ভোটের আগেই হিংসার সুর সংঘাতের স্ক্রিপ্ট লিখছে বিজেপি
২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসার সময় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘বদলা নয়, বদল চাই’
প্রদীপ দে তপাদার (লেখক— বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক): গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বঙ্গ সফরের দিনই রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে হামলার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ঘটনাটি নিছক একটি দলীয় সংঘর্ষ নয়। এর অভিঘাত অনেক গভীর। এই ঘটনা বাংলার গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। ঘটনাচক্রে দিনটি ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার ব্রিগেডে বিজেপির বড় সমাবেশ। সেই মঞ্চে দলের তারকা প্রচারক অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী এমন ভাষায় মুখ খুললেন, যা শুনে অনেকেই বিস্মিত। তিনি বললেন, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘আইসিইউ-তে পাঠানো হবে’। রাজনৈতিক মঞ্চে তীব্র সমালোচনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সরাসরি শারীরিক আঘাতের ইঙ্গিত কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা?
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে ঘৃতাহুতি দিলেন বিজেপির আর এক নেতা দিলীপ ঘোষ। নিউটাউনের ইকো পার্কে তিনি রীতিমতো বোহেমিয়ান মেজাজে বললেন, ‘আমরাই তৃণমূলকে মারতে পারি… সারা বাংলায় মারব… সাবধান না হলে শুধু মাথায় নয়, আরও অনেক জায়গায় ব্যান্ডেজ বাঁধতে হবে… বোমা-বন্দুক সব আনব। কালীঘাটেও হামলা হবে।’ এটা নিছক তাঁর রাগের ভাষা নয়, সরাসরি সংঘাতের ডাক।রাজনীতির ভাষা কঠোর হতে পারে। কড়া সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু একজন প্রাক্তন সাংসদের মুখে প্রকাশ্যে এমন সহিংসতার হুমকি কি গণতন্ত্রিক পরিসরে গ্রহণযোগ্য? এখন স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগও স্পষ্ট। তাদের দাবি, ভোটের আগে বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশকে অশান্ত করতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, বলা যায় উত্তেজনা ততই বাড়ানো হবে। এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরি করা হবে। আর সেই আতঙ্কের ওপর দাঁড়িয়েই তৈরি করা হবে রাজনৈতিক মেরুকরণ। তৈরি হবে নতুন নতুন ন্যারেটিভ।
দিলীপ ঘোষের বক্তব্য সেই কৌশলেরই আভাস স্পষ্ট। ‘বোমা-বন্দুক সব আনব’— এই ধরনের মন্তব্য শুধু প্রতিপক্ষকে আক্রমণ নয়, এটা দলীয় কর্মীদেরও এক ধরনের গোপন ইঙ্গিত। মাঠে নামো। সংঘাতে নামো। রাজনীতিকে সংঘর্ষে পরিণত করো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ভাষা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, রাজনীতির উত্তেজনা যখন নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি দ্রুত বাস্তব সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে। তাঁরা কেউ খুন হন, কেউ মারাত্মক জখম হন। কেউ কেউ চিরতরে কর্মক্ষমতা হারান। সঙ্কট সমুদ্রে পড়ে তাঁদের পরিবারগুলি হাবুডুবু খায়। দু’-একবার নেতারা আসেন। দোষীদের গ্রেফতারের প্রতিশ্রুতি দেন। পরিবার প্রধানের হাতে কয়েক হাজার টাকার চেক ধরিয়ে দিয়ে যান। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর কেউ তাদের খোঁজ রাখেন না। নরেন্দ্র মোদি, দিলীপ ঘোষদের তাঁদের খোঁজ নিতে বয়েই যায়। ফলে, এমন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা তখন আর রাজনৈতিক থাকে না। তা হয়ে ওঠে শক্তি প্রদর্শনের ময়দান। এই প্রেক্ষাপটেই ব্রিগেডের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি মন্তব্যও আলোচনায় এসেছে। তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘চুন চুন কে হিসাব লেনা হ্যায়।’
রাজনৈতিক বক্তৃতায় এমন বাক্যবন্ধ অনেক সময় প্রতীকী অর্থে ব্যবহার হয়। কিন্তু যখন একই সময়ে দলের অন্য নেতারা প্রকাশ্যে সহিংসতার ভাষা ব্যবহার করেন, তখন সেই বাক্যবন্ধের অর্থ ভিন্নভাবে ধরা পড়ে। তখন সেটি রাজনৈতিক প্রতিশোধের হুঁশিয়ারিকেই স্পষ্ট করে। এখানে আরও একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি দাবি করে এসেছে যে পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও নির্বাচনে ব্যাপক রাজনৈতিক হিংসা হয়। বহু মানুষ খুন হন। সেই দাবির ভিত্তিতেই অতীতে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ছয়-সাত-আট দফায় ভোট হয়েছে। কিন্তু এবার নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে রাজ্যে মাত্র দুই দফায় ভোট হবে। এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। যদি রাজ্যে হিংসার পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ, তবে এত কম দফায় ভোট কীভাবে সম্ভব? আর যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই থাকে, তবে হঠাৎ করে বিজেপি নেতাদের মুখে কেন এমন আগ্রাসী ভাষার ফোয়ারা ছুটছে?
