রাজ্যের খবর

পরম্পরায় বিশ্বাসী আদিবাসীদের জন্য SIR-এ নয়া সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের

জাতি শংসাপত্র বা প্রশাসনিক বিধিনিয়ম নিয়েও বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল নয় এই জনগোষ্ঠীর মানুষজন।

Truth Of Bengal: বৈচিত্র্যময় জনবিন্যাসের পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর বিড়ম্বনায় এবার গোষ্ঠীবদ্ধ আদিবাসীরা। মূলত, সাঁওতাল, ওঁরাও, ভূমিজ, মুন্ডা, লোধা, বীরহোড় শ্রেণিভুক্ত এই জনগোষ্ঠী নিজের নিজের পরম্পরায় বিশ্বাসী এবং বাইরের জগতের সঙ্গে নিজেদের বিলিয়ে দিতে রাজি নয়। রাজ্যের আদি বাসিন্দা হয়েও ভোটদানে তাঁদের আগ্রহ কম। তেমনি এসআইআর যে কি বস্তু তা নিয়েও তাঁদের চরম অনীহা।

জাতি শংসাপত্র বা প্রশাসনিক বিধিনিয়ম নিয়েও বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল নয় এই জনগোষ্ঠীর মানুষজন। ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান এবং উত্তরবঙ্গের মালদহ ও দুই দিনাজপুরের কিছু এলাকায় এধরনের আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছেন যাদের এসআইআর প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে বুথমুখী করা বিশেষ কষ্টসাধ্য বলেই মনে করছেন কমিশনের কর্তা ব্যক্তিরা। এছাড়াও জলপাইগুড়ির টোটো উপজাতি এবং দার্জিলিং এর ভুটিয়া উপজাতিদের একাংশের মধ্যেও এই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া চালুর পর এনুমারেশন পর্বে এই জনগোষ্ঠীগুলির কাছে সেভাবে সাড়া পাননি সংশ্লিষ্ট বিএলও-রা। ওই জনগোষ্ঠীগুলির নিজস্ব পরম্পরা, ঐতিহ্য এবং ভাষা সমস্যা রাজ্যের বাকি অংশের সঙ্গে ‘একাত্ম‘ করার ক্ষেত্রে অন্তরায় তৈরি করেছে। অথচ সরকারি রেকর্ডে এই জনগোষ্ঠীরা পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের বলা চলে আদি বাসিন্দা।

যদিও এদের কাছে জাতি শংসাপত্র বা সরকারি নথিপত্রের যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলেও জানা গেছে। এ ধরনের নথিপত্র বা সরকারি আদেশনামার গুরুত্ব বোধ করেননি নিজস্ব পরম্পরা নিয়ে বেঁচে থাকা ওই গরিব-গুর্বো আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা। ফলে এই মানুষগুলোকে এসআইআর-এর আওতায় আনতে এখন নতুন পন্থা ভাবতে হচ্ছে কমিশনকে। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা জেলাশাসক স্থানীয় স্তরে কথাবার্তা বলে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে যে সিদ্ধান্তের কথা জানাবেন সেটাকেই মান্যতা দেবে কমিশন। রাজ্যের সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল জানিয়েছেন, ” পশ্চিমবঙ্গ হল বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের একটি ঐতিহ্য। তাই নির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি কোন পরম্পরার উপর চাপিয়ে দেওয়া কমিশনের লক্ষ্য নয়। যারা এই রাজ্যের স্থায়ী ও আদি বাসিন্দা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরম্পরা বজায় রেখেই যাতে তাদের নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিত থাকে সেটাই দেখা হবে। সে কারণেই এই জনগোষ্ঠীগুলির বিষয়টি ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক কে বিশেষ অধিকার বা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”

তবে শুধু গোষ্ঠীবদ্ধ নিজস্ব পরম্পরায় বিশ্বাসী আদিবাসি জনগোষ্ঠী নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্য করা গেছে আদিবাসী থেকে সংরক্ষিত তফসিল ভুক্ত ভোটারদের নতুন প্রজন্মের কাছে জাতিগত শংসাপত্র থাকলেও তাদের বাবা অথবা মা-বাবা পূর্বপুরুষদের মধ্যে জাতিগত শংসাপত্রের কোনও চল নেই। অর্থাৎ বাবার কাছে কোন শংসাপত্র নেই কিন্তু ছেলে অথবা মেয়ের কাছে শংসাপত্র রয়েছে। এক্ষেত্রে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার প্রেক্ষিতে এ ধরনের সংরক্ষিত নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মিসম্যাচ বা আনম্যাপড হওয়ার ঘটনা এনুমারেশন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বা শুনানি পড়বে, যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি বাঁকুড়ার বড়জোড়ায় ভিজিটে গিয়ে এ ধরনের বেশ কিছু তথ্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন রাজ্যে কমিশন নিযুক্ত স্পেশাল রোল অবজারভার সুব্রত গুপ্ত।

সুব্রত বাবুর মতে, আপাতদৃষ্টিতে এসআইআর নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের সংরক্ষিত শ্রেণীর নতুন প্রজন্মের ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়া মুশকিল। তবে তা হবে অন্যায্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে বিবেচনাহীন। ” এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের এক্ষেত্রে কোনও দোষ নেই। তাদের পূর্বপুরুষদের অনীহা বা অজ্ঞতা এক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছে” জানিয়েছেন সুব্রত গুপ্ত। এই ঘটনা যে শুধুমাত্র বাঁকুড়ার বর্জ্যরা বা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ তাই নয়, উত্তরবঙ্গসহ গোটা রাজ্যেই কমবেশি প্রতিটি জেলায় এই সমস্যা রয়েছে। সেক্ষেত্রেও কমিশনকে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে বলেও জানা গেছে। কেস টু কিস বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি এই বিষয়টিকেও ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করা যায় কিনা তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কমিশনের কাছে সুপারিশ করেছে রাজ্য সিইও দপ্তর। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে কোনরকম বৈষম্য না রেখে এ বিষয়েও উপযুক্ত বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস সিইও দফতরের।

Related Articles