True Freedom: ভারত বহু সংস্কৃতির দেশ, কিন্তু এক বিশেষ সংস্কৃতিকে ‘জাতীয়’ বলে চাপানোর চেষ্টা
আজ, ২০২৫ সালে, ৭৯ বছর পেরিয়ে আসার পরে, আমাদের উচিত এই প্রশ্ন তোলা: ‘আমরা কি আদৌ স্বাধীন?’
বিশ্বজিৎ বৈদ্য (বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক): ভারতবর্ষ ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ছিঁড়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল (True Freedom)। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত থেকে আজ ৭৯ বছর কেটে গেছে। জাতীয় পতাকা উড়ছে, সংবিধান আমাদের অধিকার দিয়েছে, ভোটাধিকার আমাদের হাতের মুঠোয়। স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। আজ, ২০২৫ সালে, ৭৯ বছর পেরিয়ে আসার পরে, আমাদের উচিত এই প্রশ্ন তোলা: ‘আমরা কি আদৌ স্বাধীন?’
[আরও পড়ুন: Cobra Rescue: পুজো দিতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! শান্তিপুরের মন্দিরে চন্দ্রবোড়া সাপ উদ্ধার ঘিরে চাঞ্চল্য]
স্বাধীনতা কি শুধুই একদিনের উদযাপন, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কিছু গান ও বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ? না কি স্বাধীনতা একটি জীবন্ত আদর্শ, যার বাস্তবায়ন প্রত্যেক নাগরিকের জীবনে হওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের গভীরে তাকাতে হবে—রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, মতপ্রকাশ, সংস্কৃতি ইত্যাদি সব দিক থেকে।
প্রথমে আসি রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রসঙ্গে। ভারতবর্ষকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আমাদের সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকার দিয়েছে—ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, সমতার অধিকার ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবটা কি সত্যিই এমন (True Freedom)?
গণতন্ত্রের মুখোশে কি স্বৈরতন্ত্র লুকিয়ে আছে? সংসদে অপরাধমূলক পটভূমি থাকা জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। গণমাধ্যমের একাংশ নিরপেক্ষতা হারিয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠছে। গণ আন্দোলনের উপর পুলিশি দমন, বিরুদ্ধ মতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। যখন সরকার বিরোধী মত দমন করে, সংবাদমাধ্যম ভয় বা প্রলোভনে নিরব থাকে, তখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ‘গণতন্ত্র’ কেবল একটি ফর্মাল স্ট্রাকচার হয়, যার মধ্যে ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বাদ অনেক সময় অনুপস্থিত (True Freedom)।
সামাজিক স্বাধীনতা জাত, লিঙ্গ ও ধর্মের কারাগারে রূপান্তরিত হয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও ভারত সামাজিক বৈষম্যের জালে আটকে আছে। সংবিধান সমানাধিকার দিলেও বাস্তব সমাজে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এখনও বহু স্থানে দলিত বা তফসিলি জাতির মানুষকে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। উচ্চবর্ণ আধিপত্য আজও প্রশাসনিক কাঠামোতে দৃশ্যমান। মেয়েরা আজও বহু পরিবারে শিক্ষা ও কর্মজগতে অংশগ্রহণে বাধার সম্মুখীন হয়। যৌন হেনস্থা, ধর্ষণ, বধূ নির্যাতন – নিত্য সংবাদ। কর্মস্থলে সমান মজুরি বা সুযোগ পাওয়া দূরের কথা। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার হুমকির মুখে। ধর্মভিত্তিক দাঙ্গা, ঘৃণা প্রচার ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার ভয়াবহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেখানে সমাজে মানুষের পরিচয় হয় ধর্ম, জাত বা লিঙ্গ দিয়ে—মানুষ নয়, সেখানে সমাজ এখনও স্বাধীনতা থেকে বহু দূরে (True Freedom)।