতে পারে বলে ইরান জানিয়েছে। যুদ্ধ বিরতির এক তরফা ফায়দা ট্রাম্প তাঁর ‘আমার ভাই’ পাকিস্তানকে দিলেও সংবাদে আসছে চিনের কথা। ট্রাম্পের চিন সফরে যাওয়ার আগে বেজিংকে’ই যে এই মধ্যস্থতায় এগিয়ে রাখছেন তাতে সন্দেহ নেই। ইরানের বিদেশ মন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুনিয়ে রোখেছেন, আমাদের ওপর আক্রমণ বন্ধ হলে, আমরাও হামলা বন্ধ রাখব। প্রসঙ্গত ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও এক সুপবন বার্তায় জানিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল যাতে স্বাভাবিক হয় তার উদ্যোগ তারাও নেবে। ইরান যে অর্থ উপার্জন করবে তার মাধ্যমে ওরা দেশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করবে।’ ইরানের এই যে ‘নোপাসারন’ মনোভঙ্গি তাতে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। লেখা পর্যন্ত খবরে আসছে ইজরায়েল চুক্তি না মানায় ইরান পূনরায় হরমুজ প্রণালী বন্ধের কথা ভাবছে। আবার অশনিসংকেত সন্দেহ নেই!
ভারতে পেট্রপণ্যের যে পরিমাণ চাহিদা তার ৯০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। ইরান যদি হরমুজ প্রণালী (পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত) বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারত। যুদ্ধ থামলেও এই লেখা পর্যন্ত এখনও ভারতের ১৬টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালীর পশ্চিম প্রান্তে আটকে আছে। বিশ্বের চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ২৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহ হয়। ভারতের প্রতিদন যে ৫.৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি হয় তার ২ মিলিয়ন ব্যারেল এই প্রণালী দিয়ে আমদানি হয়। প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে ঘুরপথে ব্রাজিল বা রাশিয়া হয়ে এই তেল আমদানি করলে খরচ দ্বিগুণ পরিমাণ বেড়ে যাবে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়েছে। ডোমেস্টিক ও ইন্ড্রাস্টিয়াল গ্যাসের চাহিদায় টান পড়েছে সমানে বেড়েছে দাম। ভারতের ক্ষেত্রে পেট্রোপণ্যের দাম আকাশ ছোঁয়ায় তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বাজার দর বেড়েছে এবং জনমানসে তার বিপুল প্রভাব পড়ছে। অর্থনীতিবিদদের কথায় অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল পিছু দশ ডলার বৃদ্ধি পেলে ভারতের জিডিপি ০.৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমেরিকার এই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ব জনমত স্পষ্ট দুভাগে ভাগ হতে চলেছে। রাশিয়া বা চিন যেমন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে অন্যদিকে ফ্রান্স বা ব্রিটেন নিজেদের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে যা কূটনৈতিক দিক দিয়ে তাদের অবস্থানের পক্ষে কথা বললেও সংঘাতময় পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক শান্তি সহাবস্থান ও সুস্থিতির পক্ষে এটি একটি বিপজ্জনক ঝোঁক। মার্কিন রাজপথে হাজার হাজার মানুষের মুক্ত মিছিল আবার প্রমাণ করে দিচ্ছে যে এই হামলা তাঁরা মেনে মিচ্ছেন না। তাই ‘যুদ্ধবাজ আমেরিকা’ এই বদনাম থেকে মার্কিন জনগণ বেরিয়ে আসতে চাইছেন। সে দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের মাঝে আলোচনায় উঠে এসেছে, ‘একজন প্রেসিডেন্টকে কখনওই একতরফাভাবে দেশকে যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাওয়ার অধিকার দেওয়া উচিত নয়, তা সে যতই গুরুতর পরিস্থিতি হোক না কেন। ক্ষমতা দখলের নামে কোনও যুদ্ধ নয়। ট্রাম্পকে বিদায় দাও। আমরা রাজা চাই না।’ আমেরিকা সবসময়ই ইজরায়েলের পাশে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যে অমানবিক সমঝোতায় হাজার হাজার নিরীহ শিশু নারী সহ সাধারণের মৃত্যুর কারণ সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সিডনি শহরের রাস্তাও উত্তাল হয়েছে ‘স্টপ দ্য জেনোসাইড’ এই স্লোগানে। মার্কিন জনগণের আত্মমর্যাদায় যে আঘাত হেনেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প তারই প্রতিবাদে রাজপথে আঁকা হয়েছে হৃদয়ের গ্রাফিতি। ভারতবাসী হিসাবে আমরা তাকিয়ে আছি আমাদের রাষ্ট্রের স্পষ্ট অবস্থানের দিকে। অতীতেও ভারত রাষ্ট্রের নীরবতা আমাদের ব্যথিত করেছে। ভারত যদি স্ট্রাটেজিক সঙ্গী হয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু সরকারের আশীর্বাদ ধন্য হওয়ার জন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে তবে তা হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। যুদ্ধ কোনও রোগের উপশম নয় বরং এক চিরস্থায়ী ধ্বংসের বার্তা বহন করে আনে; তাতে লাভ হয় অস্ত্র কারবারিদের। যুদ্ধ বিরতি ঘোষণার পর ইরানের প্রধান রাস্তায় দীর্ঘ মানববন্ধনে শামিল হয়েছে হাজার হাজার মহিলা, পুরুষ। হাতে নিয়ে দেশের পতাকা। মুখে জাতীয় সঙ্গীত। সম্মিলিত হাত ঊর্ধ্বগগনে। ছবিতে এসেছে, এই খোলা হাওয়ায় মুক্তির উল্লাসে উন্মুক্ত টিলার ওপর বসে আপন সুরের মূর্ছনায় এক শিল্পী তাঁর তারের যন্ত্রে টঙ্কার তুলছেন। আপাতত এই সুস্থ সুন্দর দেশ-বিশ্ব সবার প্রার্থনায়।