সমালোচকদের মতে, এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল। বাংলায় সংগঠনগত শক্তি বাড়াতে এখনও তারা চেষ্টা করছে। বহু প্রচার, বিপুল অর্থব্যয়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশের বঙ্গে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা, অন্য অংশের বারবার সফর— সব কিছুর পরেও প্রত্যাশিত সাফল্য এখনও অধরা। এই অবস্থায় সংঘাতই হয়ে উঠতে পারে ক্ষমতা দখলের সহজ ও মসৃণ পথ। সংঘাত বাড়লে মেরুকরণ বাড়ে। মেরুকরণ বাড়লে ভোটের হিসাব বদলায়। আর সেই সম্ভাবনাই বিজেপিকে উস্কানিমূলক রাজনীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমনটাই বহু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মত। এই বিতর্কে বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যের ঘটনাও সামনে এসেছে। যেমন উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা কিংবা মণিপুর। বিশেষত, মণিপুরে দীর্ঘদিন ধরে চলা সহিংসতা গোটা দেশকে উদ্বিগ্ন করেছিল। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রশাসন সেখানে দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। আবার হরিয়ানাতেও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে প্রচুর প্রশ্ন উঠেছিল। এইসব ঘটনা একটি বাস্তব সত্যকে সামনে আনে, হিংসা নিয়ে রাজনীতি করা সহজ। কিন্তু হিংসা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সে কথা অজানা নয়। এই রাজ্য এখন অবধি বহু সংঘাতের সাক্ষী। দেখেছে বহু রক্তপাত। একই সঙ্গে দেখেছে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের শক্তিও।
২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসার সময় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘বদলা নয়, বদল চাই’। সেই স্লোগানে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই ছিল না। সেটি ছিল প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর ও দলের নৈতিক অবস্থান। আজকের পরিস্থিতিতে সেই কথাই আবার নতুন করে আলোচনায় ফিরছে। কারণ, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক লড়াই থাকবে। মতাদর্শের সংঘাত থাকবে। কিন্তু সেই সংঘাত যদি পিস্তল-বন্দুকের ভাষায় প্রকাশ পায়, তবে গণতন্ত্রের ভিতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। দিলীপ ঘোষের মন্তব্যের পর তৃণমূল কংগ্রেস তাঁর গ্রেফতারের দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, প্রকাশ্যে এমন হুমকি শুধু রাজনৈতিক শালীনতার সীমাই ভাঙে না, এটা আইনশৃঙ্খলার পক্ষেও চরম বিপজ্জনক। কিন্তু আসল প্রশ্ন আরও বড়। বিজেপি যে স্ক্রিপ্ট লিখছে তাতে বরং করে বাংলার রাজনীতি কি আবার পুরনো সহিংসতায় ফিরে যাবে? নাকি রাজনৈতিক দলগুলি বুঝবে যে, উত্তেজনার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়? অতীতে বঙ্গবাসী বহুবার প্রমাণ করেছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন সংঘাতের রাজনীতি মেনে নেন না। তাই, আজ প্রশ্ন উঠছে, বিজেপি কি সত্যিই রাজনৈতিক লড়াইয়ে নামতে চাইছে? নাকি ভোটের আগে রাজ্যে অশান্তির আবহ তৈরিই তাদের মূল কৌশল? এই প্রশ্নের উত্তরই বঙ্গ রাজনীতির আগামী অধ্যায়ের সূচনা করবে।