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কার জন্য, কতটুকুই বা আছে? স্বাধীনতার পর ভারত স্বনির্ভরতার পথে পা বাড়ালেও অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বেড়েছে। দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৭৫ শতাংশ-এর মালিক অল্প সংখ্যক ধনী। কোটি কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবন কাটাচ্ছে। কৃষক আত্মহত্যার হার কমেনি—ঋণের বোঝা ও ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া এর কারণ। শিক্ষিত যুব সমাজের মধ্যে বেকারত্ব এক বিশাল সংকট। স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন মানুষের হাতে থাকবে কাজ, খাদ্য, বাসস্থান ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ। অর্থনৈতিক দিক থেকে এখনও দেশব্যাপী একটি বড় অংশ শোষিত ও অবহেলিত।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য আমাদের মৌলিক অধিকার, কিন্তু বহু জায়গায় এখনও স্কুলে শিক্ষক নেই, বিল্ডিং নেই, টয়লেট নেই। সরকারি স্কুলগুলির মান নিম্নমুখী, যার ফলে দরিদ্রদের সন্তানরা পিছিয়ে পড়ে। উচ্চশিক্ষা অধিক খরচসাপেক্ষ – সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। সরকারি হাসপাতালের অবস্থা ভয়াবহ – ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, পরিষেবা নেই। বেসরকারি হাসপাতাল খরচের জন্য গরিব মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এই দুই মৌলিক স্তম্ভ না থাকলে ব্যক্তি কখনোই স্বাধীন হতে পারে না। আর তা যদি শুধুমাত্র শহর ও উচ্চবিত্তের জন্য সংরক্ষিত হয়, তবে স্বাধীনতা অসম্পূর্ণই রয়ে যায় (True Freedom)।
মানসিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও কণ্ঠস্বর কি আজও বন্দি? ভারতের সংবিধান মতপ্রকাশের অধিকার স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু— লেখক, কবি, গবেষকরা হুমকির মুখে পড়েন ভিন্নমত প্রকাশ করলেই। ‘Deshdrohi’, ‘Anti-national’ ইত্যাদি ট্যাগ দিয়ে বিরুদ্ধ মতকে দমন করার প্রবণতা বেড়েছে। সাংবাদিকদের উপর মামলা, আক্রমণ, এমনকি হত্যাও ঘটেছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় ফ্যাক্ট চেক নয়, প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে। মুভি, বই, নাটক—সব কিছুতেই সেন্সরশিপের বেড়া। যেখানে মানুষ নিজের মত ভয় ছাড়া প্রকাশ করতে পারে না, সেখানে মানসিকভাবে সে ব্যক্তি কখনোই স্বাধীন নয়।
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় বৈচিত্র্যে ঐক্য’র পরিবর্তে বিভক্তি। ভারত বহু ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির দেশ। কিন্তু আজ বহু ক্ষেত্রে—এক বিশেষ সংস্কৃতি বা ভাষাকে ‘জাতীয়’ রূপে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির মূল্যায়ন কমছে। সমালোচনাকে ‘অবিশ্বাস’, ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংস্কৃতি কখনোই একরৈখিক নয়। একমাত্রিক সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার মানে সাংস্কৃতিক পরাধীনতা (True Freedom)।
[আরও পড়ুন: Nagpur Tragedy: হৃদয়বিদারক দৃশ্য! মৃত স্ত্রীকে বাইকে শুইয়ে নিয়ে গেলেন স্বামী, ভাইরাল ভিডিয়ো]
৭৯ বছরের স্বাধীনতা পরিক্রমা আমাদের অনেক অর্জনের গল্প বললেও, বহু অসমাপ্ত স্বপ্নের কথাও বলে। দেশ হিসেবে আমরা অনেকদূর এসেছি—তবে সব ক্ষেত্রে নয়। সত্যিকারের স্বাধীনতা মানে মানুষের সম্মানজনক জীবনযাপন, আইনের চোখে সকলের সমান অধিকার; চিন্তার স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের নিরাপত্তা, জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, ভাষা—সব রকম বৈচিত্র্যের মধ্যে সাম্যতা। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি আদৌ স্বাধীন? আমাদের প্রয়োজন এক নতুন স্বাধীনতা সংগ্রাম—এক্ষেত্রে শত্রু হল অশিক্ষা, দারিদ্র্য, দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্য।






