Voter Rights: নির্বাচনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে সেটা সাংবিধানিক সঙ্কট
এনআরসি, সিএএ, ডি-ভোটার, এবং এখন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যেভাবে নিরীহ মানুষদের নাগরিকত্ব সন্দেহের আওতায় আনা হচ্ছে, তা এক গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছায়াযুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: ভারতীয় গণতন্ত্রের বুনিয়াদ টিকে আছে একটিমাত্র স্বীকৃতির ওপর— আমি একজন ভোটার। এই সরল বাক্যটির মধ্যেই নিহিত রয়েছে নাগরিকের অধিকার, আত্মপরিচয়ের গর্ব এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর চুক্তির শিকড়। অথচ আজকের ভারতবর্ষে এই পরিচয়টাই বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এনআরসি, সিএএ, ডি-ভোটার, এবং এখন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যেভাবে নিরীহ মানুষদের নাগরিকত্ব সন্দেহের আওতায় আনা হচ্ছে, তা এক গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছায়াযুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়— যার লক্ষ্য পরোক্ষে সংখ্যাতান্ত্রিক রাজনীতি, পরিচয়ের ধূসরীকরণ, ও রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন।
আরও পড়ুনঃ Bengal Weather: দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির সম্ভাবনা কিছুটা কমল, তবে এখনই নয় স্বস্তি, ফের নিম্নচাপ ?
সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই সংশোধন যেন কাগজে-কলমে এনআরসি-রই এক অবোধ্য রূপান্তর। বিশেষ করে মুসলিম-প্রধান অঞ্চলগুলিতে ব্যাপক হারে ‘ডিলিশন’, অর্থাৎ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনা ঘটছে। ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি, অসম্পূর্ণ নথি যাচাই, এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত এই সংশোধনের মধ্য দিয়ে উঠে আসছে এক গভীর আশঙ্কা— নাগরিকত্ব হারানোর। অসমে আমরা ইতিমধ্যেই এনআরসি-র অভিজ্ঞতা পেয়েছি। ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছিল চূড়ান্ত তালিকা থেকে। যাদের একটি বড় অংশই ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং গরিব। অনেক হিন্দু, অনেক আদিবাসীও ছিলেন সেই তালিকায়। প্রশ্ন উঠেছিল— নাগরিকত্ব কি শুধুই কাগজে প্রমাণের বিষয়? সেই আতঙ্ক এখন ছড়িয়ে পড়ছে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ২০২৩ সালের আগস্টে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে এক তরুণী, যিনি সদ্য বিবাহিত এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন, ভোটার তালিকা থেকে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নাম বাদ পড়ে যাওয়ার পর আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ঘটনাটি সংবাদপত্রের এক কোণে ঠাঁই পেলেও মূলধারার আলোচনা থেকে ছিল বহু দূরে।
এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই স্মরণে আসে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একাধিক ভাষণ, যেখানে তিনি ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটি উচ্চারণ করেন ‘ডি-ভোটার’, ‘ঘুসপেটিয়া’ বা ‘বাংলাদেশি’ তকমার সঙ্গে। ধর্মীয় পরিচয়কে এইভাবে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনে মূল উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট হয়ে যায়— একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রান্তিক ও ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখা। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি নির্বাচনের মৌলিক অধিকার থেকেই কাউকে বঞ্চিত করা হয়, তবে তা নিছক একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এক সাংবিধানিক সঙ্কট। বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ এই সংশোধনপ্রক্রিয়া চলছে একপ্রকার গোপনীয়তায়। মানুষ কবে বাদ পড়ছে, কীভাবে বাদ পড়ছে, কীভাবে আপিল করতে হবে— এসব তথ্য অনির্দিষ্ট। অনেক জায়গায় নোটিশও পৌঁছয় না। অনেকে নিজের নাম বাদ পড়ার কথা জানতে পারেন ভোট দিতে এসে। সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুসারে, রাজ্যের একাধিক জেলায় প্রায় পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষের নাম নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এই সংখ্যাটা নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটা সংখ্যা একেকটি জীবনের ভাঙন, একেকটি আত্মপরিচয়ের অপমান। ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাস হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে সংশয় দেখা দেয়— এটি কি এনআরসি-র প্রাক্কালে আনা এক রাজনৈতিক খেলা? যদিও সরকার বারবার জানিয়েছে, এনআরসি কার্যকর করার কোনও সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি, তথাপি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মপদ্ধতি, পুলিশের নজরদারি, এবং ভোটার তালিকায় ব্যাপক গোঁজামিলের অভিযোগ দেখায়— এক অদৃশ্য এনআরসি যেন বাস্তবেই গড়ে উঠছে।
বিষয়টি এখানেই থেমে থাকছে না। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে একরকম নীরব শুদ্ধিকরণ অভিযান চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। উত্তরপ্রদেশে বহু মুসলিম যুবকের উপর ভোটার তালিকা নিয়ে তদন্ত চলছে। ভোটার আইডি এবং আধার লিঙ্কিং বাধ্যতামূলক করে তাদের তথ্যে সামান্য ফারাক দেখলেই বাদ দেওয়া হচ্ছে ভোটার তালিকা থেকে। অসমে বহু ডিটেনশন সেন্টার এখনও ভরা, যেখানে মানুষ কেবল পরিচয়ের প্রমাণ না দিতে পারার অপরাধে বছরের পর বছর বন্দি। পশ্চিমবঙ্গ যদিও এখনও সেই পথে হাঁটেনি, কিন্তু যেভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন অভিযান চলছে, তাতে ভবিষ্যৎ কি আদৌ আলাদা হবে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ভর করে আস্থার ওপর। সেই আস্থা তখনই ভাঙে, যখন রাষ্ট্র নিজেই একেকজন নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এই ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক ও মানবিক হত, তবে হয়তো এত প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু যেখানে স্বচ্ছতা নেই, প্রতিকার নেই, প্রতারণার আশঙ্কা প্রবল— সেখানে সংশোধনপ্রক্রিয়াটাই পরিণত হয় এক আতঙ্কে।
Truth of Bengal fb page: https://www.facebook.com/truthofbengal
এনআরসি বা তার ছদ্মরূপ যাই হোক, বাস্তবে এটা নাগরিকের অস্তিত্ব ও সম্মানের বিরুদ্ধে এক নির্মম যুদ্ধ। বিশেষত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ক্ষেত্রে এই যুদ্ধটা আরও শাণিত। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের এই সময়ে তাদের জাতীয় পরিচয় বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করা যেন একধরনের ক্ষমতার প্রদর্শনী। অথচ এই বাংলাই সেই ভাষার জনপদ, যেখানে ‘জনগণের সরকার’ গড়ে ওঠার দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি ক্ষমতায় আসে। কিন্তু সেই সরকার যদি নিজেই নিজের নাগরিকের পরিচয় ছিনিয়ে নেওয়ার খেলায় মেতে ওঠে, তবে তা গণতন্ত্রের পরাজয়। বাংলার হাওড়া, মালদা, দিনাজপুর, কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ, এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, অসংখ্য পরিবার আজও আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন— কবে কোন তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে, কখন নোটিশ আসবে, আর কখন তারা হয়ে উঠবেন ‘অজ্ঞাতপরিচয়’। এমনকী প্রবাসে কাজ করতে যাওয়া বহু মানুষ ফিরে এসে দেখছেন, তাঁদের নামও তালিকা থেকে গায়েব। অনেকে তো আবার এই সংশোধনের নামে শুরু হওয়া পুলিশি জেরার ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
এ এক নীরব নিধন। কোনও রক্ত নেই, কোনও হাহাকার নেই— তবুও এক গভীর অপমানের বিষ গেঁথে যাচ্ছে অস্তিত্বের শিকড়ে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচিত এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, মানবিকতা ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে নাগরিক সমাজ, সংবাদমাধ্যম ও বিরোধী দলগুলির উচিত সজাগ থাকা এবং প্রতিটি অবিচারের ঘটনাকে প্রকাশ্যে আনা।নাগরিকত্ব নিছক কাগজে লেখা একটি পরিচয় নয়— এটি ইতিহাসের, মাটির, ভাষার, ও সংস্কৃতির সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধনের নাম। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি সেই বন্ধনেই আঘাত আসে, তবে তা কেবল ভোটাধিকার হরণ নয়— এ এক আত্মপরিচয়ের অগ্নিপরীক্ষা।






